লকডাউন এবং বাস্তবতা

লকডাউন এবং বাস্তবতা
[প্রতীকী ছবি]

বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা সংক্রমণের কারণে জনজীবন পর্যুদস্ত। অর্থনীতির এমন কোনো খাত নেই যেখানে উদ্যোক্তারা এই ভাইরাসের অভিঘাত মোকাবিলা করছেন না। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই করোনার অভিঘাত যেন একটু বেশিই পড়েছে। গত বছরের (২০২০) শুরুতে করোনা ভাইরাস উপমহাদেশের দেশসমূহে হানা দেওয়ার পর বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন যে, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল সব দেশের জন্য করোনা ভাইরাস বিশাল ক্ষত তৈরি করে যাবে। কারণ এসব দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এতটাই দুর্বল যে, এই ভাইরাস মোকাবিলায় তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হবার আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভালোই চলছিল। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে উন্নীত হবার জন্য সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা; কিন্তু মধ্যপথে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। দফায় দফায় শাটডাউন এবং কঠোর ও শিথিল লকডাউনের কবলে পড়ে দেশের অর্থনীতি তথা শিল্পকারখানা পর্যুদস্ত হয়েছে; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি সফল তো হয়ইনি বরং অর্থনীতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বিশাল ক্ষতের সৃষ্টি করে গেছে। ফলে দেখা গেছে লকডাউনের কারণে কলকারখানা বন্ধ; কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় তীব্র যানজট। লকডাউনের ঘোষণা এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা; কিন্তু এত অর্থ খরচ করে লকডাউন বাস্তবায়ন না হবার কারণে সরকারের আসল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়েছে।

‘২৩ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউন, বন্ধ থাকবে সব শিল্পকারখানা’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জরুরি লকডাউন ঘোষণার আগে অর্থনীতিতে এর কী প্রভাব পড়বে সে ব্যাপারে সমীক্ষা করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। এখানে কোনো ধরনের সমীক্ষা বা আন্দাজ ছাড়াই লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আবার লকডাউন শিথিল এবং প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও কোনো কিছু আমলে নেওয়া হয় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে—একটি লকডাইন বা শাটডাউনের ক্ষেত্রে বেশকিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। আমাদের দেশেও এ বিষয়সমূহ আমলে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কোভিড ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে। এই কমিটি দেশের ৬৪টি জেলার সিভিল সার্জন থেকে বিভিন্ন রকম তথ্য নিতে পারে। নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর এবং অন্যান্য শিল্পজোনে কত শ্রমিক কাজ করে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার কত—এ বিষয়সমূহ জাতীয় কমিটি সহজেই নিতে পারত। সংক্রমণের হার বিবেচনায় এনে লকডাউনের সিদ্ধান্তে আসতে পারত।

এভাবে ঘন ঘন লকডাউন না দিয়ে সংক্রমণ রোধের জন্য বিকল্প পদ্ধতির কথাও ভাবতে পারত সরকার। সেক্ষেত্রে বিভাগীয় শহরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একাধিক জেলা ও প্রয়োজনে বিভাগভিত্তিক কার্ফিউ ঘোষণা করা যেত। তাতে অনেক বেশি সুফল পাওয়া যেত এবং অর্থনীতিতে অনেক কম চাপ পড়ত। যেমন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লকডাউন কার্যকর করার জন্য কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশেও লকডাউন বা শাটডাউন না দিয়ে এক সপ্তাহের কারফিউ কার্যকর করা গেলে সুফল আসত; কিন্তু এসবের কিছুই না করে হঠাৎ করে শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই বাংলাদেশের শিল্পকারখানা ধুঁকছে। বারবার লকডাউনের কারণে কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ ব্যাংকের পাওনা নিয়ে মালিকরা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়েছেন। বিভিন্ন সময়ে কারাখানা বন্ধ থাকার কারণে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা কীভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কারখানার মালিকরা। এক্ষেত্রে কারখানা মালিকদের প্রণোদনা, স্বল্প সুদে ঋণ কিংবা অন্য কোনো উপায়ে সরকার আর্থিক সহায়তা দিলে অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটবে।

সোমবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন

করোনার কারণে শিল্পকারখানা কী দুর্দশায় পড়েছে তা অনুধাবন করতে পারবেন একমাত্র যারা কারখানা চালান তারাই। গুদামে কাঁচামাল পড়ে আছে। হাতে অর্ডারও আছে; কিন্তু উৎপাদন নেই। এমনও কারখানা আছে যারা গত বছর অর্ডার পাওয়ার পর কাঁচামাল এনেছিল। সেবার লকডাউনের কারণে উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় অর্ডার বাতিল হয়েছে। এবার তারা সে কাঁচামাল দিয়ে পণ্য প্রস্তুত করার অর্ডার পেলেও উৎপাদন করতে পারেনি। তাহলে কারখানাই-বা টিকে থাকবে কীভাবে, আর দেশের অর্থনীতিই-বা বাঁচবে কীভাবে? আগে প্রতি কেজি পণ্যের এয়ার ফ্রেইট ছিল সাড়ে চার থেকে পাঁচ মার্কিন ডলার। এখন এটি ১২ ডলারে ঠেকেছে। কারণ কার্গো ফ্লাইট পাওয়া যায় না, অপরদিকে বিভিন্ন গন্তব্যের শিডিউল ফ্লাইটগুলোও চলছে না।

এদিকে, লকডাউন কার্যকর করার সময় গরিব-দুখী খেটে খাওয়া মানুষের ব্যাপক কষ্ট হয়েছে। সরকার অর্থ খরচ করেছে ঠিকই; কিন্তু এর সুফল গরিবরা পায়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছে; কিন্তু সরকার অনায়াসেই এ সমালোচনা এড়াতে পারত। লকাডাউন ঘোষণার আগে যারা দিন আনে দিন খায় তাদের একটি তালিকা করা যেত। প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধি এই তালিকা সহজেই তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনগুলোতে ওয়ার্ড কমিশনারের মাধ্যমে ওয়ার্ডভিত্তিক এ তালিকা তৈরি করানো যেত। তালিকা তৈরির পর তাদেরকে কোভিড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কার্ড সরবরাহ করা গেলে প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে অর্থ বা খাদ্যসহায়তা বর্তমানে টহলরত সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং র‌্যাবের মাধ্যমে খুব সহজেই হতদরিদ্রদের হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া যেত। এতে লকডাইন যেমন কার্যকর হতো সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয়ও কমত। সঙ্গে সঙ্গে এত দীর্ঘ লকডাউন না দিয়ে সরকার বা জাতীয় কমিটি এক সপ্তাহ কিংবা পক্ষকালব্যাপী কার্ফিউ কার্যকর করতে পারত।

আবারও বাড়ছে লকডাউন, প্রজ্ঞাপন কাল

তবে যে কোনো কিছুর সমালোচনা করার আগে একটু বাস্তবধর্মী চিন্তাও করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশ কেন বিশ্বের জন্যও নতুন। আমাদের ভুলত্রুটিগুলো থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। ভবিষ্যতে আর্থিক বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক কি না—তাও ভেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে আর্থিক খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া যায়।

সর্বশেষ সরকার পহেলা আগস্ট থেকে রপ্তানিমুখী সব কারখানা খুলে দিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত দূরদর্শী বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া গেছে। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, কারখানা বন্ধ থাকলে দেশের অর্থনীতিতে যে সুনামি বয়ে যাবে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। কারখানার মালিকদের বিষয়ে তিনি যেমন চিন্তা করেছেন সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের বিষয়েও তার চিন্তা আছে।

তবে কারখানা খুললেই যে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল—এমন ভাবার কারণ নেই। এখন কারখানামালিকদের দায়িত্ববোধ আরো বেড়ে গেল। প্রতিটি কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা করা এবং শ্রমিকদের নীবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে সংক্রমণ রোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার কারখানা মালিকদের কথা শুনেছে, এবার মালিকদের সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিদান দিতে হবে।

লেখক: সাবেক সহসভাপতি, বিজিএমইএ

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x