অভিবাসী ইস্যুতে কমলা হ্যারিসকে কঠোর হতেই হতো

অভিবাসী ইস্যুতে কমলা হ্যারিসকে কঠোর হতেই হতো
ছবি: সংগৃহীত

অভিবাসীদের উদ্দেশে কমলা হ্যারিসের বার্তা আমার হূদয় ভেঙে দিয়েছে। আমেরিকার ম্যাডাম ভাইস প্রেসিডেন্ট তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গুয়েতেমালা ও মেক্সিকো সফরকে বেছে নিয়েছিলেন এবং অভিবাসীদের আমেরিকায় প্রবেশ না করার অসার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যে শুধু জিওপি (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি) তথা রিপাবলিকানদের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হচ্ছে তা নয়, বরং বিশিষ্ট ডেমোক্র্যাটদেরও সমালোচনার শিকার হচ্ছেন।

‘এই অঞ্চলের যেসব মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে আমেরিকা-মেক্সিকোর বর্ডারে আসার চিন্তাভাবনা করছে, তাদের আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, আপনারা আসবেন না, আপনারা আসবেন না।’ গুয়েতেমালার প্রেসিডেন্ট আলেজান্দ্রো গিয়াম্মাত্তেইয়ের সঙ্গে যৌথ প্রেস কনফারেন্সের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন কমলা হ্যারিস। হ্যারিস আরো বলেছেন, ‘আমেরিকা আইন প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে এবং আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখবে। আপনারা যদি আমাদের সীমান্তে আসেন, আপনাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’

হোয়াইট হাউজ ইতিমধ্যে হ্যারিসের অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্যের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গুয়েতেমালায় অভিভাসীদের উদ্দেশে হ্যারিসের করা মন্তব্য ‘আমেরিকায় আসবেন না’-এর সপক্ষে প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘যেটি ভাইস প্রেসিডেন্ট সাধারণভাবে বলতে চেয়েছেন, সেটি হচ্ছে আরো অনেক কাজ করার দরকার রয়েছে।’

রিপাবলিকানদের জন্য দিনটি ছিল একটা জুতসই দিন, সেই সঙ্গে ফক্স নিউজের তির্যক খোঁচাখুুঁচি তো আছেই। এমনকি NBC নিউজের ইন্টারভিউতে হ্যারিস তার সীমান্ত পরিদর্শনের বিষয়ে নিজের বক্তব্যের সপক্ষে বলেছেন, আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে মানুষের স্রোত আটকানোর বিষয়টিতে খুব তাড়াতাড়িই কোনো সমাধান আসছে না। তিনি রিপাবলিকানদের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তিনি তো এখনো সীমান্ত সফরে যাননি।

‘এবং আমি এখন পর্যন্ত ইউরোপে যাইনি।’ ইন্টারভিউতে হ্যারিস বলেন, ‘এবং এর মানে হচ্ছে, আপনারা যে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করছেন, তা আমি বুঝতে পারছি না। সীমান্তের গুরুত্বের বিষয়টি আমি ছাড় দিয়ে দেখছি না।’

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস ওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া অকাসিও-কর্টেজের বক্তব্যই সবার আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ‘এটা অবশ্যই হতাশাজনক।’ তিনি হ্যারিসের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, ‘প্রথমত, আমেরিকার যে কোনো সীমান্তে আশ্রয় চাওয়ার শতভাগ বৈধ উপায় হচ্ছে এখানে আসা।’ ওকাসিও কর্টেজ বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, আমেরিকা কয়েক দশক ধরে লাতিন আমেরিকার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রেখেছে। আমরা কারো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তারপর কেন তারা পালিয়ে চলে এলো তা বলে অভিযোগ করতে পারি না।’

আমেরিকার কাস্টম ও বর্ডার প্যাট্রলের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে অন্তত ১ লাখ ৭৮ হাজার অভিবাসী আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই গুয়েতেমালার। গত ২০ বছরের মধ্যে এটিই এক মাসে সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান।

যদিও কেউ প্রত্যাশা করছে না কমলা হ্যারিস রাতারাতি অভিবাসী সমস্যার সমধান করবে, কিন্তু তার অসার মন্তব্য আমাকেও অবাক/বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। আমি মনে করি, একজন ভারতীয় অভিবাসী মায়ের কন্যা/মেয়ে হিসেবে হ্যারিসের প্রতি আমার প্রত্যাশা অভিবাসীদের প্রতি তিনি আরো সহানুভূতিশীল হবেন। যেসব অভিবাসী আমেরিকায় আসার জন্য বিপজ্জনক পথে যাত্রা করে, তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার পেছনের কারণগুলোও বিবেচ্য। এটি অবশ্যই দৃষ্টিকটু যে, অভিবাসী ইস্যু নিয়ে বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্প প্রশাসনের মতোই কঠোর এবং হূদয়হীন।

সাংবাদিক মারিয়া হিনোজোসা টুইট করেছেন, ‘আমি মাত্রই দেখলাম ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ উদ্বাস্তুদের বলেছেন, আপনারা আসবেন না।’ সত্যি কথা বলতে, আমি আপনাদের বলতে চাই, আমার হূদয় ভেঙে গিয়েছে। একজন মহিলা যিনি নিজেই একজন অভিবাসীর মেয়ে/কন্যা, তিনি সেই সব অসহায় মানুষের উদ্দেশ্যেই এমন কথা বলছেন, এটা সত্যি হূদয়বিদারক। তার মানে কি এই যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যাও এবং নিজের ভালোবাসার মানুষের হাতে খুন হও? বিপদের মধ্যে থেকে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হও?’

হিনোজোসার সঙ্গে আমি একমত না হয়ে পারছি না, প্রথম কালো এবং এশিয়ান নারী হিসেবে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী পদে আসীন হয়ে হ্যারিসের অভিবাসী ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর হওয়া ছাড়া কি কোনো পথ ছিল? নিদেনপক্ষে, তাকে অবশ্যই কঠোরতার বেশ ধারণ করতেই হতো। এখন যেহেতু প্রেসিডেন্ট বাইডেন কমলা হ্যারিসকে গভীর রাজনৈতিক এবং জটিল বিষয়ের দায়িত্ব প্রদান করেছেন, একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে হ্যারিস যদি ‘আমেরিকায় চলে আসো’—এই বার্তা দিতে যান এবং গুয়েতেমালা এবং মেক্সিকো সফরে গিয়ে অভিবাসী ইস্যুতে নমনীয় মনোভাব দেখাতেন তখন তাকে তীব্র ও নেতিবাচক পালটা আঘাত সামলাতে হতো।

ভাইস প্রেসিডেন্টের বর্তমান বেসামাল অবস্থা আমাদেরকে এ কথাই মনে করিয়ে দেয়, কোনো অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কেবল একটি অবস্থানই যথেষ্ট নয়। এবং একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী ক্ষমতায় থেকে আপনি কাউকেই খুশি করতে পারবেন না। একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী হয়ে ক্ষমতায় থেকে আপনি কাউকে খুশি করতে পারবেন না।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর : নাজমুল আলম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x