ব্যবসায়কে টেকসই করার জন্য গ্রিন মার্কেটিংয়ের বিকল্প নেই

ব্যবসায়কে টেকসই করার জন্য গ্রিন মার্কেটিংয়ের বিকল্প নেই
ছবি: প্রতীকী

বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা মানুষের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল অধিকাংশ মানুষকেই বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগে নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে দেখা যায়। চিকিৎসকগণ আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসকে এই অসুখ-বিসুখের জন্য দায়ী করেন। আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ আমদেরই কারণে বিপন্ন।

ক্রমবর্ধমান মানুষের প্রয়োজন মেটাতে আমরা পরিবেশ ধ্বংস করে শিল্প কারখানা তৈরি করছি। আবার এই শিল্প কারখানা চালু রাখার জন্য প্রকৃতি থেকে ইচ্ছেমতো কাঁচামাল আহরণ করছি অথচ প্রকৃতির এই শূণ্যতা পূরণের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছি না। আবার এসব কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত পণ্য আমাদের পক্ষে কতটুকু উপকারি অথবা ক্ষতিকর তাও ভেবে দেখার সময় কারো নেই। অর্থ উপার্জনের নিমিত্তে যা খুশি পণ্য উৎপাদন ও বিপনন করে যাই।অথচ আমাদের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করার পর ভোক্তারা স্বাস্থ্য অথবা মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে কি না তা নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যথা থাকে না (কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া)।

উৎপাদক ও বিপণনকারীরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমরাও ভোক্তা। আমরা যা উৎপাদন ও বিপণন করি, তা আমরাও ভোগ করি। অর্থাৎ সমাজে আমরাই উৎপাদক ও বিপণনকারী; আবার আমরাই ভোক্তা। ভোক্তা হিসেবে চিন্তা করলে আমরা সবসময় উৎপাদক ও বিপণনকারীর নিকট স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য আশা করি। তাহলে উৎপাদক ও বিপণনকারী হিসেবে আমরা কেন ভোক্তার হাতে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য তুলে দেওয়ার চেষ্টা করি না। আমরা মনে হয় এই বিষয় নিয়ে আমাদের এখনই ভাবা জরুরি। অন্যথায় আমরা শীঘ্রই অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাব। তখন সমাজে না থাকবে মানুষ, না থাকবে ব্যবসা।

আমাদের বেপরোয়া চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের পরিবেশ এবং জলবায়ু আজ হুমকির মুখে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। ভূপৃষ্ঠে বেড়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মহামারি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্যোগের কারণে অসংখ্য মানুষ ও অন্যান্য জীব মারা যাচ্ছে। সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে পর্বত ও মেরু এলাকার বরফ গলে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। বেড়েছে সমুদ্রের পানির লবনাক্ততা। নষ্ট হচ্ছে ফসলী জমি। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট তৈরি হবে। অনেক অঞ্চলের মানুষ হয়তো না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

অপরিকল্পিত এবং অস্বাস্থ্যকর নগরায়ন ও শিল্পায়নের জন্য বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ক্ষয় হচ্ছে ওজন স্তর। ওজন স্তরের এই ক্ষয় হয়ে যাওয়া বিশাল চিন্তার কারণ। এটি ক্ষয় হয়ে গেলে সূর্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনী রশ্মী সরাসরি পৌঁছে যাবে পৃথিবীতে। এই অতি বেগুনী রশ্মী বিপর্যয় ডেকে আনবে পরিবেশের। ক্যান্সারসহ নানা রোগের প্রদুর্ভাব দেখা দেবে। মানবজাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তখন এই উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা ব্যাহত হবে মারাত্মকভাবে।

শুধু পণ্যের গুণাগুণ ও পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করলেই গ্রিন মার্কেটিং শেষ হয়ে যায় না। পণ্যের জন্য মোড়কটি হতে হবে পরিবেশ বান্ধব। পণ্যের মোড়ক হিসেবে যা ব্যবহার করা হবে তা যেন কোনভাবেই পরিবেশকে দূষিত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বায়ো-ডিগ্রেডেবল উপাদান দিয়ে পণ্যের মোড়ক তৈরি করতে হবে। অতঃপর সেই পণ্যটি যৌক্তিক মূল্যে (ফেয়ার প্রাইস) ভোক্তার হতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতি মুনাফাখোররা ব্যবসায়ে বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। আর শর্ট টার্ম গেইন কোন ভাল ব্যবসায়িক কৌশল হতে পারে না। ভোক্তা যদি কোন দিন বুঝতে পারে যে তাকে ঠকানো হয়েছে সে কিন্তু ছুড়ে ফেলতে দ্বিতীয় বার ভাববে না।

পণ্যের প্রসার ও বিজ্ঞাপন দিতে হবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে। যোগাযোগের উপায়-উপকরণগুলো হতে হবে পরিবেশ বান্ধব। ইলেক্টনিক ও ডিজিটাল মিডয়ায় পণ্যের প্রচার করলে পরিবেশ তুলনামুলক কম ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রিসোর্সের ব্যবহারও কম হয়। ডিজিটাল মিডয়ায় কমিউনিকেশনস - এর খরচও তুলনামুলক কম। রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টও বেশি।

পণ্যের বন্টন প্রক্রিয়াও হতে হবে কস্ট ইফেক্টিভ। পৌঁছে দিতে হবে ভোক্তার হাতের নাগালে যেন তারাও কম খরচে পণ্য সংগ্রহ করতে পারে। পণ্য বন্টনের জন্য পরিবেশ বান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। পরিবহন পরিচালনায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানীর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ মার্কেটিং মিক্সের চারটি উপাদানই এমনভাবে ডিজাইন ও ডেভেলপ করতে হবে যেন এগুলো কোনভাবেই ভোক্তার স্বাস্থ্যের পক্ষে এবং পরিবেশের পক্ষে ক্ষতির কারণ হয়ে না উঠে। আর সচেতনভাবে এইটুকু করা সম্ভব হলেই পৃথিবী টিকে থাকবে, মানব সভ্যতা টিকে থাকবে এবং ব্যবসায় বাণিজ্য টিকে থাকবে।

লেখক: গবেষক ও টেকসই বিপণন বিশেষজ্ঞ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x