ভাঙা পরমাণু চুক্তিতে জোড়া দেওয়া কঠিন হবে

ভাঙা পরমাণু চুক্তিতে জোড়া দেওয়া কঠিন হবে
প্রতীকী ছবি

চলমান সময়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে যতগুলো হট স্পট বা উত্তেজনাকর অঞ্চল রয়েছে, তার মধ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যই এক নম্বরে, যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বিশ্বের এক নম্বর ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে আমেরিকার একান্ত অনুগত রেজা শাহের ক্ষমতা থেকে উত্খাত এবং শিয়াপন্থি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ত্রিমুখী শত্রুর কনস্ট্যান্ট হুমকির মধ্যে আছে ইরান। আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি বলয় এবং ইসরাইল—এই তিন পক্ষের হুমকি মাথায় নিয়ে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী সরকার ৪২ বছর টিকে আছে।

ইরানের ধর্মীয় নেতারা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করেছেন, শক্তিশালী ত্রিমুখী হুমকির সামনে টিকে থাকতে হলে সামরিক শক্তিসহ পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর প্রভাব ও কর্তৃত্ব এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আমেরিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইরানের প্রভাব ও কর্তৃত্ব যদি মধ্যপ্রাচ্যে বৃদ্ধি পায়, তাহলে উপরিউক্ত দুই স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থই বড় হুমকির মধ্যে পড়ে। এরকম একটা অবস্থায় ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটা সমঝোতা অথবা একটা ভারসাম্য রক্ষা করা উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত কঠিন কাজ। সুতরাং ১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকার সব প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রিজিমের পরিবর্তন ঘটাতে বহুরকম গোপন এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি।

বিপরীতে অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া ইরান সামরিক শক্তি বৃদ্ধিসহ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি এবং তার সুরক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান বড় আরেকটি কাজ করেছে, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, লেবানন ও প্যালেস্টাইনে শিয়া সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ করে মিলিশিয়া অবয়বে শক্তিশালী সশস্ত্র উপশক্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, যারা স্ব স্ব জায়গায় ঐ রাষ্ট্রসমূহের সেনাবাহিনী থেকে কম শক্তিশালী নয়। অর্থাৎ ইরান তার মিত্র হিসেবে সামরিক শক্তির বিস্তারটা পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এমনভাবে ঘটাতে পেরেছে, তাতে ইরানের ওপর যে কোনো বহিঃশক্তির আক্রমণ হলে ঐ সব মিলিশিয়া বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে।

ইরান ও তার মিত্রদের সম্মিলিত টার্গেট হবে ইসরাইল। তাতে দূরপাল্লার মিসাইল ও রকেট হামলায় ছোট আয়তনের ইসরাইল বড় ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে পড়বে, যা সহ্য করা ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে আমেরিকা ও ইসরাইলের মিসাইল আর রকেটের আঘাতে ইরান একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের সম্মুখীন হলেও ইরাকের মতো ইরানকে কখনো তারা দখল করে নিতে পারবে না। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে না, কারণ রাশিয়া ও চীন তার প্রবল বিরোধিতা করবে। সুতরাং যুদ্ধ মানেই উভয় পক্ষের ধ্বংসদূত। এক পক্ষের একতরফা বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ কারণেই দুই-তিন বার ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়ার পরেও আমেরিকা পিছিয়ে গেছে।

প্রথমত, মিথ্যা অভিযোগে ২০০৩ সালে আমেরিকা কর্তৃক ইরাক দখলের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল পূর্ব আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরাক, দুই দিক থেকে একই সময়ে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালালে তার মোকাবিলায় ইরানের ইসলামি বিজিস টিকতে পারবে না। কিন্তু লেবাননের হিজবুল্লাহ, প্যালেস্টাইনের হামাস এবং ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনের মিলিশিয়া বাহিনী ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিসাইল ও রকেট আক্রমণ শুরু করলে যুদ্ধের বিস্তৃতি পুরো মধ্যেপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং তার সব দায়দায়িত্ব পড়বে আমেরিকার ওপর, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে উঠবে। পুরো ইসলামিক বিশ্ব আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবে, উগ্রবাদী ইসলামিস্ট জিহাদি সশস্ত্র গোষ্ঠী বিশ্বব্যাপী আমেরিকার স্বার্থের ওপর গোপন ও আত্মঘাতী আক্রমণ শুরু করতে পারে—যেমনটি দেখা গেছে ১৯৯৮ সালে, তখন কেনিয়া ও তানজেনিয়ায় আমেরিকান দূতাবাসের ওপর আত্মঘাতী বোমা আক্রমণ চালায় সোমালিয়ার জঙ্গি গোষ্ঠী আল-শাবাব বাহিনী। অর্থাত্ যুদ্ধের কোনো বাউন্ডারি থাকবে না।

সুতরাং সেই বার আমেরিকা ইরাক পর্যন্তই শেষ করে, আর এগোয়নি। দ্বিতীয়বার ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আবার একটা যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমেরিকা আর এগোয়নি। ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুকুমে ইরানের রেভল্যুশন গার্ড বাহিনী কুদশ ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাশেম সোলায়মানিকে ইরাকের বিমানবন্দরের সন্নিকটে ড্রোন থেকে মিসাইল ছুড়ে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ইরান-আমেরিকার মধ্যে আবার যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হলে আমেরিকার জন্য বহুমুখী সংকট তৈরি করবে। প্রথমত নেগোসিয়েশন টেবিলে ইরানের বার্গেইনিং ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। ইসরাইলের জন্য একটা স্থায়ী থ্রেট হয়ে থাকবে, তাতে সুবিধা পাবে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও প্যালেস্টাইনের হামাস।

দ্বিতীয়ত, ইরান পারমাণবিক বোমা বানালে সৌদি রাজপরিবার নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় যে কোনো মূল্যে পারমাণবিক বোমা বানাবার চেষ্টা করবে এবং বানাবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পারমাণবিক বোমার অত্যাধুনিক ও নতুন সংস্করণ আসছে। ছোট আকারের সেই বোমা স্বল্প পরিসরে রক্ষণাবেক্ষণ, বহন এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যাবে। পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক বোমা রয়েছে, তারপর আরো দুটি মুসলিম রাষ্ট্র ইরান ও সৌদি আরবের হাতে সেটি আসলে ভবিষ্যতে তার মিনি সংস্করণ যদি আল-কায়েদা, তালেবানসহ উগ্রবাদীদের হাতে পড়ে, তাহলে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের জন্য কত বিপজ্জনক হবে, তা ভাবনায় এলে যে কোনো শান্তিপ্রিয় মানুষ ভিরমি খেয়ে পড়বে। তাই সাম্প্রতিক সময়ের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উপলব্ধি করেন, ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে বা সামরিক পন্থায় ইরানকে পরাস্ত করা যাবে না এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখাও সম্ভব হবে না। সুতরাং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ইরানের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে ওবামা প্রশাসন।

বিশ্বের অন্য সব বড় শক্তি চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানিও আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রায় দুই বছর যাবত্ সব রকম কাঠখড় পোড়ানোর আলোচনায় ২০১৫ সালে এসে একটা উইন উইন সমঝোতা হয়। সমঝোতার মূল কথা, শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি ইরান সীমিত আকারে চালু রাখতে পারবে, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা চুক্তিতে বেঁধে দেওয়া মাত্রার ওপর নিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কমিশন নিয়মিত ইরানের সব প্ল্যান্ট পরিদর্শনের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করবে। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা আমেরিকা তুলে নেবে। আত্মরক্ষার জন্য মিসাইলসহ সব কনভেনশনাল অস্ত্র ইরান তৈরি করতে পারবে। ২০১৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য প্লাস জার্মানি ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার নামকরণ হয় জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)। এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আমেরিকার দুই স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু, সৌদি আরব ও ইসরাইয়েল বেজায় খেপে যায়। এই দুই রাষ্ট্রের একই কথা, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে একটা সময় পর্যন্ত হয়তো ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে পারবে না, কিন্তু এই ফুসরতে কনভেনশনাল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের যে সুযোগ পাবে, তাতে একটা সময়ে এসে ইরানের প্রভাব ও কর্তৃত্বের বিস্তার ঘটবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে, যা শেষ বিচারে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যাবে। আমেরিকান ইহুদি লবির প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে বারাক ওবামা উইস্টন চার্চিলের একটা উক্তির পুনরুল্লেখ করেন, They are ready to make great sacrifices for their opinions, but they have no opinion. প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ২০১৮ সালে চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন। চুক্তি বাতিলের পরিণতি সম্পর্কে ইউরোপের সব নেতা অনেক চেষ্টা করেও ট্রাম্পকে বোঝাতে ব্যর্থ হন। জো বাইডেন নির্বাচনের সময়ই ঘোষণা দেন তিনি চুক্তি পুনর্বহাল করবেন।

সব পক্ষের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। করোনার ভয়াবহতার মধ্যেও জেনেভায় কয়েক দফা বৈঠক হয়ে গেছে। ভাঙা চুক্তিতে ফেরা নতুন চুক্তি করার চেয়ে কঠিন। তাই কোন কথায় কী ফসকে যায়, সবাই চুপচাপ। ২০১৮ সালে চুক্তি বাতিলের পর বিশ্বের ভূরাজনৈতিক মাঠের অনেক ঘটনাই ইরানের পক্ষে এসেছে। এই গত ২৭ মার্চ ইরান ও চীনের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ইরান-তুরস্কের মধ্যে এবং ইরান-তুরস্কের সঙ্গে চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো, যা ইরানকে শক্তি জোগাবে। ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যে নতুনভাবে রাশিয়ার প্রবেশ ও অবস্থানের ফলে যে মেরুকরণ হচ্ছে তার সবকিছুই আমেরিকার বিপক্ষে যাচ্ছে। গত বছরে বেলারুশ এবং ২০১৪ থেকে সম্প্রতি ইউক্রেনকেন্দ্রিক ঘটনাবলিতে রাশিয়ার প্রাধান্য ইঙ্গিত দেয়, আগামী দিনে ইউরোপীয় ফ্রন্টে আমেরিকা স্বস্তিতে থাকতে পারবে না। সুতরাং দেন-দরবারের টেবিলে ইরান এখন অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। ইরান চাপ সৃষ্টি করবে এই মর্মে যে, একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে গিয়ে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তাই নতুন করে আস্থা রাখা কঠিন। আমেরিকা হয়তো চাইবে, চুক্তি হুবহু আগের মতোই হোক। অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া ইরানের জন্য এই সময়ে জরুরি কিন্তু কট্টরপন্থিরা নতুন শর্ত গ্রহণ করতে চাইবে না। দুই পক্ষের জন্যই উভয় সংকট আছে। সুতরাং ভাঙা চুক্তিতে জোড়া লাগানো সহজ নয়, কঠিন কাজ হবে।

লেখক: গবেষক এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x