ইসরায়েলের ঘরে ঘরে ‘নেতানিয়াহু’

ইসরায়েলের ঘরে ঘরে ‘নেতানিয়াহু’
ছবি: সংগৃহীত।

ফিলিস্তিনিদের দিকে, তাদের ভূখণ্ডের দিকে সার্বক্ষণিক তাক করে থাকা ‘কামান’টির নাম ইসরাইল বললে এতটুকু অত্যুক্তি হয় না। এই কামানের রসদ জোগানদাতা যে যুক্তরাষ্ট্র, তাও সবার জানা। কামানের কলকবজা মেরামতে সর্বদা উদারহস্ত আরো দুই মিত্র পরাশক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্স।

ফিলিস্তিনিদের ধ্বংসযজ্ঞের খতিয়ান দিয়ে পরিমাপ হয় কামানের কার্যকারিতা! তাই কামানটির চালকের আসনে কে বসল, তাতে কামানের সামনে থাকা জানমালের ঝুঁকি এতটুকু হেরফের হয় না। নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রিত্ব অবসানের সম্ভাবনায় তাই উল্লসিত হওয়ার কিছু তো নেই-ই; হাঁফ ছাড়ার কথা উচ্চারণও বেমানান।

ইসরাইল সেই লঙ্কা, যার শাসকদের সবাই রাবণ; যারা গদিনশিন ছিলেন এবং আগামীদিনে কুরসিতে বসবনে, তাদের সবারই পুঁজি ফিলিস্তিনবিদ্বেষ। নেতানিয়াহুর উত্তরসূরি হিসেবে যিনি সামনে এসেছেন, সেই নাফতালি বেনেট বরং আরেক কাঠি সরেস। কট্টর ডানপন্থি ইয়ামিনা দলের এই প্রধান দুই রাষ্ট্র সমাধানেই বিশ্বাসী নন।

ফিলিস্তিনিদের বেঘোর মৃত্যু, নরকসম দুর্দশা দেখে ইসরাইলের যতই শাপশাপান্ত করা হোক, চাই কি তাদের কাঁধে হাত রাখা যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করা হোক, তাতে পরিস্থিতির কিছুমাত্র ইতরবিশেষ হবে না। ন্যায্য কথাটি একযোগে বলার অবস্থানে নেই আরব বিশ্ব। এমনকি গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরাও নেই এক ছাতার তলে।

হামাস ও ফাতাহ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে তারা। ফাতাহও অখণ্ড নয়, তারও টুকরো কয়েকটি। এছাড়া পূর্ব জেরুজালেম, এমনকি লেবানন ও জর্দানে থাকা ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও ঐক্য নেই। দীর্ঘ বঞ্চনার জীবন আর অনিঃশেষ লড়াই লড়তে লড়তে তারা যতটা না ক্লান্ত, তার চেয়ে বেশি হতাশ। কিন্তু লড়াইয়ে অস্ত্রের প্রয়োজন যতটা, ঐক্য তার চেয়ে কম দরকারি নয় বরং কার্যকারিতায় দ্বিতীয়টিই বেশি এগিয়ে।

জায়নবাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, দুইই পরিষ্কার। ফলে দুনিয়ার কারো অজানা নয় যে গাজায় আবার যে কোনো সময় ইসরাইলের ‘গজব’ নেমে আসবে। কিন্তু এবারের ১১ দিন ধরে ইসরাইল ঝাঁকে ঝাঁকে যত না বোমা ফেলেছে গাজায়, তার চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি মানুষ বিশ্বব্যাপী তাদের বিরুদ্ধাচারণে রাজপথে নেমেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভ ন্যায্যতার পক্ষে বিরাট উচ্চারণ। এমনকি আমেরিকান ইহুদিদের কট্টর ডানপন্থার বিপরীতে সরে যাওয়াকে অভূতপূর্বই বলতে হয়। ইসরাইলি দখলদারির বিরুদ্ধে গলা চড়ানো মার্কিন ডেমোক্র্যাট নেতার সংখ্যাও বাড়তির দিকে। ফলত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ‘অবস্থান’ পরিবর্তন দেখল বিশ্ব। ন্যাটো নেতারাও বৈশ্বিক জনমতের চাপে ইসরাইল-নীতিতে বদলের কথা ভাবছেন। ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিও দাঁড়াচ্ছে শক্ত ভিতে। তবে কি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ অত্যাসন্ন? বানরের রুটি ভাগের মতো ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দখল নিতে নিতে প্রায় ‘কিছুই’ বাকি রাখেনি ইসরাইল। দুই চিলতে যে ভূখণ্ড পড়ে আছে, দৃশ্যত তাতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভবই ঠেকে।

হ্যাঁ, হামাসের প্রতিরোধক্ষমতা ধ্বংস করতে সফল হয়নি ইসরাইল। হিজবুল্লাহকে কাবু করতে পারেনি। সংঘাতের দশক পেরিয়ে গেলেও টলেনি সিরিয়ার আসাদ সরকার। জেনারেল সোলাইমান কাসেমি, ‘বোমার জনক’ খ্যাত শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহকে হত্যা করে ইরানকে কমজোরি করা যায়নি বরং এখন আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তারা। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কাল ঘাম ছুটিয়েও সৌদি আরবের প্রাপ্তির ঘর শূন্য। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এর একটিও ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ক্রমে বলশালী হওয়া তুরস্কের অবস্থানও একইভাবে ফিলিস্তিনের ভরসা হয়ে দুলছে। রাশিয়া, চীন যেভাবে ইসরাইল ও তার মিত্রদের মাথাব্যথার কারণ। একই ভাবে মিশরের সঙ্গে ইরানের বাতচিতে তাদের কপালের ভাঁজ আরো গভীর।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিকে আব্রাহাম আকর্ডের চক্করে চার আরব দেশের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর ফিলিস্তিনিদের দিশাহীন অবস্থায় ফেলেছিল। সেই অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটল হামাসের লাগাতার ‘রকেট বৃষ্টির’ তোড়ে। ইসরাইল ভাসেনি ঠিকই, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে তার পা টলছে! ফলে ফিলিস্তিনিদের হতবিশ্বাস পেয়েছে পুনর্জীবন। কিন্তু তাদের নেতৃত্বের খরা এখনো কাটেনি। ইয়াছির আরাফাতের মতো একজন সর্বজনীন নেতার অভাব তাদের দুর্ভোগ আরো প্রলম্বিত করবে করছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন আপনাআপনি আসার নয়, আদায় করার বিষয়। তেমন নেতৃত্বের অভাব রয়েছে আরব বিশ্বেও।

কিন্তু ইসরাইলে ফিলিস্তিনিদের আরো পিষে মারার পক্ষে সহায়ক নেতৃত্বের অভাব নেই। বেনেটের পর প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব নেবেন যিনি, সেই ইয়েস আতিদ দলের নেতা ইয়ার লাপিডও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জোট পাকিয়েছেন। হবু অর্থমন্ত্রী আভিদগোর লিভারম্যান, বিচারমন্ত্রী গিদেন সায়ার, আরেক নেতা বেনি গানত্স, এরা সবাই এক সময় নেতানিয়াহুর সরকারে ছিলেন। সুতরাং তারা সবই এক নৌকার যাত্রী। প্রথমবারের মতো ইসরাইল সরকারের অংশ হতে যাওয়া আরব দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রায়ামকে যে কৌশলগত মিত্র বানানো হয়েছে, তা কারো অজানা নয়। নেতানিয়াহুর বিদায়, একা নেয়ানিয়াহুর ব্যক্তিগত ক্ষতি। নতুন নেতৃত্ব ইসরাইলের আরব নাগরিকদের জন্য যেমন কিছু বয়ে আনবে না, ফিলিস্তিন প্রশ্নেও ইহুদি রাষ্ট্রটির ‘নীতিগত’ অবস্থান একচুল বদল হবে না।

তবে ইসরাইলকে ‘অন্ধভাবে’ সমর্থন দেওয়া সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য আর ততটা সহজ হবে না। বৈশ্বিক জনমত, মহামারির ধাক্কায় ভূরাজনীতিও বদলাচ্ছে। এরই মধ্যে ইরসাইলকে ‘সন্ত্রাসী’ দাগিয়ে দিয়ে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে আয়ারল্যান্ড। দেরিতে হলেও আরবদেরও বুঝে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের সুস্থিতির ‘নার্ভ’ ফিলিস্তিন।

লেখক: সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x