বিকাশমান ড্রেজিং শিল্প: নদী অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

বিকাশমান ড্রেজিং শিল্প: নদী অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
ছবি: সংগৃহীত

হোয়াং হো কে চীনের দুঃখ বলা হতো এক সময়। প্রতিবছর প্রলয়ংকারী বন্যায় প্লাবিত হতো মাঠ-ঘাট ঘরবাড়ি আর ফসলের ক্ষেত। হাজার বছর আগে চীনের সম্রাট দেশের নামকরা ২০ জন জ্ঞানীগুণী আর বিশেষজ্ঞকে তলব করলেন তার দরবারে। হোয়াং হোর হাত থেকে চীনকে বাঁচানোর জন্য উপায় খুঁজে বের করতে বললেন। সময় ৩০ দিন। ব্যর্থ হলে মৃত্যুদণ্ড। চীনে তখন এভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত ছিল। ২০ জন বিশেষজ্ঞ জীবন বাঁচানোর জন্য নেমে পড়লেন হোয়াং হোর মোহনায়। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় হোয়াং হোর বাঁকে বাঁকে ঘুরতে লাগলেন। করুণ দৃষ্টিতে হোয়াং হোর জলের সাথে কত দুঃখ ব্যথা শেয়ার করলেন। শুনলেন হোয়াং হোর দুঃখের কাহিনীও।

৩০ দিন পর হাজির হলেন রাজ দরবারে। ২০ জন সবাই একমত হয়ে রিপোর্ট উপস্থাপন করলেন মৃত্যু ভয় নিয়ে। রিপোর্টে উল্লেখ করলেন হোয়াং হোর চলার পথ মসৃণ করতে হবে। হোয়াং হোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পানির প্রবাহ যেন কোথাও বাধাগ্রস্ত না হয়। তাহলেই এ সমস্যার সমাধান হবে। সম্রাটের চোখের দিকে তাকিয়ে সবাই মৃত্যুদণ্ড শোনার অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ ভেবে সম্রাট বললেন, তবে তাই হোক। হোয়াং হোর গতিপথ হয়ে গেল মসৃণ। প্রবাহ হয়ে গেল নিরবিচ্ছিন্ন। অবসান হলো চীনের দুঃখ নামে অভিহিত হোয়াং হো অপবাদ। চীনের দুর্ভিক্ষ আর অকাল বন্যার হাত থেকে চীন রক্ষা পেল। সেই থেকে আজও হোয়াংহো অবিরত প্রবাহিত হচ্ছে। চীনা ভাষায় হো মানে নদী। হোয়াংহো কে ওরা মাদার রিভার বলে। যারা থেকে হাজার মাইল দীর্ঘ গ্রেটওয়াল বানিয়েছে নিখুঁত পাথর ব্যবহার করে, তারা নদীর বালি ও পলি অপসারণ করতে পারবে না এটা হতে পারে না। এটা চীন করে দেখিয়েছে।

নদীর সংস্কার ও পরিচর্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে গত নভেম্বর ২০২০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় বছরব্যাপী নদী খননের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি শেখ হাসিনা। নদীর পানি প্রবাহ ঠিক রাখা এবং ভাঙ্গন প্রতিরোধে বড় নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পুরো বছরের পরিকল্পনা থাকতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। নদী প্রবাহ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নদীর পানি যখন কমে যায় তখন চর পড়ে বা অন্যান্য কারণে পানি বেড়ে গেলে ভাঙ্গন শুরু হয়। তাই নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে বড় নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পুরো বছরের পরিকল্পনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে প্রকল্প ভিত্তিক নদী ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে। সেটি থেকে বের হয়ে এসে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে যেতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

ডেল্টা প্লান অনুসারে সমন্বিত ও টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। দুইটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি হলো নদী কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ফলপ্রসূ করা আর দ্বিতীয়টি হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জনজীবন ও সম্পদকে রক্ষা করা।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ আবহাওয়া এবং অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতিবছর আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে ২০০ মেট্রিক টন বালি এবং পলি বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রবেশ করে। তবে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে কাজ করেন এমন কেউ কেউ মনে করেন আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে বর্তমানে ৩৫০-৪৫০ মেট্রিক টন বালি ও পলি বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রবেশ করে। একই সময়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পলি এবং বন্যার পানি মেঘনা বেসিনে পতিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশের নদীগুলোর তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার এটি একটি কারণ। নদীগুলো বন্যার পানি এবং পলি মাটি মেঘনা বেসিন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতে পারেনা। যমুনা নদী দিয়েও বিপুল পরিমাণ পলি বন্যার পানির সাথে পরিবাহিত হয়। যমুনা নদীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ পলিমাটি জমা হওয়ার কারণে যমুনা অববাহিকার অধিবাসীরা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়ছে। বন্যার সময় প্রায় বিলিয়ন (২০০) টন সেডিমেন্ট নদীর তলদেশে জমা হয়। ফলে নদীর তলদেশের উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অতি বন্যার সৃষ্টি হয়।

বিশ্বের অন্যতম বন্যা প্রবণ দেশ বাংলাদেশ। গত চল্লিশ বছরে এখানে বন্যায় মারা গেছে পাঁচ লাখ ২০ হাজার মানুষ। ১৯৯৮২০০৪ সালের প্রলয়ংকারী বন্যায় দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি শতাংশে নেমে এসেছিল। প্রতি চার থেকে পাঁচ বছর পর ভয়াবহ বন্যায় দেশের ৬০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৯ হাজার ৭৩৪ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদ-নদী, বিল-ঝিল ও হাওর তথা মুক্তাঞ্চল। দেশের মোট ভূমির শতকরা ৮০ ভাগ প্লাবন ভূমি এবং ২০ ভাগ পাহাড়ি/উঁচু ভূমি। জলবায়ু বিবেচনায় বাংলাদেশের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আদ্রতা নাতিশীতোষ্ণ এবং শীত-গ্রীষ্মের বিপরীতমুখী বায়ু প্রবাহ যা সুস্পষ্ট ঋতুগত বৈচিত্র। প্রকৃতির এই বিচিত্র আচরণের ফলে বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং দেশের অধিকাংশ ভূমি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি নদীর পাড় ভাঙ্গনের মুখে পড়ে বিশেষত পাহাড়ি নদীগুলো এবং হাওর এলাকায় বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ঢল নামে। হঠাৎ তীব্র স্রোত দেখা দেয় এবং নদী ভাঙ্গন শুরু হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ হুমকির মুখে পড়ে।

দেশে নদী ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমির (সিকস্তি) পরিমাণ লাখ ১৪ হাজার ৬৭১ দশমিক ৯৫ একর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিকস্তি জমি চট্টগ্রাম বিভাগে যার পরিমাণ লাখ ৭৩ হাজার ১৬২ দশমিক ৯৩ একর আর সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে যার পরিমাণ ৩১.৭ একর। বিভাগভিত্তিক নদীভাঙ্গনে ঢাকা বিভাগে সিকস্তি জমির পরিমাণ ৪৯ হাজার ১৪২.৯৮ একর, বরিশালে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৮৩ দশমিক ৭৭ একর জমি রয়েছে। রাজশাহীতে ৯৭ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৮৪ একর, খুলনায় ৩০ হাজার ৬৭১.১৫ একর, রংপুরে ১৫ হাজার ৪৮ দশমিক ৭৮ একর, ময়মনসিংহে হাজার ৯৬৭ দশমিক ৪৪ একর।

সিইজিআইএস দেশের প্রধান তিনটি নদীর অববাহিকায় সম্ভাব্য ২০ টি স্থান‌ নির্বাচন করেছে যা বর্তমান বছরে নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়তে পারে। ‌ এই ২০টি স্থানের মধ্যে ১৪টি যমুনা, ৫টি গঙ্গা ও ১টি পদ্মা নদীতে। নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রায় ১৩টি জেলা (কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর ও মাদারীপুর) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যাদের মধ্যে সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী ও মাদারীপুর জেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হতে পারে।

ড্রেজিং শিল্পের বিবর্তন:

নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষাকল্পে বৃটিশ আমল হতেই এ উপমহাদেশে (বাংলাদেশ) ড্রেজার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৪৭ সাল হইতে তৎকালীন সিবি এন্ড আই (Communication Building & Irrigation Dept.) তে এস.ডিফয়ার্জ-২৮ ইঞ্চি ও এস. ডি আলেকজান্ডার-৪১ ইঞ্চি নামের দুইটি ড্রেজার দ্বারা বাংলাদেশ ভূখন্ডে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে ১৮টি ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার সংগ্রহ করে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ১৯৫৯ সালে ড্রেজারগুলোসহ সংস্থাটি ইপি ওয়াপদা’র (East Pakistan Water & Power Development Authority) নিকট হস্তান্তরিত হয়। উল্লেখ্য, সংস্থা টি ইপি ওয়াপদা’র নিকট হস্তান্তরের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা, সেচ ও পানি নিস্কাশন মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে আরও ২(দুই)টি ড্রেজার, এস. ডিসাফিনাতুল হাসান-২” ও এস. ডিআমিনুল বাহার-৪৩’’ উক্ত সংস্থার সাথে যুক্ত হয়। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়কালীন ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ২০০০ সালে নেদারল্যান্ড সরকারের “Orent Grant’’ এর আওতায় আধুনিক প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্যালি কন্ট্রোলড ইঞ্জিন সম্বলিত ৫(পাঁচ) টি ১৮ ইঞ্চি ড্রেজার সংগ্রহ করা হয়। সেই সময়ে তৎকালীন নেদারল্যান্ড সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১টি ৬ ইঞ্চি ড্রেজার উপহার হিসাবে প্রদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলায় চন্দনা বারাশিয়া নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহের নাব্যতা রক্ষাকল্পে ড্রেজিং এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১টি ড্রেজার ক্রয়ের নির্দেশনা দেন। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কুষ্টিয়া জেলায় গড়াই নদী পাইলট সেকশনে ড্রেজিং করা হয়। ২০০০-২০০১ অর্থ বৎসরের নেদারল্যান্ড এর আর্থিক সহায়তা প্রকিউরমেন্ট অব ড্রেজারস এন্ড এন্সিলারি ইকুইপমেন্ট ফর রিভার ড্রেজিং ফর ফ্লাড প্রটকেশন অব বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় এস.ডি শীতলক্ষ্যা-১৮", এস.ডি ব্রহ্মপুত্র-১৮", এস.ডি মহানন্দা-১৮", এস.ডি নবগঙ্গা-১৮" ও এস.ডি চিত্রা-১৮" ড্রেজার ক্রয় করা হয়।

২য় বার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসীন হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ভরাট হওয়া নদ-নদী পুনরুদ্ধার ও নাব্যতা রক্ষাকল্পে ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক গৃহীতব্য/গৃহীত নদী ভাঙ্গন রোধে তীর প্রতিরক্ষা কাজ সম্বলিত প্রকল্প সমূহে একটি নির্দিষ্ট আনুপাতিক হারে নদী ড্রেজিং কার্যক্রম অর্ন্তভূক্ত করণের জন্য অনুশাসন দিয়েছেন, যেন নদীতে জাগ্রত ডুবো চর ড্রেজিং এর মাধ্যমে অপসারিত হওয়ার ফলে নদীর প্রবাহ তীরে আঘাত করে নদী ভাঙ্গন পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অন্তর্গত ড্রেজার পরিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে মোট ৪১টি (৯টি ২৬’’, ২টি ২০’’, ১৬টি ১৮’’, ১৩টি ১২” এবং ১টি ৬” ডিসচার্জ পাইপডায়াল) বিভিন্ন ক্ষমতা সম্পন্ন কাটার সাকশন ড্রেজার রয়েছে এবং ওয়ার্ক বোট ২২টি (সচল ২২টি), টাগবোট ১৫টি (সচল ৭টি, মেরামতধীন ৮টি), হাউজবোট ৩২টি (সচল ২১টি, মেরামতাধীন ৩টি, মেরামত অযোগ্য ৮টি) রয়েছে। বর্তমানে সচল ও কার্যক্ষম ড্রেজার গুলোর বাৎসরিক ড্রেজিং ক্ষমতা প্রায় ২০৯.৫০ লক্ষ ঘনমিটার।

ড্রেজার পরিদপ্তর কর্তৃক ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৪৫.00 কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে ৬৫.00 লক্ষ ঘণ মিটার, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে প্রায় ৩৮.০০ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্যে ৫০.০০ লক্ষ ঘনমিটার, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রায় ১০০.৮০ লক্ষ ঘন মিটার ড্রেজিং সম্পাদন হয়েছে।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহ খননের মাধ্যমে নদ-নদীর ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে পাইলট ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন মেয়াদে সুষ্ঠু পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূমি পুনরুদ্ধার ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদী ড্রেজিংকল্পে “Procurement of Dredger & Ancillary Equipment for River Dredging of Bangladesh” শীর্ষক প্রকল্পের অধীন বিভিন্ন সাইজের/ক্ষমতার ২১টি ড্রেজার ও অন্যান্য সহযোগী জলযান/যন্ত্র পানি সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে উক্ত প্রকল্পের অধীনে ৭টি ২৬", ২টি ২০" ডিসচার্জ ডায়ার ড্রেজার ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখিত নতুন ৮টি ড্রেজার দ্বারা ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ১টি ড্রেজার টেস্ট ট্রায়াল সম্পাদন পূর্বক গ্রহনের অপেক্ষায় রয়েছে। ক্যাপিট্যাল ড্রেজিং শেষ হওয়ার পর নিয়মিত মেইন্টেনেন্স ড্রেজিং (অর্থাৎ নদীর নাব্যতা বজায় রাখার লক্ষ্যে) বাস্তবায়ন করার জন্য উপরোক্ত ড্রেজার ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হচ্ছে, যা দ্বারা সকল মেইন্টেনেন্স ড্রেজিং সম্পাদিত হবে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ১৮টি মাঝারি নদী স্বল্প সময়ে (৫ বছর), মধ্য মেয়াদে (১০ বছর) এবং সব বড় নদী যথা: পদ্মা, যমুনা, মেঘনা দীর্ঘ মেয়াদে (১৫ বছর) প্রায় ১০০০ কিলোমিটার ড্রেজিং করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে খাল বিশেষত হাওর এলাকায় ছোট নদী, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট নদী এবং বৃহৎ নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সময় অথবা অব্যবহৃত পরে ড্রেজিং করা নদী-নালার নাব্যতা রক্ষার্থে মেনটেইন্যান্স ড্রেজিং করা অত্যন্ত জরুরি। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পর স্বাভাবিক বন্যা হলে ড্রেজিংয়ের প্রায় ৪০% পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যায়। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হলে ড্রেজিংয়ের ৬০% বালি এবং পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যায়। জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, ভবিষ্যতে ড্রেজিং এর চাহিদা কয়েকগুন বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং মেনটেইন্যান্স ড্রেজিং আবশ্যক অনুষঙ্গ। ক্রয়ের প্রকৃয়াধীন বিভিন্ন সাইজের ৩৫টি ড্রেজার বছরে প্রায় ৬১৭.৫৫ লাখ ঘনমিটার মাটি খনন করতে পারবে। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছোট নদী, খাল ও সাকসেসিভ মেনটেইন্যান্স ড্রেজিং ক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। ‌

বিআইডব্লিউটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৯৬২-৬৭ পর্যন্ত নেডেকোর সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের নদী পথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। ইহার মধ্যে নাব্য নৌ পথের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ১৩ হাজার ৭৭০ কিলোমিটার। ১৯৮৭-৮৮ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের নদী পথের দৈর্ঘ্য মাত্র হাজার কিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে হাজার ৮২৪ কিলোমিটার। ১৯৮৭-৮৮ সালে ডাচ ভিএইচবি কর্তৃক শ্রেণীবদ্ধ নৌপথ জরিপের পর প্রায় ৩৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু নৌ পথের জরিপ আর সম্পন্ন হয় নাই অর্থাৎ প্রায় সাত দশকে 18 হাজার কিলোমিটার বা চার ভাগের তিন ভাগ নৌ পথ হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমান সরকার গত ১০ বছরে পুনঃখননের কারণে নৌ পথের দৈর্ঘ্য হাজার ৬০০ কিলোমিটার বেড়ে হয়েছে হাজার ৬০০ কিলোমিটার। সরকার সচেষ্ট থাকলেও ড্রেজিং এ নানা সংকট রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথকে নৌ-যান ও ফেরি চলাচল উপযোগী রাখতে বছরে অন্তত কোটি ঘনমিটার পলি অপসারণ করা দরকার। আগামী পাঁচ বছরে দেশের ৮১ টি নৌপথের প্রায় ২৬.৮১ কোটি ঘনমিটার পলি ড্রেজিং করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৩৫০০ কিলোমিটার নদীপথ সচল রাখতে ২০০ ড্রেজার প্রয়োজন কিন্তু ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর জন্য আছে মাত্র ৩৫ টি।

মেনটেইন্যান্স ড্রেজিং এর মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩০০ লাখ কিউবিক মিটার পলি অপসারণের প্রোগ্রাম হাতে নেয় এবং ০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় কিন্তু বন্যায় জমা হওয়া ৪৫০ লাখ কিউবিক মিটার পলি অপসারণের জন্য অধিক অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। বিআইডব্লিউটিএ-এর পঁয়ত্রিশটি ড্রেজার দিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি সমাপ্ত করা কঠিন। ‌

নেদারল্যান্ডস ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্ট ১৯৬৫-৬৭ সালে ৩১০ টি বৃহৎ ও ছোট নদীর পানির প্রবাহ নিয়ে গবেষণা করে। তার মধ্যে ১১৭ টি নদী অবৈধ দখল, পলি ভরাট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে প্রবাহ হারিয়েছে বলে প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সারা বছর ব্যাপী নদীর বহমানতা বজায় রাখতে নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ, নদীর তলদেশে পলি জমা হওয়া, ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা এবং প্রতি বৎসর ১০০ থেকে ১২০ কোটি বিলিয়ন কিউবিক মিটার পলি অপসারণ নাব্যতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বর্তমানে ষোলটি নৌরুটে ৩৩ টি ড্রেজার ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত করেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাতটি ড্রেজার ছিল বিআইডব্লিউটিএ'র বহরে। বিগত ১০ বছরে নদীর নাব্যতা রক্ষায় সরকার ২৫টি ড্রেজার সংগ্রহ করেছে। নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৭২ সালে ২ টি, ১৯৭৫ সালে ৫টি, ২০১১ সালে ৩টি, ২০১৪ সালে‌ ৮টি, ২০১৬ সালের ২ টি এবং ২০১৭ সালে ৪টি এম্পিবিয়ান কাটার সাকশান ড্রেজারসহ মোট ২৫ টি ড্রেজার সংগ্রহ করা হয়। ক্যাপিটাল প্রকল্পের আওতায় চব্বিশটি নৌপথে ৯৯৭ লাখ ঘনমিটার খননের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৮৬ কিলোমিটার নৌ পথের উন্নয়ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেসরকারি ড্রেজার দ্বারা ৪৭৪.৭৪ লাখ ঘনমিটার, বিআইডব্লিউটিএ'র নিজস্ব ড্রেজার দ্বারা ৭০.৭০ লাখ ঘনমিটার এবং এক্সকাভেটর দ্বারা ২৫ লাখ ঘনমিটার সহ ৫৭০.৪৪ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করে ১ হাজার ১৮০ কিলোমিটার নৌপথ নাব্য করা হয়েছে। সারাদেশে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ২ হাজার ৩৮৬ কিলোমিটার নৌপথ উদ্ধারে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ৫৩ টি নৌরুটের ১২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন এর জন্য প্রথম পর্যায়ে চব্বিশটি নদী খনন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ২৯ টি গুরুত্বপূর্ণ নদী খনন করার কথা রয়েছে। নদী খননের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল হবে।

বাংলাদেশ সরকার নদী ও নৌপথ উন্নয়নে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নদীর নাব্যতা রক্ষা, নদীর মাধ্যমে জলাধার সৃষ্টি ও নিরাপদ নৌপথ উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের সড়কের পরিবর্তে নৌপথ ব্যবহার করে পণ্য কার্গো পরিবহনে প্রতিবছর সাশ্রয় হয় ৭৫০ কোটি টাকা পক্ষান্তরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নদীর নাব্যতা রক্ষা ও নিরাপদ নৌপথ উন্নয়নে প্রতিবছর ড্রেজিং বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। ব্যাপক খননের পরিকল্পনা হিসেবে সরকারের বর্তমান মেয়াদে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দ হতে ডিসেম্বর ২০১৯ সময় পর্যন্ত গত ১০ বছরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প সমূহের মাধ্যমে প্রায় ১৭০৩ কিলোমিটার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই ১৭০৩ কিলোমিটার নৌপথ পুনরুদ্ধার করতে প্রায় ৯৬২ লক্ষ ঘনমিটার খনন কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ১৩২০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে এবং ৮২৩ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং হয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি মালিকানাধীন ১০০ টিরও বেশি ড্রেজার রয়েছে। বেসরকারি ড্রেজার সংখ্যাসহ বর্তমানে দেশের মোট ড্রেজিং সক্ষমতা বছরে প্রায় ৮০০ লক্ষ ঘনমিটার। অপরদিকে বিআইডব্লিউটিএ এর বার্ষিক ড্রেজিং চাহিদা প্রায় ১৬০০ লক্ষ ঘনমিটার অর্থাৎ বর্তমানে বার্ষিক ড্রেজিং ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৮০০ লক্ষ ঘনমিটার। প্রস্তাবিত পঁয়ত্রিশটি ড্রেজার সংগৃহীত হলে বিআইডব্লিউটিএ-এর ড্রেজার সংখ্যা ৮০ টি তে উন্নত হয়ে বার্ষিক ড্রেজিং সক্ষমতা দাঁড়াবে ৬২৫ লক্ষ ঘনমিটার। এর ফলে বিআইডব্লিউটিএ এর বার্ষিক ড্রেজিং চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে এবং ঘাটতির পরিমাণ নেমে আসবে ৪৭৫ লক্ষ ঘনমিটারে। খসড়া ড্রেজিং মহা পরিকল্পনা অনুযায়ী নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক ১৭৮ টি নৌপথ এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৩১৩টি নদী খননের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া খালসমূহ খননের জন্য স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ কে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। তবে সকল নদীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিআইডব্লিউটিএ কে।

বর্তমান সরকার বিআইডব্লিউটিএ'র ড্রেজিং বিভাগের মাধ্যমে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং মৃত বা মৃতপ্রায় নদীর নাব্যতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ড্রেজিং কার্যক্রমে সাফল্য অর্জন করেছে। সে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেশের ৫০টি নৌপথের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, Haskoning DHV Nederland B.V কর্তৃক সমীক্ষা সম্পাদনের পর তাদের প্রতিবেদনে প্রতিফলিত সুপারিশ অনুযায়ী সারাদেশের নৌপথ খনন কাজ চলছে।

সারা দেশে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশের নিচে থাকলেও ৫৫ নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় দারিদ্র্যের হার ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত দেখা যায়। নদী ভাঙ্গন এবং নদীর নাব্যতা হ্রাসের ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা সংকুচিত হওয়ায় তারা দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারছে না।

কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল সর্বমোট ৩৯৯.৬৯ লাখ মেট্রিক টন (চাল ৩৮৭.২৪ লাখ মেট্রিক টন এবং গম ১২.৪৫ লাখ মেট্রিক টন)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বি.বি.এস) চূড়ান্ত প্রাক্কলন অনুসারে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চালের আকারে আউশ ২৭.৭৫ লাখ মেট্রিক টন, আমন ১৪০.৫৫ লাখ মেট্রিক টন, বোরো ১৯৫.৬১ লাখ মেট্রিক টন; সর্বমোট চালের আকার ৩৬৩.৯১ লাখ মেট্রিক টন। অপরদিকে গমের উৎপাদন হয়েছে ১০.১৭ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসাবে দেশে সর্বমোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছিল ৩৭৪.০৮ লাখ মেট্রিক টন। বিপুল পরিমাণ খাদ্য শস্য উৎপাদনে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের জন্য নদ-নদীর পানির নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ প্রয়োজন।

বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দা অবস্থা থাকা সত্বেও বর্তমান সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭০,৯৪৫.৩৯ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৩৯৮৪.১৫ কোটি টাকার (৪৬৯.৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সময়োচিত ও যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে ৩য়, বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে ৫ম এবং বিগত ১০ বছরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে।

চার দশক আগে বৃহত্তর পাবনা জেলার নদী ও মোহনা থেকে ধরা পড়তো প্রায় ১৪ হাজার টন মাছ। এখন মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টন। প্রতি বছর যমুনা নদীতে ১২০ কোটি টন পলি ও বালি পড়ছে। কয়েক দশক আগে যমুনা নদীর পানির প্রবাহ ছিল ১০ কিলোমিটারের উর্ধ্বে। অথচ সেটি এখন কোথাও এক কিলোমিটারের সংকুচিত হয়েছে।

দেশের জিডিপির ৩.৫৭ শতাংশ মোট কৃষি উৎপাদনের ২৫ শতাংশ ও প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ মৎস্য খাত যোগান দিচ্ছে। দেশের ১১ শতাংশ জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের সাথে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশে মাছ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। দেশের প্রতিদিন মাথাপিছু 60 গ্রাম মাছের চাহিদার বিপরীতে ৬২.৫০ গ্রাম সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭৩ হাজার ১৫১ মেট্রিক টন মৎস্যজাত দ্রব্য রপ্তানি করে ৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। ২০১৮ সালে খুলনা জেলায় মাছের উৎপাদন ছিল ৬২ হাজার ২২৯ মেট্রিক টন যা চাহিদার তুলনায় ৬ হাজার ৭৬৭ মেট্রিক টন বেশি।

বাংলাদেশের ২৫% জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের মাধ্যম নৌপথ। স্বাধীনতার পর বিআইডব্লিউটিএ যে জরিপ করে তাতে দেখা যায় দেশের মোট আয়তনের ৭ শতাংশ নৌপথ। ১৯৭৫ সালে যেখানে দেশের মোট পরিবহন ক্ষেত্রে নৌপথে যাত্রী পরিবহন ছিল ১৬ শতাংশ ও মালামাল পরিবহন ৩৭ শতাংশ, ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮ ও ১৬ শতাংশ। সড়কপথের তুলনায় নৌপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ঝুঁকি অনেক কম। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নৌপথে ৩২৫ টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ২ হাজার ৪৫৫ জন যাত্রী। গড়ে প্রতি বছর ১৬৪ জন মারা গেছে। সড়কপথে প্রতিবছর গড়ে ৪০০০ জন মারা যায়। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

সরকারের যথাযথ ভূমিকার ফলে গত এক দশকে দারিদ্রতার হার ৫০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর দুটি দেশের একটি যেখানে দারিদ্রতা দ্রুত হারে কমেছে। বর্তমানে মৎস্য আহরণ, নৌ-যোগাযোগ, পর্যটক ইত্যাদি মিলিয়ে মেঘনা নদীর বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় সাড়ে ২৩০০ কোটি টাকা।

২০২১ সালে মে মাস পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট সড়ক পথের দৈর্ঘ্য ২২,৪১৯.০০ কিঃ মিঃ যার মধ্যে ১০৮টি জাতীয় সড়কের দৈর্ঘ্য ৩৯৭৯.৮০ কিঃমিঃ, ১৪৮টি আঞ্চলিক সড়কের দৈর্ঘ্য ৪৮৯৭.৭০ কিঃমিঃ এবং ৭১৩টি জেলা সড়কের দৈর্ঘ্য ১৩৫৪১.৫০ কিঃমিঃ। ১৯৭২ সালে জাতীয় সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৪,১৭৫ কিঃ মিঃ যার মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ২৪৫০ কি:মি:, আঞ্চলিক মহাসড়ক ১১৫৯ কিঃমিঃ এবং ফিডার/জেলা সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল ৫৬৬ কিঃ মিঃ। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়ক নেটওয়ার্কে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ও দৈর্ঘ্যের ৪৪৩১টি সেতু, ১৪৯৩৩টি কালভার্ট এবং ৪৩টি ফেরিঘাটে বিভিন্ন ধরনের ১০২টি ফেরি চলাচল করছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ৫৫০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, ৭৯৭৮.৩৮ মিটার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং ৬৬০.৬৬ কিলোমিটার খাল খনন ও পুর্নখনন এবং ৩১০.৭৩ একর পুকুর পুনর্খনন এবং ১৮৫.১৭৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও পুননির্মাণ এবং ১২৮টি রেগুলেটর নির্মাণ করে।

গত এগারো বছরে (২০০৯-২০২০) এলজিইডি মোট ৬৩,৬৫৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাম সড়ক-এ ১৯৩০৬ কিলোমিটার, গ্রাম সড়ক-বি ১২৮৭১ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সড়ক ১৯১৬৬ কিলোমিটার এবং উপজেলা সড়ক ১২৩১২ কিলোমিটার। মোট সেতু/কালভার্ট নির্মাণ করে ৩৭৬৮০৭ মিটার।

২০১৬ সালে বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামীণ যোগাযোগ সূচকে বাংলাদেশের অর্জন ৮৬.৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শতকরা ৮৬.৭ ভাগ সর্বোচ্চ দু’কিলোমিটার বা ত্রিশ মিনিট হাঁটার পর যে কোন পাকা সড়কে উঠতে পারে।

বিগত পাঁচটি অর্থবছরে সড়ক মহাসড়ক বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বাজেট নিম্নরূপ (কোটি টাকা) :

অর্থ বছর

সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়

স্থানীয় সরকার বিভাগ (উন্নয়ন বরাদ্দ)

২০১৬-১৭

৯৪০৩.০১

২২৩০.২৯৫৮

৪৭৯৯.২৯৯৫

১৯,৪১৩.৯৯

২০১৭-১৮

১৭৩১৭.০৬

২৯০৫.৭৭৩৬

৬১৭৩.০২০৯

২২,৮৪৯.৯৪

২০১৮-১৯

১৯৮০২.৬১

৪২১৪.৪৭৯৩

৭৭২৭.৭৭৯৩

২৬,৭৫৮.৪৮

২০১৯-২০

২৩৯৮২.০১

৩৯০৬.০৩৬৭

৮৮০৪.৪১৯

৩২, ৭৩২.০৭

২০২০-২১

২৪৫৪০.৩২

৪০২৬.৪৪০৮

৯১২৯.৪৭২৫

৩৪, ১৭৫.৯৪

মোট=

৯৫০৪৫.০১

১৭২৮৩.০২৬২

৩৬৬৩৩.৯৯১২

১,৩৫,৯৩০.৪২

বিগত ৫ বছরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় মোট বাজেটের চেয়ে (৫৩৯১৭.০১৭৪ কোটি টাকা) সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মোট বাজেট (৬৩৮৩৫.৮৮ কোটি টাকা) বেশী ছিল। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি প্রায় ৫০ বছরে ১৮,২৫৪ কিঃমিঃ সড়ক নির্মাণ করে। উন্নয়নের অন্যতম নির্দেশক সড়ক ও মহাসড়ক। আর্থসামাজিক উন্নয়নে সড়ক ও মহাড়কের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারপরও কথা থেকে যায়। এই বিশাল ব্যপ্তি সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষি জমি অধিগ্রহন করতে হয়েছে। অধিগ্রহনে একদিকে যেমন বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে তেমনি কৃষি জমি নষ্ট হওয়ায় খাদ্য উৎপাদনও কমেছে। এঘাটতি মেটানোর জন্য অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে অধিক পরিমানে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছে যা পানি, মাটি ও পরিবেশকে দূষিত করেছে। মাছের অবাধ বিচরণের জায়গা নষ্ট হয়েছে। পরিবেশ এবং প্রতিবেশ উভয়ের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে স্বাধীনতার ৫০ বছরে নৌপথ কমেছে প্রায় ১৮০০০ কিঃমিঃ। নৌপথ সচল রাখতে জমি অধিগ্রহন করার প্রয়োজন হয় না, ফসলি জমিও নষ্ট হয় না। পরিবেশ এবং প্রতিবেশ উভয়ের জন্য নৌপথ সবসময়ই স্বস্তিদায়ক।

একটা বিল্ডিং বা বড় স্থাপনা/অবকাঠামো নির্মাণ করলে সেখানে শত বৎসরে আর কোনো অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন পড়েনা কিংবা কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণ করলে ৫০ বছরে তা অক্ষত থাকে কিন্তু আমাদের নৌপথ যতই ড্রেজিং করি না কেন প্রতি বছর বন্যায় বিলিয়ন টন বালু আর পলি এসে ভরাট হয়ে যায়। ‌

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। যে রকম অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, তাতে কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বড় অংশই তলিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বর্ষায় বন্যা এবং শীতকালে নদীগুলোতে পানি না থাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া ক্রমেই বাড়ছে। তাই অস্তিত্বের প্রয়োজনেই নদীগুলোকে ড্রেজিং করতে হবে।

ড্রেজিং বা খনন শিল্প বাংলাদেশ বিকাশমান নতুন শিল্প। ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশের ড্রেজিং শুরু হলেও বর্তমান সরকার এবং আগের মেয়াদে দুইটি সরকারের সময়ে ড্রেজিং শিল্পের বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ড্রেজার ক্রয় এবং পরিচালনার কার্যক্রম আশার সঞ্চার করেছে। ড্রেজারের দাম তার কার্য ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। উদ্যোক্তাগণ বিপুল অর্থ ব্যয় করে ড্রেজার ক্রয়ের পর অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না। টেন্ডার মূল্যায়নে ম্যাট্রিক্স সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন উদ্যোক্তাদের কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ড্রেজার ভাড়া দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ম্যাট্রিক্স সিস্টেমের সুবিধা নিয়ে বড় বড় ঠিকাদার অধিক কাজ হাতে নিয়ে নদী শাসনকে অনেক ক্ষেত্রে হুমকির মুখে ফেলছেন। সরকার সম্প্রতি এ ধরণের ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে। সম্ভাবনাময় এ শিল্পের প্রসারে ড্রেজার শিল্প বান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং প্রনোদনা প্রদান জরুরী। ড্রেজিং শিল্পের উৎকর্ষতা নদী শাসনে যুগান্তরকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএ নদী শাসন এবং নৌ-পথের নাব্যতা রক্ষায় কাজ করে। এ দু’টি সংস্থাই ড্রেজিং কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০০০ কিলোমিটার এবং বিআইডব্লিউটিএ’র ১৮০০ কিলোমিটার ড্রেজিং এর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের নদী কেন্দ্রিক অর্থনীতির চেহারা আমূল বদলে যাবে। নদী সমূহে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাবে। নদী বন্দরগুলো অনেক বেশী কার্যক্ষম হবে, নৌ-পথে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে নৌ-পথে মালামাল ও যাত্রী পরিবহন অনেকগুন বৃদ্ধি পাবে। নদী কেন্দ্রিক বাণিজ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। নদী সমূহের পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে ফলে অতিবন্যার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি কম হবে। নদী কেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চার হবে। শুধুমাত্র অতি বন্যা প্রতিরোধ করতে পারলেই জিডিপির ৩-৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।

গত ২৬ বছরে নদী ভাঙ্গনের অবস্থা অবলোকন করলে দেখা যায় যে ১৯৯৫ সালে দেশের প্রধান তিনটি নদীতে নদী ভাঙ্গনের মোট পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর। বর্তমানে কমে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর অর্থাৎ নদী ভাঙ্গন উল্লেখযোগ্য হারে তিনগুন কমে গেছে। ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং অব্যাহত থাকলে নদী ভাঙ্গন হ্রাস পাবে। ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় মানুষের দারিদ্র্যতা ৩৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন হলে নৌপথ হবে জনগণের নিরাপদ যাত্রার প্রথম পছন্দ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়াও বিনোদনসহ বিনিয়োগের নতুন হটস্পট হতে পারে নদী। সেক্ষেত্রে ড্রেজিং শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরী। উন্মুক্ত নদীপথই হবে আগামীর বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

(তথ্য সূত্রঃ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, গবেষণা প্রতিবেদন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন)।

লেখকঃ উপ-মন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপ-সচিব) পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x