‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে’

‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে’
প্রতীকী ছবি

করোনা মহামারির বিস্তার রোধে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যথাসম্ভব ঘরে থাকতে। অন্য মানুষজনের সঙ্গ ও ভিড় এড়িয়ে চলতে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ কিছুতেই ঘরে থাকতে চাইছে না। সুযোগ পেলেই বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। এদেশের মানুষ যেন কাজী নজরুলের কবিতার মতো সংকল্প করেছে :‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগত্টাকে,—/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।/ দেশ হতে দেশ দেশান্তরে/ ছুটছে তারা কেমন করে,/ কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,/ কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণাকে।’ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। সেখানে হাসপাতালগুলো করোনা রোগীতে উপচে পড়ছে। বেড নেই, অক্সিজেন নেই, ভেন্টিলেটর নেই, এমনকি কোথাও কোথাও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের সত্কারেরও সুবন্দোবস্ত নেই। বেওয়ারিশ লাশ গঙ্গায় ভেসে উঠছে। এসব খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারও করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের তাতে হুঁশ নেই। ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী অনেক মানুষ স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি ঘোষণাকে প্রহসনে পরিণত করে দিগ্বিদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

এ কথা ঠিক যে, মানুষের নানা রকম সমস্যা আছে। রুটি-রুজির জন্য অনেককেই বাইরে বেরোতে হয়। আরো নানা প্রয়োজনে অনেকের পক্ষে ঘরে থাকা সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে কেবল শখের বশে বা ঘরে মন টিকছে না বলে বাইরে বের হওয়া মানুষের সংখ্যাও আমাদের দেশে খুব কম নয়। আসলে মানুষ বেশিক্ষণ চিত হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না—এটা সম্ভবত সবচেয়ে বড় একটা সমস্যা। বেশি ক্ষণ চিত হয়ে শুয়ে থাকতে না পারার কারণে তাকে বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাকে বাইরে বেরোতে হয়, আড্ডা দিতে হয়, বেড়াতে যেতে হয়, মন ভালো রাখার জন্য নানা কিছু করতে হয়। মানুষ যেমন দীর্ঘক্ষণ চিত হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না, ঠিক তেমনি এক জায়গায় অনেকক্ষণ বসে থাকতেও পারে না। আবার বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরিও করতে পারে না। বেশির ভাগ মানুষ শুয়ে থাকলে উঠে বসতে চায়। বসে থাকলে দাঁড়াতে বা হাঁটতে চায়। হাঁটলে আবার বিশ্রাম চায়। মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ নেই। চাওয়ার রকমেরও কোনো সীমা নেই।

বাঙালির সমস্যা আরো বিচিত্র ও প্রবল। আকাঙ্ক্ষা আর কৌতূহলের কোনো সীমা নেই। বাঙালি সব আরাম-আয়েশ নিয়ে বেহেশতে থাকলেও স্রেফ কৌতূহলের বশে বিকালে একটু দোজখটা দেখে আসতে চাইবে। জমায়েত, জটলা, ভিড়, হট্টগোল, উদ্দেশ্যহীন একটু টো-টো করে ঘোরা, একশ্রেণির বাঙালির ভীষণ প্রিয়। এদেশে রাস্তার উন্নয়নকাজে যদি একটা গর্ত খোঁড়া হয়, সেখানেও শত শত মানুষ ভিড় জমায়। তাকিয়ে দেখে সেই গর্ত খোঁড়ার দৃশ্য। অনেকে অনেক প্রশ্নও করে। কোনো কিছু ভালোভাবে না জেনে অনেক মানুষ আবার সেসব অবান্তর প্রশ্নের মনগড়া জবাবও দেয়। এ নিয়ে ঝগড়াও হয়। বাঙালির স্বভাব বড়ই বিচিত্র।

এবার এপ্রিল মাসে করোনা-সংক্রমণ আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে আরোপ করা হয়েছে বেশ কিছু বিধিনিষেধ। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এসব বিধিনিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। এর মধ্যে ঈদ আসায় সবকিছু তামাশায় পরিণত হয়। ঈদ আমাদের দেশের মানুষের কাছে এক অন্য রকম আবেগ ও চাঞ্চল্যের নাম। ঈদ এলে মানুষ গ্রামে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে যায়। কিছু মানুষ জীবন দিয়ে হলেও সে সময় ঘরে ফিরতে চায়। নাড়ির টান, শেকড়ে ফেরা, হোম সিকনেস ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের দেশের মানুষের কাছে অনেক প্রিয়। নিজের এলাকায়, নিজের বাড়িতে ফিরতে, সেখানে নিজের মতো করে থাকতে তাই তো সবাইকে মরিয়া চেষ্টা চালাতে দেখা যায়। বাঙালির হোম সিকনেস খুবই বেশি, বাস্তুভিটে আঁকড়ে পড়ে থাকতে তার জুড়ি নেই। শত কষ্ট করেও পিতৃপুরুষের জমিটুকু ধরে রেখেছেন, এমন বাঙালি খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না। রুটি-রুজির প্রয়োজনে বাঙালি ঘরের বাইরে যায় বটে, কিন্তু ঘরের জন্য প্রাণ সারাক্ষণ আনচান করে। তাই তো একটু ছুটি পেলেই ছুটে যায় বাড়িতে। বাড়িতে গিয়ে আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে ঈদ করতেই হবে। তাই তো সব ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে নিজ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে মানুষ মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে। বাস, রেল বা লঞ্চের মতো গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও, গত কয়েক দিন ধরে নানাভাবে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে, ঢাকা, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জের বিপুলসংখ্যক মানুষ। পরিবার-পরিজন, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ট্রাকে, অটোতে, মোটরসাইকেলে, মুরগির গাড়িতে, ঝুলে, পাইপ বেয়ে লঞ্চে উঠে, এমনকি হেঁটেও বাড়িতে পৌঁছেছে। একই কায়দায় আবার ফিরেও এসেছে।

অথচ করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সবাইকে নিজ বাড়িতে থাকার এবং যাতায়াত না করার তাগিদ দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। প্রায় দুই মাস ধরে দেশে অঘোষিত লকডাউনও চলছে, দূরপাল্লার বাস, ট্রেনসহ অনেক গণপরিবহন বন্ধ রেখে নানাভাবে মানুষকে বাধা দেওয়া ও নিরুত্সাহিত করার পরেও দেখা গেছে তারা গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে বাড়ি গেছে। সোজা পথে না গিয়ে বাঁকা পথে গেছে। অনেকে ভয়ানক হয়রানির শিকার হলেও বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা ঠেকানো যায়নি। বাড়িমুখী মানুষের ঢল দেখে পুলিশ ও প্রশাসনও ‘মরবি মর’ নীতি অবলম্বন করেছে। তারা ঢিলেঢালাভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। প্রথমে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখলেও শেষ পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষার কাছে প্রতিকূলতা, দুর্ভোগ, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবকিছু মার খেয়েছে। ঈদে এক দিনের জন্য হলেও পরিবারের সঙ্গে কাটানোর ব্যাকুলতা রুখে দেওয়ার সাধ্য কার?

কিছু মানুষের এমন বেপরোয়া আচরণের জন্য অনেকে সরকারকে দায়ী করছে। সরকার কেন আরো কঠোর হলো না অথবা ঈদে মানুষ বাড়ি যাবেই, এমন বাস্তবতায় গণপরিবহন খুলে দিয়ে মানুষের চলাচল কেন নিরাপদ ও স্বস্তির করা হলো না—এমন মন্তব্য শোনা গেছে। তবে সব দোষ সরকারের ওপর চাপানোটা সম্ভবত যুক্তিসংগত নয়। ফরাসি দার্শনিক জোসেফ দ্য মেস্ত্র একদা একটি মূল্যবান কথা বলেছিলেন, মানুষ তার যোগ্য সরকারই পেয়ে থাকে। বাংলাদেশের নাগরিকদের এক বড় অংশ এখনো মনে করে, করোনা হচ্ছে বড়লোকের রোগ, গরিবের করোনা হয় না। তারা তাবিজ, ওঝা, পিরের পানিপড়া, ফুঁ, মাদুলি, কবচসহ নানাবিধ অবৈজ্ঞানিক কার্যকলাপের ওপর আস্থা রাখে। এটা কেবল যে শিক্ষার অভাব তা নয়, এটা যুক্তিবুদ্ধির অভাব, আরো সহজ ভাষায় বললে, কাণ্ডজ্ঞানের অভাব। আমাদের দেশের নাগরিকদের একাংশের মধ্যে এখনো এই কাণ্ডজ্ঞানের অভাব যথেষ্ট। তারা আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে যৌথ অপরিণামদর্শী আচরণ ও কার্যকলাপ দিয়ে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে কাছে আনবে, তারপর কারো মৃত্যু হলে স্বজনরা মাতম করবে, আর এর-ওর ওপর দায় চাপাবে।

কাণ্ডজ্ঞানহীন বাঙালি আবার সমালোচনা ও পরশ্রীকাতরতায়ও অদ্বিতীয়। বঙ্গবন্ধুর তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান আর একটা হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষাতেই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, পরশ্রীকাতরতা। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে পরশ্রীকাতর বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সব ভাষাতেই পাবেন, সব জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সব রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।’

অবশ্য বাঙালিদের সম্পর্কে সবচেয়ে অপবাদসূচক কথাটি বলেছেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ প্রশাসনের ইস্পাত-কাঠামোর স্থপতি লর্ড মেকলে। তিনি বলেছেন, ‘বাঘের কাছে থাবা যা, মৌমাছির কাছে হুল যা, মহিষের কাছে শিং যা, নারীর কাছে সৌন্দর্য যা, একজন বাঙালির কাছে প্রতারণাও তা।’

তবে অন্যের সঙ্গে প্রতারণার পাশাপাশি বাঙালি নিজের সঙ্গে অর্থাত্ আত্মপ্রতারণাও করে। তা না হলে ঘরে থাকার নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দলে দলে মানুষ ঘরের বাইরে বের হবে কেন?

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x