কৃষি গবেষণায় অতিমারির প্রভাব ও অভিযোজন

কৃষি গবেষণায় অতিমারির প্রভাব ও অভিযোজন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা দিতে বিশ্বব্যাংক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান তথা ইফাদ ও ইউএসএআইডি, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম (এনএটিপি) ২০০৮ সালে যাত্রা করে। এ প্রোগ্রামের দ্বিতীয় ধাপের (এনএটিপি-২) আওতায় ফসল, মত্স্য, প্রাণিসম্পদ বিষয়ে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে অপচয় রোধ ও মূল্য সংযোজন এবং বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিতে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষক পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক বিশেষত কিষানিদের জীবনমান উন্নয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক | The Business Standard

এনএটিপি-২-এর আওতায় কৃষিখাতের শস্য, প্রাণিসম্পদ ও মত্স্য উপখাতে কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রবর্তনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এর নেতৃত্বে এনএআরএসভুক্ত বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট কোম্পানি, বেসরকারি সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। এতে চাহিদামাফিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে মৌলিক, ব্যবহারিক, অভিযোজনক্ষম এবং কৌশলগত গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে শানিত করতে ও জাতীয় পর্যায়ে তার সুফল পেতে প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে কম্পিটিটিভ রিসার্চ গ্রান্ট (সিআরজি)-এর আওতায় ১৯০টি উপ-প্রকল্পের বাস্তবায়ন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং তা থেকে উদ্ভাবিত ১১টি প্রযুক্তি ইতিমধ্যে বিভিন্ন সম্প্রসারণ সংস্থার (ডিএই, ডিএলএস ও ডিওএফ) মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে বিস্তারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশে খাদ্য উত্পাদন ও পুষ্টির জোগান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সিআরজি হতে উদ্ভাবিত আরো ১৩টি প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে দ্রুত যাচাইয়ের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রে গবেষণা সংক্রান্ত জাতীয় সমস্যা সমাধানকল্পে একাধিক প্রতিষ্ঠান বা একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক বিভাগের সমন্বয়ে গবেষণার নিমিত্ত কর্মসূচিভিত্তিক গবেষণা গ্রান্ট বা পিবিআরজি-এর আওতায় বিএআরসির অধীনে ৫১টি উপ-প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর আওতায় শস্য খাতে ৩৭টি, মত্স্য খাতে ১০টি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে চারটি গবেষণা উপ-প্রকল্প এনএআরএসভুক্ত ১৪টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ১৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, দুটি এনজিওর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ইতোমধ্যে কিছু উপ-প্রকল্প হতে ১৫টি ফসলের জাত ছাড় করা হয়েছে বা নিবন্ধিত হয়েছে। এগুলো হলো:বিএসআরআই আখ-৪৭ (চিবানো উপযোগী), বাউ কলা-১, বাউ কলা-২, বাউ ইয়াম-১ (পেস্তাআলু), বাউ ইয়াম-৩ (পাহাড়ি ধুসর আলু), বাউ ইয়াম-২ (মেটে আলু), বাউ ইয়াম-৪ (ছাগল দুধ আলু), বাউ ইয়াম-৫ (মৌআলু), বাউ কচু-১, বাউ কচু-২, বাউ ওলকচু-১, বাউ মানকচু-১, বারি কদবেল-২, বারি জাম-১ ও বারি আতা-১। নিবন্ধিত কলা, মেটে আলু, কচুর চারা ও বীজ ডিএই, বিএডিসি এবং বেসরকারি সম্প্রসারণ কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া কলা ও মেটে আলুর জাত সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি, কৃষি সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম, বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান, ড. শেখ মো. বখতিয়ারের উপস্থিতিতে এক জাতীয় কর্মশালা বিএআরসিতে অনুষ্ঠিত হয়। পিবিআরজি থেকে জাত ব্যতীত অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কার্যক্রম ও অব্যাহত রয়েছে। উদ্ভাবিত এ সমস্ত প্রযুক্তি হতে বাছাইকৃত ১৭টি প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে দ্রুত যাচাইয়ের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া ইতিমধ্যে ১১টি উপ-প্রকল্পের গবেষণা কার্যক্রম থেকে ২২টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বিভিন্ন ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে যার মাধ্যমে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীগণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হচ্ছেন।

করোনা ভাইরাস: বাংলাদেশে চাষ না করে কৃষি জমি ফেলে রাখলে সরকার নিয়ে নেবে,  বিজ্ঞপ্তি জারী - BBC News বাংলা

চলমান পিবিআরজির প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ অন্যান্য কার্যক্রম কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে খানিকটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোভিড-১৯ অতিমারিতে সরকার ২০২০ সালের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে সময় পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরবর্তীকালে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও দ্রুত বিস্তার থামাতে লকডাউন ঘোষণা করা হয় এবং সর্বশেষ গত ১ জুলাই, ২০২১ হতে লকডাউন চলমান রয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উপ-প্রকল্পসমূহের গবেষণা কার্যক্রমের গতি মূল্যায়নের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পিবিআরজি উপ-প্রকল্পে কোভিড-১৯-এর প্রভাব নির্ধারণের জন্য ১ম ধাপে ২০২০ সালের মে মাসে, ২য় ধাপে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে অনলাইন সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। প্রাথমিক সমীক্ষায় ৪০টি উপ-প্রকল্পের প্রধান গবেষক ও সমন্বয়ক অংশগ্রহণ করেন।

এতে দেখা যায়, ১৯টি উপ-প্রকল্পের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ২য় ধাপের সমীক্ষায় দেখা যায় কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম, বিশেষত ল্যাব বিশ্লেষণ, ডাটা সংগ্রহ, মাঠজরিপ ও পুষ্টি বিশ্লেষণ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্পাদন সম্ভব হয়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ থাকার কারণে ল্যাবরেটরিতে নমুনা বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে না। তবে এনএআরএসভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে নমুনা বিশ্লেষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় চলমান রয়েছে। লকডাউনের কারণে চলাচল সীমিত হওয়াতে মাঠপর্যায়ে গবেষক ও তাদের সহকারীদের গমন ও সীমিত হয়ে পড়ে এবং এতে তথ্য সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনুরূপভাবে মাঠপর্যায়ে জরিপ, মাঠদিবস ইত্যাদি কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্পাদন সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া পুষ্টিবিষয়ক কিছু গবেষণায় বিদেশে নমুনা বিশ্লেষণ ব্যাহত হয়। তবে কৃষক অংশীদারিত্বে পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে গবেষণা কার্যক্রম সফলভাবে সমাপ্তিতে সময় বাড়ানোর বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে। পিবিআরজির ৫১টি উপ-প্রকল্পে ১৩টি তিন মাস, ২৪টি ছয় মাস, ১৩টি ১২ মাস, একটি ১২ মাসের অধিক সময় বৃদ্ধির জন্য প্রধান গবেষকবৃন্দ মতামত প্রদান করেন।

পিবিআরজি উপ-প্রকল্পসমূহ কোভিড-১৯-এর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে সফলভাবে বাস্তবায়নে বিএআরসির প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট বিকল্প কৌশল অবলম্বন করে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিএআসসির নির্বাহী চেয়ারম্যান জুম ভার্চুয়াল প্ল্যাটফরমে আয়োজিত সভায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে পরিকল্পিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রধান গবেষকবৃন্দকে আহ্বান জানান। উপ-প্রকল্পসমূহের কোন কোন ধরনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তা জানার জন্য মোবাইল ফোন ও ই-মেইলে তথ্য নেওয়া হয়। অতঃপর, স্বল্প পরিসরের প্রশ্নপত্র দিয়ে ত্বরিত সমীক্ষা চালানো হয়। প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক উপখাতভিত্তিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে অনলাইন সভার আয়োজন করা হয়। বিকল্প পরিকল্পনা ও সফল উদাহরণকে সামনে নিয়ে অন্যদেরকে সেভাবে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করা হয়। ই-মেইলে প্রতিবেদন নেওয়া ও মতামত প্রদান অব্যাহত রাখা হয়।

সময়ের পরিক্রমায় সবার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় দফায় অনলাইন পরিবীক্ষণ জোরদার করা হয়। উপ-প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনের হার্ড ও সফট কপি উভয় মাধ্যমকে সমভাবে বিবেচনায় নিয়ে উপ-প্রকল্পের অর্থ সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়। সীমিত পরিসরে মাঠ পরিবীক্ষণ চালিয়ে যাওয়া হয়। গবেষণা কার্যক্রমের অগ্রগতি ও কোভিড-১৯-এর প্রভাবে বাধাগ্রস্ত কার্যক্রমের যৌক্তিক সময় বৃদ্ধির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ও বিশ্লেষিত তথ্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিশ্বব্যাংকে সরবরাহ করা হয়। ইতিমধ্যে এসব তথ্য ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এনএটিপি-২ প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাঠ পরিবীক্ষণের কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠান প্রধান বিশেষত বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যানের অংশগ্রহণ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের উত্সাহিত করে। পিবিআরজি উপ-প্রকল্পের সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে এবং স্বাভাবিক ও অনলাইন যোগাযোগ জোরদার করে কাঙ্ক্ষিত ক্ষেত্রে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নীতি নির্ধারণ বিষয়ক গবেষণা ফলাফল প্রাপ্তিতে বিএআরসি এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে যে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে যোগাযোগ ও পরিবীক্ষণের মাধ্যমে সম্প্রসারিত সময়ে কোভিড-১৯ অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে।

লেখক: পরিচালক, প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x