মোস্তফা হত্যা মামলা: জোসেফ, হারিস ও আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?

মোস্তফা হত্যা মামলা: জোসেফ, হারিস ও আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?
প্রতিকী ছবি।

পর্ব-৪

এই সিরিজের গত তিনটা পর্ব জুড়ে যেই সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফার কথা আমি বলেছি, সেই মোস্তফা খুন হয় ৭ মে ১৯৯৬ সালে। মোস্তফা হত্যা মামলার যে নথিপত্র তথা এজাহার, প্রাথমিক তথ্যবিবরণী ইত্যাদি আমার সামনে রয়েছে, সেটি মোতাবেক হত্যাকাণ্ডের তারিখ ৭ মে এবং সময় আনুমানিক দুপুর আড়াইটা উল্লেখ করা হয়।

এই খুনের সঙ্গে সঙ্গেই জুড়ে যান আমাদের পুরো সিরিজের আলোচ্য ব্যক্তিরা, যারা হলেন যথাক্রমে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ (মোস্তফা হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি), আনিস আহমেদ (৪ নম্বর আসামি) ও হারিস আহমেদ (৫ নম্বর আসামি)। উল্লেখ্য, মামলার এজাহারে আসামিদের নাম যেভাবে লেখা হয়েছে, তা হুবুহু লিখলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে তোফায়েল আহামেমদ ওরফে জুসেফ, আনিছ আহমেদ ও হারিছ।

মামলার নথি পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় শুরুতেই সামনে এসে পড়ে। যদি প্রশ্ন আসে, মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা কী? তাহলে এজাহার অনুযায়ী যা লেখা হয়েছে তা হচ্ছে—(পাঠক, দয়া করে মাথায় রাখবেন এই আজাহার করছেন নিহত মোস্তফার স্ত্রী মিসেস রাশিদা পারভীন) মিসেস পারভীন তার এজাহারে বলছেন যে তার স্বামী মোস্তফা মতিঝিল থেকে লালমাটিয়া এলজিইডি ভবনের সামনে বেবিট্যাক্সিযোগে আসেন। মোস্তফার সঙ্গে সে সময় ছিলেন বাহার। রাস্তায় মোস্তফার পরিচিত স্বাধীনকে (স্বাধীন কুমার মজুমদার) দেখে বেবিট্যাক্সি থেকে নামেন এবং স্বাধীনের সঙ্গে কথা বলা অবস্থায় উল্লেখিত অভিযুক্তরা মোস্তফাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। ঘিরে ফেলার পর জোসেফ তার হাতে থাকা পিস্তল মোস্তফার শরীরে ঠেকিয়ে মোস্তফার হাতে থাকা

লাইসেন্সধারী পিস্তলটি নিয়ে যান এবং মোস্তফার ডান পায়ের গোড়ালি ও দুই পায়ের ঊরুতে গুলি করে রক্তাক্ত জখম করেন।

একই দিকে জোসেফের সঙ্গে হারিস তার হাতে থাকা রিভলবার দিয়ে স্বাধীনকে লক্ষ্য করে গুলি করেন, যার ফলে স্বাধীন ডান বুকে ও ডান বাহুতে গুলিবিদ্ধ ও জখম হন। মিসেস পারভীন তার এজাহারে আরো বলছেন যে, সেখানে উপস্থিত এই মামলার ২ নম্বর আসামি মাসুদ মোস্তফার পিস্তল দিয়ে মোস্তফাকে গুলি করে রক্তাক্ত জখম করেন এবং হাসিবসহ অন্য আসামিরা তার স্বামী মোস্তফা ও সঙ্গীয় বাহারকে ধরে রাখেন। তারপর সব আসামি (কোনো আসামি সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই) মোস্তফাকে লাথি মেরে কার ও বেবিট্যাক্সিযোগে সেখান থেকে চলে যান। আমরা যদি এই প্রাথমিক তথ্যবিবরণী থেকেই একটু নথিপত্র পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করি, তাহলে দেখতে পাই এই এজাহারে উল্লেখিত স্বাধীন কুমার মজুমদারের বক্তব্য আর এই মামলার বাদী, অর্থাত্ মোস্তফার স্ত্রী রাশেদা পারভীনের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা।

স্বাধীন তার জবানবন্দিতে যা উল্লেখ করেন, সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, জোসেফ মোস্তফাকে পিস্তল ঠেকান (কোথায় ঠেকান সেটি স্বাধীন তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেননি) এবং কোমর থেকে পিস্তলটি কেড়ে নেন। অথচ মোস্তফার স্ত্রী এজাহারে বলেছিলেন, জোসেফ পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে মোস্তফার হাত থেকে লাইসেন্স করা পিস্তল কেড়ে নেন। যদিও স্বাধীন এই পিস্তল লাইসেন্স করা নাকি অবৈধ, সেটি উল্লেখ করেননি। কিন্তু এর থেকেও বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, স্বাধীন কুমার মজুমদার দাবি করছেন, আসামি মাসুদ তার হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে মোস্তফার ডান পায়ে ও ঊরুতে গুলি করেন এবং জোসেফ মোস্তফার পিস্তল দিয়ে মোস্তফার পেটে ও বুকে গুলি করেন। কিন্তু এই মামলার বাদী মোস্তফার স্ত্রী বলছেন সম্পূর্ণ উলটো কথা। তিনি বলছেন, আসামি মাসুদ মোস্তফার পিস্তল দিয়ে মোস্তফার বুকের নিচে দুটি গুলি করে রক্তাক্ত ও জখম করেন আর জোসেফ মোস্তফার লাইসেন্স করা পিস্তল মোস্তফার হাত থেকে নিয়ে গিয়ে মোস্তফার ডান পায়ের গোড়ালি ও পায়ের ঊরুতে দুটি গুলি করেন।

তাহলে একই ঘটনায় চাক্ষুস সাক্ষী দাবি করা স্বাধীন বলছেন এক কথা এবং এই মামলার বাদী অর্থাত্ মোস্তফার স্ত্রী মিসেস রাশেদা পারভীন বলছেন সম্পূর্ণ অন্য কথা। একটি ফৌজদারি মামলায় এ ধরনের তীব্র ও স্পষ্ট জবানবন্দির বিপরীতমুখী বক্তব্য আমাদের বিস্ময় জাগায়। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এজাহারের বাইরে যখন মামলার এই এক নম্বর সাক্ষী তার জবানবন্দি দেন, সেখানে তিনি নিশ্চিত করেন যে তিনি এজাহারে যা বলেছেন তা তিনি তার স্বামীর কাছেই শুনে বলেছেন। আবার মামলার নথিতে জেরার একপর্যায়ে দেখা যায়, সাক্ষী রাশেদা পারভীন মুহূর্তেই তার বক্তব্য পরিবর্তন করে বলছেন যে, তার স্বামী তাকে কী বলেছেন সেটা তিনি ভালো করে শোনেননি। তবে জবানবন্দিতে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে আসামি মাসুদই তার স্বামীকে গুলি করেছেন, যেটা তিনি তার স্বামীর কাছ থেকেই শুনেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মিসেস রাশেদা পারভীন এইবার দাবি করছেন, আসামি হারিস তার স্বামীকে গুলি করেছেন বলে তিনি থানায় বলেছিলেন, কিন্তু এজাহারে তা উল্লেখ করা হয়নি।

গল্পের এখানেই শেষ নয়। এই মামলার রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ নম্বর সাক্ষী সাঈদুর রহমান, যিনি উল্লেখিত ঘটনাস্থলের পাশে পার্শ্ববর্তী সিডিএস প্রিন্টার্সে চাকরি করেন বলে জানা যায়। তিনি তার সাক্ষ্যে যা বলেন, তা শুনলে এই পুরো ঘটনার অন্য আরেক রূপ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। সাঈদুর রহমান পরিষ্কারভাবে বলছেন যে ডকে থাকা আসামিদের তিনি ঘটনাস্থলে দেখেনই নাই এবং যে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি তিনি আমাদের দেন, তা হচ্ছে ঘটনার স্থল সম্পর্কে। আগের সাক্ষীরা, অর্থাত্ স্বাধীন কুমার মজুমদার ও বাদী রাশেদা পারভীন বলেছেন যে মোস্তফা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন লালমাটিয়ার ‘এ’ ব্লকের ৩/৭ বাসার সামনে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই প্রিন্টিং কোম্পানির কর্মচারি বলছেন যে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এই ‘সিডিএস প্রিন্টার্সের’ ভেতরে।

ঐ ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে থাকা রফিকুল ইসলাম ওরফে বাহারের বক্তব্যের সঙ্গেও মিসেস রাশেদা পারভীনের বক্তব্যের সম্পূর্ণ অমিল লক্ষ করা যায়, অর্থাত্ মোস্তফাকে কে কোথায় গুলি করেছে, এ সংক্রান্ত যে বর্ণনা রাশেদা পারভীন দিয়েছেন, সেটির সঙ্গে বাহারের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। এদিকে মোস্তফার ভাই হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান (বর্তমানে জুয়া, ক্যাসিনো ইত্যাদি অপরাধের দায়ে জেলে রয়েছেন) স্পষ্ট জানান যে, তিনি পঙ্গুতে চিকিত্সারত স্বাধীনের কাছে শুনেছেন যে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ মোস্তফার বুকে গুলি করে। কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পাগলা মিজান চাক্ষুস সাক্ষী স্বাধীন কুমার মজুমদারের উদ্ধৃতি দিয়ে শুধু ‘বুকে গুলি’ করার কথা উল্লেখ করলেও বাহার ও স্বাধীন তাদের জবানবন্দিতে যে জোসেফ ‘পেটে ও বুকে’ গুলি করেছেন এ কথার উল্লেখ করেছিলেন, সেই কথা কিন্তু পাগলা মিজান বলেননি। মাসুদ নিহত মোস্তফার পায়ে ও ঊরুতে গুলি করে এই বক্তব্যের সঙ্গে স্বাধীন-বাহার-পাগলা মিজানের বক্তব্য এক হলেও জোসেফের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও বাহারের বক্তব্যের সঙ্গে পাগলা মিজানের বক্তব্যের অমিল লক্ষ্যণীয়। ফলে এই মামলায় কে কাকে গুলি করেছে এবং ঘটনা কী হয়েছে—এই বক্তব্যের পুরো ব্যাপারটিই একেবারে নানাবিধ সাংঘর্ষিক জবানবন্দিতে ভরপুর। কারো বক্তব্যের সঙ্গেই কারো বক্তব্য মিলছে না এবং আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে মামলার যিনি এজাহারকারী, তার বক্তব্যের সঙ্গে বা ঘটনায় বয়ান ভিন্ন। এমনকি একজন সাক্ষী সাঈদুর রহমান তো ঘটনার স্থান হিসেবে সম্পূর্ণ অন্য একটি লোকেশনকে উল্লেখ করেছেন। এদিকে এই মামলার রাষ্ট্রপক্ষের ১০ নম্বর সাক্ষী সেলিম চৌধুরী জানান, মোস্তফা সিডিএস প্রিন্টার্সে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেছেন এবং তিনি প্রেসের ভেতরে তিন জনের ‘কথা কাটাকাটি’র কথা উল্লেখ করেন। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে গুলির শব্দ শুনতে পান এই সেলিম চৌধুরী, অথচ এই মামলার অন্য সাক্ষীদের সাক্ষ্যে এই কথা-কাটাকাটি, তিন জনের প্রেসে ঢুকে পড়া এবং সেখানে গোলাগুলি হয়েছে এমন কোনো বক্তব্যের তথ্য আমরা পাই না।

প্রাথমিকভাবে এজাহার, সাক্ষী, সাক্ষীদের ভিন্ন ভিন্ন বয়ান এমনকি খোদ নিহত মোস্তফার ভাই ও স্ত্রী এই মামলার যে বর্ণনা পুরো মামলায় করেন, সেখানে একটির সঙ্গে আরেকটির চরম অমিল লক্ষ করা যায়। এই মামলায় সাক্ষীদের এই অত্যন্ত সন্দেহজনক সাক্ষ্য, বক্তব্য-জবানবন্দিতে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেই যায় যে সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজিতে কুখ্যাত মোস্তফা তাহলে আসলে কীভাবে নিহত হয়েছিলেন? তিনি কি তবে ফ্রিডম পার্টির অন্তঃকলহে নিহত হয়েছিলেন, যেটা আমরা আগেও দেখেছি এবং প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করেছি যে কীভাবে একের পর এক ফ্রিডম পার্টির ক্যাডাররা নিজেদের কর্মীদেরই নিজেরা হত্যা করছেন। কিন্তু এই মামলায় সবচাইতে আশ্চর্যের ও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে খোদ মোস্তফার ‘ডেথ বেড জবানবন্দি’।

মোস্তফার ডেথ বেড জবানবন্দি যিনিই পড়বেন, তিনিই আসলে আমার মতো হতবিহ্বল কিংবা বিস্মিত হবেন এই দেখে যে ৯টি গুলি খাওয়া একজন চরম আহত ব্যক্তি অবলীলায় মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলছেন যে হারিস লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে গুলি করে। প্রশ্ন আসবেই যে মোস্তফা কী করে জানল—হারিসের সঙ্গে থাকা পিস্তল লাইসেন্স করা কিংবা না করা? আর হারিসের ক্ষেত্রে সব সাক্ষীই জবানবন্দিতে বলেছেন তিনি স্বাধীনকে গুলি করেছেন অথচ এমন একটা অবস্থায় ভিকটিমের কি আদৌ সেই মেন্টাল স্টেইট থাকা সম্ভব যে তিনি এই পুরো ঘটনার একটি ‘ভিভিড’ বর্ণনা দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকবেন? তিনি আবার বলছেন মাসুম ফাইভস্টার পিস্তল দিতে তার পায়ে গুলি করেন। আবারও প্রশ্ন এসে যায়, এমন একটা ‘ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় কোন পিস্তল ফাইভস্টার

কিংবা কোন পিস্তল কাটা রাইফেল কিংবা কোনটা নাইন এমএম এসবের দিকে লক্ষ রাখা? যাকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে বারবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার জবানবন্দিতে মনে হচ্ছে তিনি একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ, যিনি এমন হামলার মুহূর্তে (যদি হয়ে থাকে) সমস্ত ঘটনার পরিষ্কার চিত্র আঁকতে সক্ষম। আরো দেখার বিষয় হচ্ছে, তিনি তার জবানবন্দিতে একবার বলছেন লালমাটিয়া ৪/৮, ব্লক-এ-এর পূর্ব পাশে প্রেসের ভেতরের ঘটনা, আবার তার পক্ষের সাক্ষীরা বলছেন লালমাটিয়া, ব্লক-এ ৩/৭ নাম্বার বাড়ির সামনে ঘটনা।

এক অদ্ভুত কন্ট্রাডিকশন, বৈপরীত্য, সাংঘর্ষিক বক্তব্য, ভিন্ন ভিন্ন বয়ানে চলতে থাকে মোস্তফা হত্যা মামলার গতি আর প্রকৃতি। (চলবে)

লেখক :আইনজীবী

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x