শেখ হাসিনাকে প্রথম দেখার অনুভূতি

শেখ হাসিনাকে প্রথম দেখার অনুভূতি
ছবি: ফেকাস বাংলা

শেখ হাসিনা দুটি শব্দের একটি বিস্ময়কর নাম। নিরাশার উপকূলে আশার বাতিঘর, ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি ,আজ নবপর্যায়ের বাংলাদেশের নতুন ইতিহাসের নির্মাতা ,আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাঙালীর গর্ব ও সম্মানের নাম শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, তার আজীবনের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল এই বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যার সময় বিদেশে থাকার কারনে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালের ৩রা মে দিল্লীতে নির্বাসিত শেখ হাসিনার বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ১৭ই মে রোববার তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। ওইদিন ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট জিয়া মন্ত্রীপরিষদ নিয়ে বৈঠকে বসেন।

বৈঠক শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজাকার শাহ্‌ আজিজুর রহমান বললেন শেখ হাসিনার ফেরাকে কেন্দ্র করে আমরা দেশে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছি। পরের দিন ৪ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এস.এম মোস্তাফিজুর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেন জন নিরাপত্তার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে দেয়া হবেনা। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বললেন "আমাকে হত্যা করা হলেও আমি মাতৃভূমিতে ফিরব"।

সামরিক সরকারের সমস্ত বাঁধা ছিন্ন করে ১৯৮১ সালের ১৭ই মে বিকাল ৪ টায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেদিন শুধু ঢাকার তেঁজগাও বিমান বন্দর নয়, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মতই তার কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সমগ্র ঢাকা নগরী জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে একটি ট্রাকে করে জাতীয় নেতৃবৃন্দক সাথে নিয়ে জনস্রোতের ঢেউ পেড়িয়ে তিনি মানিক এ্যাভিনিউয়ের জনসমুদ্রে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদলেন, সেই সাথে জনসমুদ্র হু হু করে কেঁদে উঠলো ঠিক যেনো বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি সৈকতে মাথা ঠুকে আছড়ে পড়ছে।

ঠিক নয় বছর আগে এভাবেই ১০ই জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাখো জনতার হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসায় সিক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন একই বিমান বন্দরে। সেদিন ১০ই জানুয়ারী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু কেঁদেছিলেন ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ সভ্রম হারানো মা, বোনের জন্য। আর ১৭ই মে ১৯৮১তে শেখ হাসিনা মানিক মিয়া এ্যাভিনিউয়ের জনসমুদ্রে কেঁদেছেন স্বজন হারানোর দূঃসহ বেদনায় মুহ্যমান হয়ে। প্রার্থক্য শুধু প্রেক্ষাপট। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন বিজয়ী জাতির মহানায়ক হিসেবে আর ১৭ই মে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন অন্ধকার বাংলায় আলোকবর্তিকা হয়ে। দুইজনেরই স্বদেশে চুড়ান্ত যাত্রা দিল্লি থেকে। জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা দৃপ্ত কন্ঠে বললেন- বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি দেশে এসেছি, আমি আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামীলীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।

বঙ্গবন্ধুকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কিন্তু আমার সৌভাগ্য হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কন্যা ১৭ই মে দেশে ফেরার পরেরদিন ১৮ই মে সোমবার জীবনে প্রথম শেখ হাসিনাকে দেখবার। তিনি ঢাকা থেকে লঞ্চে করে টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে মাদারীপুরের টেকেরহাটে লঞ্চঘাটে অপেক্ষামান হাজার হাজার নেতাকর্মীদের অনুরোধে কয়েক মিনিটের জন্য নামলেন। তিনি শুধু কাঁদছিলেন।

শেখ হাসিনার কান্না দেখে অনেকেরই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। তাকে এতটাই বিমর্ষ লাগছিল আমার কাছে মনে হয়েছিল খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে যেন আজকেই হত্যা করেছে। পরিবারের যদি একটি সদস্য মারা যায়, সেই শোক সইবার ক্ষমতা পরিবারের অন্যদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যায়। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রনায়ক আছেন, কিন্তু শেখ হাসিনার মত ১৭টি স্বজনের লাশের শোক কাউকে বহন করতে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

পরিবারের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনে বঙ্গবন্ধুর প্রেমী হয়েছি। বাংলাদেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও ভালবাসা দেখে তার আদর্শের সৈনিক হয়েছি । প্রতিকুল রাজনৈতিক পরিবেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্টায় ৮০র দশকে অস্থির সময়ে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে শিক্ষা, শান্তি ও প্রগ্রতির পতাকা হাতে লড়াই করেছি।আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান আমার রাজনিতীর শুরুতেই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসাবে পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব নেয়ায় যেমনি খুশি হয়েছি তেমনি ভয় ছিল খুনিরা কখন বঙ্গবন্ধুর রক্তের শেষ চিহ্ন কেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। প্রথম যখন রাজনীতি শুরু করি তখন তেমন কিছু বুঝতাম না। তবে এতটুকু বুঝতাম যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এই বাংলার মাটিতে হওয়া উচিৎ।

তখন রাজনীতি ছিল আদর্শ শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার। আওয়ামী লীগ ছিল একটি পরিবার। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সবাই একই পরিবারের সন্তান। ছাত্রলীগের বড় ভাইদের মনে হত নিজের আপন বড় ভাই। নিজের যেকোনো সমস্যা পরিবারকে জানানোর আগেই ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা জানত। তারাই পরিবারের একজন হয়ে সততা ও নিষ্ঠার সাথে প্রায় সকল সমস্যাই সমাধান করে দিত। সামরিক সরকারের অত্যাচার যত বাড়ত আমাদের একতা তত দৃঢ় হত। আমাদের গ্রামে কোন বাড়ি আওয়ামীলীগ, কোন বাড়ি বিএনপি, কোন বাড়ি জাতীয় পার্টি, কোন বাড়ি জামায়াত আমরা সবাই জানতাম।নির্বাচনের সময় যখন মিছিল হতো, আমাদের বাড়ির সামনে যখন বিরোধীদের মিছিল আসতো তখন স্লোগানের আওয়াজও বেড়ে যেত, আমরা খুব মজা করতাম। আমাদের ছিল শুধু জয় বাংলা স্লোগান এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। আমরা ক্যাসেটে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাজিয়ে দিতাম। হাটবাজারে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাজালে শত শত লোক জড় হত, কোন নেতার প্রয়োজন পরতো না ।

১৯৮৫ সালে আমি জার্মানিতে আসি। বার্লিনে এসে আমার আওয়ামী পরিবারের লোক খুঁজছিলাম, শুনলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র সাবেক ছাত্রনেতা মো: তারেক উচ্চশিক্ষার জন্য বার্লিনে আছেন। আমি তার সাথে যোগাযোগ করে তার বাসায় গিয়ে তারসাথে পরিচিত হলাম। আমার কাছে মনে হল আমি একজন আপন লোক খুঁজে পেয়েছি। খুব অল্পদিনে তিনি আমার হৃদয় শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় বড় ভাইয়ের স্থান করে নেন। সময় পেলেই তার কাছে ছুটে যেতাম, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের গল্প শুনতাম। মাঝে মধ্যেই রাজনীতি নিয়ে গুরু-শিষ্যের মত ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতাম। তিনি আমাকে বলতেন তোমারাতো ইতিহাস জানো না। তোমাদেরকে স্কুল কলেজে মিথ্যা, ইতিহাস পড়িয়েছে। রেডিও, টেলিভিশনের মাধ্যমে শুনিয়েছে মনগড়া, বানোয়াট, বিকৃতি ইতিহাস। যুদ্ধের ময়দান থেকে রাত্রে যখন ক্যাম্পে আসতাম রেডিওটা মাঝখানে রেখে আমরা সবাই গোল করে বসতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের "বজ্রকন্ঠ" শোনার জন্য অপেক্ষা করতাম। রাত্র ৯ টার পর ভাষনটি অল্প সময়ের পর পর বাজানো হত। খাওয়া দাওয়ার কথা ভুলে যেতাম, শুধু মনে হত ভাষনটি আর একবার শুনি। তারেক ভাই, যখন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন, মাঝে মাঝে তার চোখে পানি চলে আসতো। আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম বঙ্গবন্ধুর মত মহান নেতার এই বাংলায় জন্ম হয়েছিল।

পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো ক্ষমতায় আসার একদিন পর তারেক ভাইর বাসায় গেলাম তারেক ভাইকে বললাম রাজিব গান্ধী, বেনজির ভুট্টো, খালেদা জিয়া সবাই প্রধানমন্ত্রী হল। আমি মহান আল্লাহর নিকট নামাজ পড়ে দোয়া করি আমার প্রানপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা যদি একদিনের জন্য বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন আমরা বলতে পারতাম বঙ্গবন্ধুর কন্যাও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তারেক ভাই আমাকে বুকে জডিয়ে ধরলেন বললেন বঙ্গবন্ধু আমার হৃদয়ের স্পন্দন শেখ হাসিনা তোমার হৃদয়ের স্পন্দন তোমার মত কর্মীরা থাকলে অবশ্য শেখ হাসিনা ক্ষমতায় যাবে এবং শেখ হাসিনা হবে বাংলাদেশের দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রী। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সর্বাধিক ত্যাগ স্বীকার করার পরেও ৯১ এর নির্বাচনে পরাজয় অপ্রত্যাশিত ছিল। আওয়ামী বিরোধী সকল শক্তির কাছ থেকে শুনতাম আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে কোনোভাবেই আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। রাজপথে কত প্রান,কত রক্ত,কত ত্যাগ কত আবেগ, কত নিপিড়ন নির্যাতন সহ্য করে শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী।

আমার মত ক্ষুদ্র কর্মীর মনের আশা পূর্ণ হলো, বীর মুক্তিযোদ্ধা তারেক ভাইর কথা সত্যি হল আমার প্রানপ্রিয় নেত্রী আমাদের শ্রদ্ধেয় আপা শেখ হাসিনা বাংলাদেশর আজ দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রী। যেই মাটিতে একদিন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা অপরাধ ছিলো সেই মাটিতেই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসি হয়েছে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীরা মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হয়েছে সেই বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের চুড়ান্ত সুপারিশে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের জন্য আমরা যারা রাজনিতি শুরু করেছিলাম তাদের কাছে এর চেয়ে বড় পাওয়ার আর কি হতে পারে। আজ আমি গর্বিত আমি শেখ হাসিনার একজন কর্মী।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বার্লিন আওয়ামী লীগ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x