ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে

ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে
প্রতীকী ছবি

২০১৫ সালের ঘটনা, বিয়ের কথা চূড়ান্ত করার সময় যৌতুক হিসেবে দাবি করা হয় ১ লাখ টাকা। সংসারের হাজারো অভাবের মধ্যে পুরো টাকা দিতে হয় সালমার বাবা মাকে। বিয়ে হয় সালমার, কিন্তু বিয়ের পরবর্তী মাস থেকেই শুরু হয় অকথ্য পাশবিক নির্যাতন। ধীরে ধীরে সালমার স্বামী ও শ্বশুর দাবি করতে থাকে আরও অনেক। দিনদিন নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। শারীরিক নির্যাতনের এই মাত্রা সহ্য করতে না পেরে বাবার বাড়িতে চলে আসে সালমা।

কিছুদিনের মধ্যে গ্রাম জুড়ে ওঠে গুঞ্জন। বিভিন্নভাবে আলোচিত হতে থাকে সালমার জীবন। এক পর্যায়ে, গ্রামের সর্ব সাধারণের আঙ্গুল সালমার দিকে। সালমার বাবা-মা আর অন্য আত্মীয় স্বজনদের কাছে এ আলোচনা আরও তিক্ত হতে থাকে। সালমাকে শ্বশুর বাড়ি ফেরত যেতে বলা হয়। তাকে বলা হয় ‘এর মাঝেই মানিয়ে নিতে হবে’।

মানিয়ে নিতেই শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যায় সালমা। এবার নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায় আরও বহুগুণ। অমানবিক সেই নির্যাতন পাশবিকতার যেকোনো পর্যায়কে হার মানাবে। শেষে একদিন হাত-পা বেঁধে তার গলায় এসিড ঢেলে দেয় সালমার স্বামী। হাত-পা চেপে ধরে ছিল তার শ্বশুর-শাশুড়ি। তার আর্তনাদ আর চিৎকার ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরানোর মত ছিল। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।

নিজের ঘর রেখে অন্যের ঘরকে আপন বলে মেনে নিয়েছিলেন সালমা। নিজের বাবা-মাকে রেখে এদেরকেই নিজের আপন ভেবেছিল বাংলার আর পাঁচটা ঘরের মেয়ের মতন।

মানিয়ে নেওয়ার কঠোর বাস্তবতায় সালমা আজ শয্যাশায়ী, বিচার চেয়ে আইনের শরণাপন্ন হয় সালমার বাবা। পাঁচ বছর ধরে কোর্টের বারান্দায় ঘুরপাক খেলেও কিন্তু বিচার মেলেনি তাদের।

No description available.

হয়ত এই সালমাই হতে পারতো কোনো ব্যবসা সফল উদ্যোক্তা, হয়ত তাকে পাওয়া যেতো পত্র-পত্রিকার শিরোনামে ‘এভারেস্ট বিজয়ী সালমা কিংবা, চক হাতে কোনো স্কুল শিক্ষকের স্থানে’।

কিন্তু সে আজ হাসপাতালের বিছানায়, তাকে খাবার খাওয়ানো হয় টিউবের মাধ্যমে, অকথ্য শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণায় সালমা এখন স্থবির।

২০২০ সালে সালমার এ আলোচনা উঠে আসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর সাউথ এশিয়া ডিরেক্টর মিনাকশি গাঙ্গুলির কলমে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বেড়ে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনা, মেয়েদের সামাজিক ও অনলাইন হয়রানি, তাদের বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সতর্কতা কিংবা সুশীল সমাজের সচেতন বক্তব্য প্রভাব ফেলছে না এসবে। কমছে না এ সকল ঘটনা।

তবে, কি কারণে সমাজের বিবেক বিকল হয়ে পড়ে আছে?

নারী মুক্তি ও অধিকার কর্মীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা ভিকটিম ব্লেমিং এর অপসংস্কৃতি। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের একটা বিশাল অংশ মনস্তাত্ত্বিকভাবে পুরুষ নির্ভর এবং একই সঙ্গে তারা নারী স্বাধীনতা মেনে নেওয়ায় রাজি নন। একারণেই আমাদের মেয়েরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন না। তারা মানিয়ে নিতে চান, তাদের পরিবার আত্মীয় স্বজন এটাই তাদের বলে থাকেন। আর এই অন্যায়ের সঙ্গে আপোষই দিনদিন অন্যায়কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে দেয়৷

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বিবাহিত মেয়ে কিংবা নারী নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হন। ‘ম্যারিটাল রেপ’ বা বিবাহ পরবর্তী ধর্ষণের স্বীকার হন। কিন্তু তাদের মাঝে অধিকাংশই আওয়াজ তোলেন না। স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

এমনকি, যারা এর থেকে বের হতে চায় এবং তাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রশাসনের সহায়তা চান, তাদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ।

No description available.

যাবতীয় ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ে তাদের পরামর্শ দেওয়া হয় চুপ করে সহ্য করার কিংবা দোষ তাদেরকেই দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক আরও কিছু ঘটনায় আলোকপাত করা হলে চোখে স্পষ্টভাবেই ধরা দেবে ভিকটিম ব্লেমিং এর ভয়াবহতা। রাজধানীর কলা বাগানে ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী ধর্ষণের পর মৃত্যু। পত্র-পত্রিকাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুল আলোচনা ও সমালোচনা হয়। যেখানে একটি বিশাল অংশের মতামত হচ্ছে -দোষ মেয়েটির। সত্যিই কি তাই?

রাজধানীর গুলশানে একটি ফ্লাটে ২১ বছর বয়সী এক তরুণীর ঝুলন্ত লাশ, আত্মহত্যায় মারা গেছে বলে জানান পুলিশ। তরুণীর বড় বোন এ নিয়ে মামলা করেন মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড এর নামে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে ওঠে ঝড়, বিভিন্নভাবেই দোষারোপ করা হয় এই তরুণীকে।

এভাবে, বিগত সময়ে কল্পনা চাকমা, নুসরাত জাহান, ইয়াসমিন আক্তার, কিংবা তনুদের ক্ষেত্রে সমাজের বিশাল অংশ আলোচনা করেছে ভিকটিমদের দোষ।

এসব আলোচনায় উপস্থিতি দেখা যায় দেশের নানান স্তরের ব্যক্তিবর্গের। দোষ দেওয়া হয়েছে ভিকটিমকেই। ভিকটিমের পোশাক, তার চলাফেরাকে ঘিরে উঠেছে নানাবিধ প্রশ্ন।

ভিকটিম ব্লেমিংয়ের এ প্রবণতা ধর্ষণের ভয়াবহতার চিত্রকে হালকা করে রেখে দেয় সমাজের চোখে। ফলে সমাজের মানুষ ভিকটিমের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতাকে তার প্রাপ্য ছিল বলে মনে করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিচার প্রক্রিয়াকেও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে।

‘ভিকটিম ব্লেমিং’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন সাইকোলজিস্ট উইলিয়াম রায়েন, তার বই ‘ব্লেমিং দ্যা ভিকটিম’ এ, যেটি রচনা করা হয় ১৯৭১ সালে। তৎকালীন আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায় আর অবিচারকে বিচার করা হতো ভিন্নভাবে। কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে অন্যায় করার পর বিচারের আঙ্গুল তোলা হতো তাদের দিকেই। আমেরিকার মানুষের এই ভাব আর চিন্তাধারাকে উইলিয়াম রায়েন ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ নামে সংজ্ঞায়িত করেন।

সাউদার্ন কান্নিকটাকাট স্টেট ইউনিভার্সিটির এর গবেষণা অনুযায়ী, ভিকটিম ব্লেমিং বলতে সমাজের সেই অবস্থাকে বোঝানো হয়, যে অবস্থায় একজন সহিংসতার শিকার অথবা আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার চারপাশের আলোচনার মাধ্যমে এটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, তার সঙ্গে যেটা হয়েছে তা তার প্রাপ্য ছিল।

এ অবস্থায় ভিকটিম তার নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের ব্যাপারে কথা বলতে নিরাপদ বোধ করেন না। আর সমাজের এ আচরণে একজন অপরাধীর অপরাধ যেমন হালকাভাবে ধরা দেয়, তেমনি অন্য একজন প্রেরণা পায়। আর ক্রমশেই বাড়তে থাকে অপরাধ।

বর্তমানে সারা বিশ্বের নারী মুক্তি ও অধিকার কর্মীদের প্রধান চিন্তার স্থান ভিকটিম ব্লেমিংকে বন্ধ করা। বাংলাদেশেও নারীপক্ষ, সি ডিসাইড মুভমেন্ট ও অন্যান্য নারী সংগঠকদের চিন্তা ও দাবির স্থানে রয়েছে ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করা।

নীল রঙের চশমায় পৃথিবীকে নীল দেখালেও পৃথিবীর রঙ নীল নয়। বাস্তবতা কখনো মিথ্যে হওয়ার সুযোগ নেই। মস্তিষ্কের এলোমেলো জট বাধানো আর নোংরা ফ্রেমের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা একটি মতামত বদলে দিতে পারে পুরো সমাজের চিন্তা ধারা। তাই, ভিকটিমকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকা এবং ভিকটিম ব্লেমিং এর নামে নারী ও তরুণীদের শোষণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে সেই প্রত্যাশাই করেন বিশেষজ্ঞ মহল।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x