করোনাকালে ঈদ উদযাপনে সর্তকতা 

করোনাকালে ঈদ উদযাপনে সর্তকতা 
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ। ছবি: ডয়চে ভেলে

একমাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের প্রধান উৎসব আর আনন্দের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর। আর এই সময়টাতে নাড়ির টানে পরিবারের সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য মানুষের দলে দলে গ্রামের পথে ছুটে চলার প্রবণতা চিরন্তন। তবে গত বছরের ন্যায় করোনার অতিমারীর তাণ্ডবে ঈদের আনন্দ অনেকটায় নিষ্প্রাণ।

এ বছর ঈদের আগে আগে আমরা সংক্রমণের নতুন পিক বা দ্বিতীয় ঢেউয়ের সম্মুখীন হয়েছি, তবে সংক্রমণের মাত্রা একটু একটু করে নামতে শুরু করেছে। কিন্তু তাই বলে নিশ্চিন্ত হওয়া বা আত্মতৃপ্তির কিছু নেই, করোনা অতিমারী চলে যায়নি। যে কোনো বড় ধরনের উৎসব, জনসমাগম, গণ-চলাচলের পরই আবার সংক্রমণের হার বাড়তে পরে। বিষয়টা মাথায় রেখেই আমাদের এ বছর ঈদ করতে হবে।

পবিত্র ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ উল্লাস ফুর্তি আর নতুন সাজে সজ্জিত হওয়া । আমাদের ঈদ সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা সবার জন্যই নতুন পোশাক, একটু ভালো খাবার দাবার আর আনন্দ বিনোদন করা। আর ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, বুকে জড়িয়ে ধরে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ, ফ্রেমে বন্দী অসংখ্য স্থিরচিত্র, বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়ের বাসায় বাসায় ঘোরাঘুরি, খাওয়া দাওয়া, মজা করা মুসলিমদের জন্য এক মহা আনন্দের। আর এসব কাজকর্মও ঈদের সংস্কৃতির অংশ। তবে করোনার অতিমারীর কারণে জগৎজুড়ে মানবজীবন আজ বিপর্যস্ত, ভেঙ্গে পড়ছে অর্থনীতির চাকা। করোনায় হানা দিয়েছে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক- শিক্ষা- সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় কার্যাবলী সহ সর্বক্ষেত্রে। ঈদকে ঘিরে অনেকেই তা কিভাবে পালন করবেন তা নিয়ে সবসময়ই থাকে নানামুখী পরিকল্পনা। কিন্তু ঈদের হাসি খুশি, আমেজ আর আনন্দ সবকিছুকে বদলে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে এই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। বিপর্যস্ত জনজীবন আর ঈদের আনন্দ এবার গৃহবন্দী, আতঙ্ক আর অস্বস্তির মধ্যে মানুষকে কাটাতে হচ্ছে সর্বক্ষণ।

ঈদে নিজ ঘরে থাকুন

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের এই ক্রান্তিকালে যে যেখানে আছেন সেখানেই সীমিত পরিসরে নিজ পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ করুন। নাড়ির টানে ঈদ উপলক্ষে শহরের হাজার হাজার মানুষ গ্রামে বা মফস্বলে পরিবারের কাছে ফিরে যান—এটাই রীতি, যুগ যুগ ধরে এই ঈদ সংস্কৃতি চলমান। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই বাড়ি যাওয়ার কারণে আপনি আপনার মা-বাবা বা স্বজনদের, এমনকি পাড়া প্রতিবেশী, গ্রামের জনগণকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারেন। গণ-পরিবহনে, ট্রেন–বাস, লঞ্চ বা উড়োজাহাজে যেভাবেই হোক, এ সময় চলাচল করা বিপদজনক। নিজের ও পরিবারের জন্য তো বটেই, যাঁদের কাছে যাচ্ছেন তাঁদের জন্যও। তাই করোনাকে শহর তেকে গ্রামে গিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া কোনো ক্রমেই উচিত নয়। চলাফেরা ভ্রমণ করা কিন্তু করোনা বিস্তার বাড়ায়, তাই স্বাস্থ্য-সুরক্ষা প্রটোকল বজায় রাখতে এবং খুব জরুরি না হলে ভ্রমণ ও ঘোরাফেরা থেকে বিরত থাকুন ।

ঈদের বাজার ও কেনাকাটা

বাচ্চাদেরসহ প্রিয়জনদের জন্য অনেকেই কেনাকাটা করতে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে ফুটপাথে,ছোট বড় দোকানে, বিপণি-বিতানে জনগণের উপচে-পড়া ভিড় বাড়ছে। এই জনসমাগম মহা-বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শুধু অত্যাবশ্যকীয় জিনিস ছাড়া কোনো কিছু কেনাকাটা থেকে বিরত থাকুন। কেনাকাটা করতে দোকানে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে যাবেন না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরে দূরত্ব মেনে চলতে ভুলবেন না। অনলাইনে কেনাকাটার ওপর নির্ভর করতে পারেন।

কোথায় ঈদের নামাজ পড়বেন

ঈদের নামাজ বড় খোলামেলা ময়দানে পড়া উচিত। কিন্তু সেখানে হাজার হাজার মানুষের ভীড় হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই উত্তম হবে নিজের এলাকার কোন মসজিদে নামাজের ব্যবস্থা করার। আবু দাউদ শরীফে উল্লেখ রয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার ঈদের দিনে বৃষ্টি হলো, তখন রসুল (স) তাদের নিয়ে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়লেন। উপরোক্ত হাদিস থেকে বুঝা যায়, বৃষ্টি বা অন্য কোন যুক্তিসঙ্গত দুর্যোগের কারণে ঈদের নামাজ মসজিদে পড়া যায়।

নামাজ পড়তে যাবার আগে বাসা থেকে অজু করে, জায়নামাজ নিয়ে যাবেন এবং মুখে মাস্ক পরে দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ আদায় করবেন। এক জায়গায় সবাই ভিড় না করে সারিবদ্ধভাবে দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদে প্রবেশ করবেন ও বের হবেন। তাড়াতাড়ি নামাজ সেরে যতটা কম সময় মসজিদে থাকা যায় তার চেষ্টা করুন। মসজিদে কারও সঙ্গে কোলাকুলি করা বা হাত মেলানো যাবে না। যারা বয়স্ক, যাদের নানা ধরনের রোগবালাই আছে, তাঁরা বাড়িতেই থাকুন।

এই ভাইরাস সাধারণত ড্রপলেট দিয়ে ছড়ায়,যা ফ্লোরে পড়ে থাকতে পারে। তাই মসজিদের পরিচ্ছন্নকর্মীদের পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে, যাতে ফ্লোর জীবাণু নাশক দিয়ে যথাযথ পরিষ্কার করা হয় ৷ মসজিদ কর্তৃপক্ষ মসজিদের প্রবেশপথ,মেঝে ও অজুর জায়গার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। প্রতি বার জামাতের নামাজের আগে মসজিদটি পুরোটা জীবাণুমুক্ত করে রাখবেন। এই কাজটি করা অত্যন্ত জরুরি।

ঈদ উৎসবে আর কি করা হয়

ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ উৎসবের দিন। এ উপলক্ষে প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজন-বন্ধু বান্ধব অনেকেই একত্রিত হয়ে থাকেন। তবে করোনা অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত সবার মঙ্গলের জন্যই এই জমায়েত, নেমন্তন্ন, আসা–যাওয়া পরিহার করতে হবে।স্বল্প পরিসরে পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়িতে ঈদ উদযাপন করুন। স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে টেলিফোন বা ভিডিও কলে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারেন। কাউকে এ সময় দাওয়াত করবেন না, কারও দাওয়াতে নিজেরাও যাবেন না । জীবন সবার আগে, বেচে থাকলে আর সবাই সুস্থ থাকলে ভবিষ্যতে আত্মীয় স্বজনের সংগে দেখা হবে। আগামীতে আরও ভালোভাবে ঈদ উদযাপন করার জন্য এই ত্যাগ স্বীকার টুকু করুন।

ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, মুসাফা বা করমর্দন, আর বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করা, ছোটদের চুমু দিয়ে আদর, বাচ্চা আর তরুণদের হুড়োহুড়ি, গরীব ও দুস্থদের আনাগোনা। এছাড়া পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় যাওয়া, তাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া,রাস্তাঘাটে, পার্কে, চিড়িয়াখানায় ঘোরাঘুরি, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রে আড্ডা মারা-এভাবেই কাটে ঈদের দিনটি। কিন্তু পরিবার ও প্রিয়জনদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এগুলো পরিহার করতে হবে। শারীরিক দূরত্বের বেড়াজালে এবারও আক্ষেপ থাকবে কোলাকুলি করতে না পারার।

জীবনের মূল্য সবচেয়ে বেশি, একথাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুতে অনেক পরিবারে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই হয়তো প্রিয়জনকে হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, আবার করোনা আক্রান্ত পরিবারে ঈদ নয়, যেন মহা বিষাদ। এধরনের ঈদ গতবার এসেছিল, এবারও আসছে, কবে তা শেষ হবে কেউ জানে না। তাই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সপরিবারে আনন্দের সঙ্গে নিজ নিজ বাসায় ঈদ করবেন।

ভিন্নমাত্রায় ঈদ উদযাপন

সার্বজনীন ঈদের আনন্দ ধারায় এবার কিছুটা হলেও বিঘ্ন ঘটবে। বিষণ্ণতায় ভরা এক স্মরণীয় দিন আমাদের ঈদযাত্রা যেন শব যাত্রায় পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তাই ঈদের আনন্দ মেটাতে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ। করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। কঠিন পরিস্থিতি হলেও বেঁচে থাকাই হোক এবার ঈদ উদযাপনের অঙ্গীকার। আত্মসচেতনতার কোন বিকল্প নাই। যদি আমরা নিজেরা সচেতন না হই, তাহলে এর মাশুল গুনতে হবে অনেক বিশাল, এমনকি ভালোবাসার মানুষগুলোর বিদায় এর মাধ্যমে।

সবার প্রতি আবেদন বা অনুরোধ

সবচেয়ে ভালো হবে আপনার এবারকার ঈদ বাজেট বিপদগ্রস্ত দুস্থ দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় করুন। ঈদে অপ্রয়োজনীয় খরচ না করে ওই অর্থগুলো অসহায় সহায়-সম্বলহীন মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে পারলে হবে সবচেয়ে বড় আনন্দের। সমাজের বিত্তবান ও সম্পদশালীদের প্রতি অনুরোধ, ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ-এই মর্মবাণী হৃদয়ে ধারণ করে অসহায় মানুষের পাশে এসে তারা যেন অবশ্যই দাঁড়ান। জাতির এই দুঃসময়ে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা যেন অসহায়, দু:স্থ, দরিদ্র ও খেটে খাওয়া অনাহারে-অর্ধাহারে জর্জরিত ক্ষুধার্ত মানুষদের মাঝে অর্থ, জামাকাপড় ও খাদ্য সামগ্রী বিলিয়ে দেন। চলমান করোনার ক্রান্তিকালে উপুর্যুপরি আঘাতে নিম্ন আয়ের মানুষ গুলোর আর্থিক সক্ষমতা একেবারেই পঙ্গুত্বের পর্যায়ে। কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি বিশাল এই জনগোষ্ঠীর ঈদ একটা দীর্ঘশ্বাসের উপলক্ষ মাত্র। তবে লক্ষ্য রাখবেন দান-খয়রাত বা জাকাত দেওয়ার সময় যেন জনসমাগম না হয়। কোনো রকম ভিড় না করে কাজগুলো সম্পন্ন করবেন।

সংক্রমণের হার কমতে শুরু করায় অনেকেই যে স্বস্তিতে আছেন, তা একেবারেই অমূলক। কারণ লোক সমাগম ও চলাচল বাড়লে এই হার আবারও বাড়তে পরে। আমরা যদি আরও কিছুদিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, তবে করোনার সংক্রমণকে পরাস্ত করতে পারব। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে, আর তা হতে পারে আরও মারাত্মক । তাই কোনোভাবেই গা-ছাড়া ভাব, শিথিলতা, উদাসীনতা, খামখেয়ালী-এসব করা যাবে না। আর যারা এখনো টিকা নেননি, তাঁরা প্রথম সুযোগেই টিকা নিয়ে নেবেন যখন সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

ভবিষ্যতে করোনার ধকল কাটিয়ে পৃথিবীর সব মানুষ একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে, আমরা আগের মতোই আনন্দ উদযাপন করব ইনশাআল্লাহ। আমাদের জীবনটাই তো আগে বাঁচাতে হবে। সুতরাং ঈদ উদযাপন জাকজমকভাবে এবার নাইবা করলাম। সবাইকে মনে রাখতে হবে, আগে জীবন বাঁচুক। উৎসব আনন্দের কি দাম আছে, যদি জীবনটাই চলে যায়। বেচে থাকলে আগামীতে অনেক আনন্দ উৎসব করা যাবে।তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঈদ উপলক্ষে সবাই যেন ছোটাছুটি না করে যে যেখানে আছেন সেখানেই ঈদ উদযাপন করবেন। ঈদুল ফিতরের পরিস্থিতি কঠিন হলেও বেঁচে থাকাই হোক এবার ঈদ উদযাপনের অঙ্গীকার। ঈদের আনন্দ যেন দুঃখ বয়ে না আনে, ঈদযাত্রা যেন পরিণত না হয় বিষাদময়, সেদিকেও সবাইকে মনোযোগ দিতে হবে, যত্নবান ও সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: ইউজিসি অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x