মোস্তফা হত্যা মামলা

জোসেফ, হারিস ও আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?

পর্ব-৫
জোসেফ, হারিস ও আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?
প্রতীকী ছবি

মোস্তফার মৃত্যুকালীন বিবৃতি একদিকে যেমন বিস্ময়ের জন্ম দেয়, অন্যদিকে নানান দিক থেকে ভাবনা জাগায় এর সত্যতা সম্পর্কে। রাশেদ বনাম রাষ্ট্র মামলায় (১২ এসসিওবি-২০১৯, এডি-৩৪, ৭২ ডিএলআর) আদালত জানায়, মৃত্যুকালীন বিবৃতির জন্য তিনটি মানদণ্ডের প্রয়োজন—(১) অন্তর্নিহিত সত্য কি না, (২) মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে তার আক্রমণকারীকে শনাক্তকরণ বা নামকরণের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না এবং (৩) এটি বাইরের কোনো পক্ষের অনুরোধমুক্ত এবং মামলার অন্যান্য প্রমাণ ও পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না।

Nemo moriturus praesumitur mentire, যার অর্থ মৃত্যুর মুখে কারো মিথ্যা বলার কথা নয়—এই সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ৩২ ধারায়। কিন্তু প্রশ্ন এসেই যায়, ওপরে উল্লেখিত মানদণ্ডের প্রশ্নে মোস্তফার বক্তব্য ঠিক কতটুকু উের যায়। একই সঙ্গে শাহাবুদ্দিন বনাম রাষ্ট্র (৬১ ডিএলআর) মামলায় আদালত বলেছে, যেসব মামলায় আহত ব্যক্তির মানসিক সুস্থতা ছিল মর্মে কোনো মেডিক্যাল সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় এবং সেটির অনুপস্থিতিতে একজন ‘ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি রয়েছে’ এই মর্মে বিবেচনায় নেওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ যে ‘আহত ব্যক্তির মনের অবস্থা ভালো ছিল’। একইভাবে রাষ্ট্র বনাম বাদল মিয়া মামলায় (২৪ বিএলডি) বলা হচ্ছে, যিনি মৃত্যুকালীন বিবৃতি দেবেন, তিনি সচেতন ও স্বাভাবিক মনের অধিকারী ছিলেন কি না, সেটিও আদালত দেখবে।

আমি যদি ওপরের এ দুটি আলোচনাকে এক সূত্রে বাঁধতে চাই, তাহলে প্রথমেই চলে আসে মানদণ্ডের কথা, যেখানে স্পষ্ট বলা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার কিংবা তাদের নামকরণের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না। আগের পর্বগুলোতে মোস্তফার ব্যাপারে যে ইতিহাস আমরা টেনেছি, সেখানে পরিষ্কারভাবে লক্ষ করা গেছে মোস্তফার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পুরো ফিরিস্তি। কীভাবে তিনি চাঁদাবাজি করতেন, দোকানপাট লুট করতেন, চাঁদা না দিলে কিংবা সরকারি কর্মচারীকেও তিনি তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে রেহাই দিতেন না।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নিহত মোস্তফা ফ্রিডম পার্টির রাজনীতি করতেন এবং বলা চলে ফ্রিডম পার্টির একজন সন্ত্রাসী হিসেবেই ছিল তার সমস্ত ভূমিকা। ফলে ঐ একই এলাকায় তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও হারিস আহমেদ ছিলেন তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব পর্যালোচনা করলে একটি ব্যাপার স্পষ্ট হতে পারে, মোস্তফার রাজনৈতিক জিঘাংসা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, মৃত্যুকালীন তার সেই ক্ষোভ-জিঘাংসা তিনি মেটাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এক ব্যক্তি ৯টি গুলি বিদ্ধ হওয়ার পর ক্রমাগতভাবে তাকে বিদ্ধ করার পিস্তলের নাম, কোন ব্র্যান্ডের কিংবা কে কোন দিক থেকে সেই গুলি করছে, এটার যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেটা এক কথায় অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তাকে যে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই হিসেবে তো নয়ই।

আমরা যদি খুব কাছ থেকে মোস্তফার জবানবন্দির সঙ্গে তার সঙ্গে থাকা স্বাধীন, বাহার কিংবা তার ভাই পাগলা মিজান, আরেক ভাই শাহজান হাওলাদার, সিডিএস প্রিন্টারের কর্মচারী সাঈদুর কিংবা সেলিম চৌধুরীর বক্তব্যকে মেলাতে যাই, তাহলে দেখতে পাই প্রত্যেকের বক্তব্যের তারতম্য রয়েছে কী বাক্যে, কী শব্দে কিংবা পুরো ঘটনার বর্ণনায়। কিন্তু আগের পর্বের মতো এটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, এই মামলার বাদী মোস্তফার স্ত্রীর যে এজাহার, সেটির সঙ্গে এই মামলার ভিকটিম কিংবা সাক্ষীদের সামান্যতম মিল নেই। এখানে খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন এসেই যায়, যেখানে বাদীর এজাহারের সঙ্গে সাক্ষীর বক্তব্যের এই পর্যায়ের তারতম্য থেকে যায়, সেখানে ন্যায়বিচার কী করে রক্ষিত হয়?

একটি কথা এখানে বলা বাঞ্ছনীয় যে, আমি মহামান্য আদালতের ওপর কোনো সন্দেহ কিংবা তাদের প্রতি প্রশ্নও উত্থাপন করছি না। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, মহামান্য আদালত যা বলেন কিংবা যে সিদ্ধান্ত দেন, সেটিই আমাদের মেনে নিতে হবে এবং সেটাই শিরোধার্য। কিন্তু একটি মামলা যখন তার তদন্ত পর্যায়ে, জবানবন্দি পর্যায়ে কিংবা পুলিশি রিপোর্ট অথবা ম্যাজিস্ট্রেটের রিপোর্ট পর্যায়ে অনিয়মের সঙ্গে এগোয়, তখন সেটি মহামান্য আদালতকে চরমভাবে মিসগাইডেড করে। আইনি নীতিতে বলা হয়, ‘১০ জন অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাক, কিন্তু একজন নিরপরাধ যেন বিনা দোষে শাস্তি না পায়।’ কিন্তু আমরা এই মামলায় পরিষ্কারভাবে অনিয়ম দেখতে পাই এবং আদালতকে মিসগাইড করার সমস্ত আলামত দেখতে পাই।

এই মামলায় মোহাম্মদ শাহজাহান হাওলাদার, যিনি নিহত মোস্তফার ভাই, তিনিও জবানবন্দি প্রদান করেন। তার জবানবন্দি একটি ‘হিয়ার্সি’ অ্যাভিডেন্স, যার মানে দাঁড়ায় শোনা কথা। যিনি নিজে কিছু দেখেননি বরং এসব তিনি শুনেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেই বাহার এসে শাহজাহানকে এই দুর্ঘটনার কথা জানান, সেই বাহারের বক্তব্যের সঙ্গেও শাহজাহানের বক্তব্যের অনেক অমিল স্পষ্ট লক্ষ করা যায়। শাহজাহান তার জবানবন্দিতে বলতে পারেননি তার ভাইকে তিনি ঠিক শরীরের কোন কোন জায়গায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখেছেন।

একটা বিশেষ ব্যাপার লক্ষণীয়, এই শাহজাহানের জেরার ক্ষেত্রে যেখানে তিনি বলছেন যে তার ভাই ফ্রিডম পার্টির রাজনীতি করতেন কি না, এটি তিনি জানতেন না, একইভাবে তিনি জানতেন না যে তার ভাই তত্কালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গুলি করার মামলায় আসামি ছিলেন কি না। তিনি একই সঙ্গে জানতেন না তার ভাই সরকারি কর্মচারীকে (এলজিইডি ভবনে) মারধর করেছেন কি না, কিংবা তার আয় বা ব্যয় সম্পর্কে। এটি রীতিমতো অবিশ্বাস্য যে মোস্তফা তত্কালীন ঢাকা শহরে ছিলেন একজন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। যদি আমরা ঢাকা শহরকে ছোট করে এনে শুধু মোহাম্মদপুর এলাকাতেই অন্তত নজর দিই, তাহলে দেখতে পাই মোস্তফার নামে তখন অন্তত তিনটি মামলার অস্তিত্ব রয়েছে, যেটা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে বলা হয়েছে।

আমি পাঠকদের কাছে বিনীতভাবে প্রশ্ন করতে চাই, আপন মায়ের পেটের ভাই জানেন না তার ভাই শহরের এত বড় সন্ত্রাসী, যখন তার ভাইয়ের নামে ইতিমধ্যে তিন তিনটি মামলা। এমনকি তার ভাই তত্কালীন কমিশনার পাগলা মিজানকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা, যেখানে একজন সরকারি কর্মচারীকে হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে সেই সরকারি কর্মচারী মোস্তফার ব্যাপারে তার ভাই পাগলা মিজানের কাছে বিচার দেয় এবং সেই বিচার কেন দেওয়া হলো সেই পরিপ্রেক্ষিতে এসে সরকারি অফিসের টিভি নিয়ে যাওয়া, ভাঙচুর করা, চাঁদা দাবি করা—এই সবকিছুই শাহজাহান সাহেবের অজানা? এই একটি কথাও কি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে?

আমি এই বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তুলছি এ কারণেই যে মোস্তফার ভাই পাগলা মিজান তার জবানবন্দিতে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘আমার ভাই মোস্তফা ও রাজিব সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে থানায় ও জেলখানায় গিয়াছে’; যেখানে আপন এক ভাই বলছেন, ‘আমার ভাই সন্ত্রাসী, আমার ভাই চাঁদাবাজ’, সেখানে আরেক ভাই বলছেন আমার ভাই সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, মামলা ছিল কিনা জানি না। পাঠক, আপনাদের হাতেই আমি বিচারের ভার ছেড়ে দিচ্ছি এ ক্ষেত্রে।

মোস্তফা হত্যা মামলায় এ কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে তত্কালীন মামলাটির তদন্ত পর্যায় থেকে শুরু করে এর সমস্ত রিপোর্ট ও জবানবন্দি প্রশ্নবিদ্ধ। জোসেফ-হারিসের রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির ফলে মোস্তফার চাঁদাবাজিতে বাধা, মোস্তফার ভাই পাগলা মিজানের ক্রমাগত জমি দখল, হাজি মকবুল হোসেনের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি—এই সবকিছুতে বাধা হয়ে দাঁড়ান তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও হারিস আহমেদ। আর এই হাজি মকবুল সিন্ডিকেটের অন্যতম সঙ্গী মোস্তফার নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেটিকে মোস্তফা মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে এই সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মাথায় থাকে একটি হিসাব, ‘মোস্তফা মারা যাচ্ছে, কিন্তু এই মৃত্যু দিয়ে যদি অন্য শত্রুদের উপড়ে ফেলা যায় তাহলে মন্দ কী?’ ব্যস, এই লক্ষ্যেই মূলত চালিত হয়েছে পুরো মামলা।

যেই মামলায় একটি সাক্ষীর বক্তব্য আরেকটি সাক্ষ্যের বক্তব্যের পুরো উলটো। যেই মামলায় মূল বাদীর অভিযোগের সঙ্গে সাক্ষীদের ঘটনার দূরতম মিল পর্যন্ত নেই, যেই নিহতের ভাই পাগলা মিজান স্পষ্ট আদালতে বলেন যে তার ভাই সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ, সেই মামলা শেষ পর্যন্ত নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট কিংবা অ্যাপিলেট ডিভিশনে টিকে যায় কী করে? কী রায় দিয়েছে নিম্ন আদালত কিংবা হাইকোর্ট কিংবা অ্যাপিলেট ডিভিশন? বলব সে কথা আগামী পর্বে।

জানতে পারবেন এক অমোঘ সত্য। বিচারের বাণী কি আসলেই নিভৃতে কাঁদে? আসলেই কি আদালতকে ভিন্ন পথ দেখিয়ে মিসগাইড করেছে প্রশাসন কিংবা একটি সিন্ডিকেট?

লেখক: আইনজীবী

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x