অন্তর্জালের আসক্তি!

অন্তর্জালের আসক্তি!
প্রতীকী ছবি

আজ থেকে কয়েক দশক আগে ও পারস্পরিক মেলামেশা শারীরিক উপস্থিতি এবং বৃহৎ পরিসরে অংশগ্রহণের মাঝেই স্বাভাবিক সৌন্দর্য স্ফুটিত হতো। অথচ বিজ্ঞানের আশীর্বাদ দশক কয়েকের ব্যবধানে অন্তর্জালের অদম্য বিস্তৃতি এবং নেট দুনিয়ায় অবাধ প্রবাহ বিশ্ব আজ এক গ্রামে বা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। যার প্রভাবে জীবনের গতিপথে তরংগের উপস্থিতিতে এবং এর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিতে মাঝেমাঝে আমরা যেন খেই হারিয়ে ফেলছি।ভাবতে ও লজ্জা লাগে আমরা সামাজিক জীব। এমন কেন হলো?ভেবে দেখার কি ফুসরত আছ? সামনে আমাদের গন্তব্য কোথায়? প্রজন্মই বা কোন দিকে হাঁটছে? এসবের মাঝে কি বিপরীতমুখী প্রবণতার উপস্থিতি প্রবাহমান?

সামাজিক যোগাযোগের ব্যাপ্তি ও প্রসার পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং দুনিয়ার সর্বত্র দৃশ্যমান।এমন কোন জাতি সত্তার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না যারা কিনা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয। সহজেই এবং হাতের স্পর্শে ই সারা দুনিয়ায় বিচরণের সহজ মওকা কে ই বা হাতছাড়া করবে?যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় তারা অনেক কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন । এসব ছাড়া যেন আমাদের এক মুহূর্ত ও চলে না। সারা বিশ্বে ১৮০ কোটির মত মানুষ এ মাধ্যমে সক্রিয়। যেখানটায় আমাদের অবস্থান দশম।নারী-পুরুষ সবাই সমহারে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখে এর মাঝে ডুব দিয়ে মুক্তার সন্ধান করছে। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এদেশে তিন কোটি উনঅাশি লক্ষ বার হাজার মানুষ কেবল ফেসবুকের সঙ্গে মিতালি পেতেছে।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এখন আর মানুষ সাবেকি প্রথায় সংবাদের স্বাদ নেয় না। স্মার্টফোন এবং আইফোনের কল্যাণে ব্যবহারকারীর টাইমলাইন ও নিউজ ফিড ভরে যায় নানা প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় সংবাদে।ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৭০ শতাংশেরই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এবং বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের ৮০ শতাংশের ফেসবুকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় এ মাধ্যম ২০০৪ সালে মার্ক জাকারবার্গের হাত ধরে নেটদুনিয়ায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়।যার স্পর্শ এবং সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকার হিম্মত কেউ পায় না। এসব ছাড়া ও মেসেঞ্জার ভাইভার টেলিগ্রাম ইউটিউব হোয়াটসঅ্যাপ এবং গুগল সহ নানা মাধ্যমে মানব সমাজের উপস্থিতি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

ইন্টারনেট আসক্তি বাড়ছে

কে নেই এ মাধ্যমে? আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শিক্ষক-ছাত্র সাংবাদিক চাকরিজীবী গৃহিণী সবার মেলবন্ধনে আবেগহীন চাকচিক্য এবং সংস্কৃতি।যার মোহ এবং টানে ঘুম থেকে উঠে এবং বিছানায় শুয়ে শুয়ে ও এর উপস্থিতি মননে মস্তিষ্কে অনুরণিত হয়।বিশ্বে ১০ থেকে ১৭ বছরের সীমায় ৬০শতাংশ ব্যবহারকারী এ নেশায় মগ্ন। কি এমন নেশা? যার আসক্তি পুরো দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে মাতাল হওয়ার পেছনের রহস্যটা কি? এ যেন সারা দুনিয়ার সবার প্রশ্ন?এ নেশায় বুঁদ হয়ে ভাল কিছু করার ও সুযোগ পাওয়া যায। এ জগতে মাঝে মাঝে ভালো মনের মানুষ এবং সুন্দর কার্যক্রমের উপস্থিতি ই এর অনস্বীকার্যতা জানান দেয়। পাশাপাশি অস্বাভাবিক প্রবেশাধিকার প্রেম এবং বল্গাহীন মানসিকতার় কুৎসিত আকৃতি ও প্রায়শই দৃশ্যপটে গোচরীভূত হয়।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ফেসবুকের আসক্তি মাদক বা কোকেন গ্রহণের মতো মনে ও মগজে আলোড়ন তুলছে। এর ব্যবহার চোখে এবং মেরুদন্ডে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। এসব মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ পর্নো সাইট এবং গুজব কার্যক্রম উম্মুক্ত। দেশের উঠতি বয়সী তরুণদের সামাজিক মূল্য এবং মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হতে এসব বৈকল্য বিকৃত বিনোদন এর দিকে ঝুঁকে যাওয়ার প্রবণতা ই মনুষত্ব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে ফাটল ধরাচ্ছে।

প্রজন্ম এখন আর বই খেলাধুলায় মনোনিবেশনে আগ্রহ ও তৃপ্তি পেতে চায় না। সারাক্ষণ নেটদুনিয়ায় বিচরণের মাঝেই নিজেদের এবং জাতির শারীরিক মানসিক এবং সামাজিকভাবে বিকলাঙ্গতা করছে। ২০০৯ সালে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় এসব মাধ্যমে আসক্তির প্রভাবে সরাসরি যোগাযোগ কমেছে। হতাশাও একাকীত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা এবং পোস্ট শেয়ারের প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে। এসব মাধ্যম যারা সারাক্ষণ ব্যবহার করে তাদের মাঝে প্রায়ই হতাশা চাপ উদ্বিগ্নতা এবং নিজেকে তুলনা করার বাতিক দেখা যায়। অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অলসতা ঘরে থাকার প্রবণতা কর্মক্ষমতা হ্রাস চিন্তা রাজ্যে অস্থিরতা মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলার প্রতি অনাগ্রহ নানাবিধ সংকট চাহিদা ও যোগানের ব্যবধানে অসম প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এমন ব্যবহারকারীর বড় একটি অংশ অস্থিরতায় ভোগে যারা কিনা অন্যকে ট্রল করে মজা পায়।

সন্তানের ইন্টারনেট আসক্তি নিয়ন্ত্রণে আনার ৭ উপায়

পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতা করোনার শিক্ষা এবং নিউ -নরমাল প্রেক্ষিত এসব বিবেচনায় গত বছর দেড়েক নীতিগত এবং প্রয়োজনের তাগিদেই আমাদেরকে এসব ডিভাইসের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করতে হয়েছে। ফলে ঘরে বসেই যেমন কর্মক্ষেত্রের কার্যক্রম পরিচালনা কনফারেন্সে যোগদান ব্যাংকিং লেনদেন কেনাকাটা, বিমান বাস ট্রেনের টিকেটের প্রাপ্যতা, ডাক্তারি পরামর্শ, রক্তদাতা সংগ্রহ অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর অবারিত দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ফলে সময় অর্থ এবং শ্রমের সাশ্রয় হচ্ছে। এমনকি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা ও গুগল মিট ক্লাসরুমের সঙ্গে অভিযোজনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এসব ইতিবাচক এ মাধ্যমের আশীর্বাদ। এসবের আড়ালে আমরা মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিতে মুহ্যমান হয়ে যাচ্ছি না তো? এখানটায় শংকা।

প্রজন্মের সফলতার মাঝেই আমরা আনন্দ ও তৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা করি। একবার ও কি ভেবেছি টিনএজারদের হাতে এসব অ্যাপস এর অভিযোজন ও আসক্তির ধরিয়ে আমরা কি নিজের পায়ে কুঠারাঘাত করছি কি না? যেখানটায় পন্ডিতজিরা ও অস্থিরতা হতাশা ও চাপে সারাক্ষণ এ মাধ্যমে নিজেকে মত্ত রেখে এবং বুঁদ হয়ে অশুদ্ধ শব্দচয়নে এবং বাংলিশ রূপায়ণে পোস্ট এবং শেয়ারে ব্যস্ত। আসক্তির ছোবল যে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। যখন দেখি শিক্ষাগুরু পরীক্ষার হলে বসে সামাজিক যোগাযোগে সময় ব্যয় করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা সভা-সমাবেশের মতো প্রয়োজনীয় বিষয়ের পয়গাম খানা ও যখন এ মাধ্যমে সেঁটে দিয়ে কর্তাব্যক্তিরা ঢেকুর তুলেন। তখন বিহ্বলিত না হয়ে কি থাকা যায়? খামখেয়ালিপনার তো একটা সীমা থাকা চাই? চাইলেই এ আসক্তি থেকে বের হওয়া যাবেনা। এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে আমরা চাই নিজেদের ভালো দিকগুলো সবার সামনে উপস্থাপন করতে। অনেকেই মাত্রাতিরিক্ত পোস্ট দেই যা নেশায় পরিণত হয়ে যায়।স্মার্টফোন আমাদের সবাইকে একসঙ্গে আলাদা করে ফেলেছে। এ জগতে আবেগের বালাই নেই হাজার ও বন্ধুর ভিড়ে আন্তরিকতার হাহাকার। এ খানটায় মানুষ চেনা দায়।

অনেকে ফেক আইডি এবং লক আইডি ব্যবহার করে। যা সন্দেহ দুশ্চিন্তার এবং অবিশ্বাসের কারণ ও বটে। ছদ্মনামের আইডির উপস্থিতি সন্দেহ অবিশ্বাস এবং অস্থিরতার সংকেত দিচ্ছে। অনেক সময় ছোট বাচ্চা পাহাড়-নদী এলাকার নামে বাহারি আইডির ছড়াছড়ি যা গুজব ও স্যাবুটাসের জন্ম দিচ্ছে। উত্তরাধুনিকতায় এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনে আগাতে হবে।এ থেকে দূরে থেকে খুব বেশি ফায়দা হবে না। বরং ইতিবাচক সম্পৃক্ততার মাঝেই সার্থকতা খুঁজতে হবে। অপরিচিত কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ভাবতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারে সাবধানি হতে হবে। এবং সাইবার বুলিং এর শিকার হলে অস্থিরতা এবং বিমর্ষ না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করা লাগবে।

এসব মাধ্যমের সামাজিক এবং জাগতিক প্রয়োজনীয় হেতু একে বয়কট না করে ইতিবাচক ব্যবহার এবং মোহ অাসক্তি পরিহার করে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা দরকার। পাশাপাশি বই পড়া অবসরে ভ্রমণ পিতা-মাতাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলে নীতি-নৈতিকতা এবং ভালোবাসা চর্চার মাঝেই আসক্তি নিয়ন্ত্রণের কৌশল রপ্ত করা যেতে পারে।

লেখক: শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x