বিপজ্জনক তালেবানের ক্ষমতা দখল
সমস্ত প্রেডিকশন ব্যর্থ করে অসামান্য ঝোড়ো গতিতে উগ্র ইসলামপন্থি তালেবান বাহিনী ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। সংগত কারণেই সারা বিশ্বের উদার গণতান্ত্রিক ও শুভ বোধসম্পন্ন মানুষের কপালে ভাঁজ পড়া শুরু হয়েছে, ভবিষ্যতে তারা না আবার আগের মতো বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস রপ্তানি শুরু করে। এটা একটা দেশের শুধু সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়।
পার্শ্ববর্তী দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সক্রিয় সহায়তায় বিশ্বস্বীকৃত একটা সরকারকে যুদ্ধের মাধ্যমে যেভাবে উত্খাত করল, তাতে এশিয়া-আফ্রিকার বহু দেশের জন্য যে উদাহরণ সৃষ্টি হলো, সেটি বিশ্বের শান্তি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এক মহা বিপজ্জনক অশনিসংকেত। আগামী দিনে একইভাবে নাইজেরিয়ার বোকোহারাম সোমালিয়ার আল-শাবাব এবং মালির সশস্ত্র উগ্রবাদী ইসলামিস্ট গ্রুপ যদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়, তাহলে বিশ্বসম্প্রদায় কী করবে, সেটি তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
পৌরাণিক কাল থেকে আধুনিক কালের বর্তমান সময় পর্যন্ত শতশত উদাহরণ রয়েছে এই মর্মে যে, দানব মানুষকে ছলনা করার জন্য সাময়িকভাবে অতি সুন্দর চেহারা ধারণ করে। কিন্তু আপাতস্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলেই আবার দানবীয় রূপ ধারণ করে। দানবের সুন্দর রূপ দেখে যখনই মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে তখনই লঙ্কাকাণ্ড, অর্থাত্ যুদ্ধবিগ্রহ, রক্তপাত আর মানবসভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। দু-একটি ছোট উদাহরণ দিই। পৌরাণিক কাহিনি রামায়ণে উল্লেখ আছে, রাবণের হুকুমে রাক্ষস মারীচ অন্যান্য অদ্ভুত সব রঙের মিশ্রণে মায়ামৃগের রূপ ধারণ করে এবং তাতে রাম-সীতা বিভ্রান্ত হওয়ায় রাবণ সীতাকে হরণ করতে সক্ষম হয়। তারপর ভয়ংকর রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে রাক্ষসরাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। আধুনিক কালের কথায় আসি।
১৯৩৫ সালে ইতালির ডিকটেটর মুসোলিনি কর্তৃক আবিসিনিয়া, বর্তমানের ইথিওপিয়া দখলের মধ্যে দিয়ে বিশ্বশান্তি ভঙ্গের অশনিসংকেত বেজে উঠলেও বিশ্বসম্প্রদায় তখন নিশ্চুপ থাকে, নীরবে এত বড় নগ্ন আগ্রাসন মেনে নেয়। তারপর ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে আরেক ডিকটেটর হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির এই দখলদারিত্ব মেনে নিয়ে হিটলারের সঙ্গে সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ইতিহাসের মিউনিখ চুক্তি নামে পরিচিত। ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য এই, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঐ সময়ে হিটলারের সঙ্গে আপস না করলে হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো যেত, রক্ষা পেত প্রায় ৬ কোটি মানুষের জীবন। দেশের পর দেশ ধ্বংস হতো না, হিরোশিমা-নাগাশাকিতে পারমাণবিক বোমা পড়ত না।
ইউরোপের এই যুদ্ধের পরিণতি থেকে আমরা, বাংলার মানুষও রক্ষা পাইনি। সংযুক্ত বাংলার প্রায় ৪৩ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করে। কমিউনিস্ট ও হিটলারের উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিল পরস্পরের চরম শত্রু। বলা যায়, তেল আর জল। কিন্তু তত্কালীন সোভিয়েত নেতা স্তালিন ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট হিটলারে সঙ্গে আপসনামা অর্থাত্ তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাবে না—এই মর্মে চুক্তি স্বাক্ষর করলেন, যেমনটি আমেরিকা করেছে তালেবানের সঙ্গে ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। স্তালিনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের এক সপ্তাহের মাথায় হিটলার ইউরোপের সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। এক বছর যেতে না যেতেই চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নকেও আক্রমণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত হিটলারের পতন ঘটে, সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্র পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বিজয় অর্জন করে বটে, কিন্তু সোভিয়েতকে চরম মূল্য দিতে হয়, প্রায় ২ কোটি সোভিয়েত মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়, আর ধ্বংসযজ্ঞের তো কোনো হিসাব নেই।
পণ্ডিত ব্যক্তিদের অমোঘ বাণী, ভবিষ্যত্ বুঝতে হলে পেছনের দিকে তাকাতে হবে। এই সূত্রে বলা যায়, তালেবান বাহিনী বিশ্বশান্তির জন্য এক মহা বিপদ সংকেত। আঞ্চলিক ও বিশ্বশক্তিবর্গ যদি ইতিহাসের শিক্ষাকে উপেক্ষা করে তালেবানের সঙ্গে আপস রক্ষা করতে চায়, তাহলে কারো জন্য সেটা সুখকর হবে না। তালেবান এর আগে ১৯৯৬-২০০১—পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল। তারপর ২০ বছর তারা যুদ্ধ করছে। এই দীর্ঘ সময়ে এমন একটি উদাহরণ কি আছে যার মাধ্যমে তালেবানকে বিশ্বাস করা যায় যে তারা নারী অধিকারসহ বিশ্বমানবতা ও শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না? এখন আপাতত বলছে, তারা নারী অধিকারকে সম্মান করবে। কিন্তু মাত্র তিন মাস আগে গত মে মাসে মেয়েদের একটি হাই স্কুলে তারা আক্রমণ চালিয়ে ৯০ জন কোমলপতি কিশোরীকে হত্যা করে।
তালেবানের অভিযোগ, এই স্কুলে পুরুষ শিক্ষক থাকার কারণে তারা এটা করেছে। পুরুষ শিক্ষক আছে—এই অভিযোগে নির্দোষ নিরীহ ৯০ জন কিশোরীকে যারা হত্যা করতে পারে, তাদের বিশ্বাস করার কি উপায় আছে? তালেবানের বর্বরতা ও ভয়ে মোট ৪ কোটি জনসংখ্যার ২ কোটি মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হিসেবে পলায়নপর চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে, ২৬ লাখ মানুষ একই কারণে পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান, ইরান ও তুরঙ্কে শরণার্থী জীবন যাপন করছে। গত ১৫ আগস্ট থেকে হাজার হাজার নর-নারী প্রাণভয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করার জন্য জীবন বাজি রেখে যেভাবে কাবুলের বিমানবন্দরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, তাতে কোনো অজুহাতেই বলার সুযোগ নেই যে তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। প্রয়াত আহমদ শাহ মাসুদের দুর্ধর্ষ সশস্ত্র বাহিনী নর্দান অ্যালায়েন্স ইতিমধ্যেই তালেবানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তালেবান ঘোষণা দিয়েছে, ইসলামিস্ট শরিয়া আইন অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করা হবে। তাদের শরিয়া আইন আসলে শান্তির ধর্ম ইসলামের সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে বিশ্বের বড় বড় আলেমের অনেক প্রশ্ন আছে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আপাতত তারা হামিদ কারজাই ও আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতা করে একটা সরকার গঠন করতে পারে।
তবে একটু সুসংহত হতে পারলেই তালেবান তার আসল রূপে হাজির হবে। এক লেখায় সব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়া যাবে না। প্রথমে ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের কথা বলি। সারা বিশ্বের মতো ইউরোপকেন্দ্রিক উগ্রপন্থি ইসলামিস্ট গোষ্ঠী তালেবানের উত্থানে উত্সাহিত হবে, যার কথা এখনই শোনা যাচ্ছে। ইউরোপের মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়বে। আফগানিস্তান থেকে দেশান্তরী হওয়া মানুষের ইউরোপমুখী হওয়ার প্রবণতায় ইউরোপে শরণার্থী চাপ বৃদ্ধি পাবে। এর বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এবং উত্তর আমেরিকায় উগ্রপন্থি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ডানপন্থি রাজনৈতিক পক্ষ শক্তিশালী হবে, তাদের জনসমর্থন বাড়বে। হাঙ্গেরির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভিকটর অরবানের মতো কট্টরপন্থি রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে ইউরোপব্যাপী। তাতে ক্লাশ অব সিভিলাইজেশনের প্রবক্তা অধ্যাপক স্যামুয়েল হান্টিংটন এবং ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট’ গ্রন্থের প্রণেতা বার্নার্ড লিউসের মতো বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে বলছেন যে, ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্বের মূল্যবোধের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য, তাদের চিন্তাচেতনার গ্রহণযোগ্যতা পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধি পাবে। পাকিস্তানের কথা বলি। পাকিস্তানই একমাত্র দেশ, যার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান উল্লাসের সঙ্গে বলেছেন, দাসত্বমুক্ত হয়ে এবারই আফগানিস্তান সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হলো।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থন শুধু নয়, সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলেই যে তালেবান বাহিনীর এত দ্রুত বিজয় ঘটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তানের উল্লসিত হওয়ার একমাত্র কারণ, আফগানিস্তান থেকে ভারতের উপস্থিতি ও প্রভাব এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আপাতত নেই হয়ে গেল। তালেবান এখন যত যা বলুক, অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা, আইএস, হাক্কানি গ্রুপ ও টিটিপির (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) সঙ্গে হরিহর আত্মার সম্পর্ক পূর্বে কখনো যেমন ছিন্ন হয়নি,ভবিষ্যতেও হবে না। বহু ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথার যথেষ্ট দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। টিটিপি ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ইতিপূর্বে পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদর দপ্তরসহ স্কুল-কলেজে আক্রমণ চালিয়ে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে। আর পাকিস্তান যদি তাদের পারমাণবিক সরঞ্জামাদিকে নিরাপদে রাখার জন্য আফগানিস্তানে রাখে এবং তা যদি কোনোভাবে তালেবান বাহিনীর হাতে পড়ে, তাহলে সেটা পাকিস্তানের জন্য মহাবিপদের বিষয় হবে। এই জায়গায় আমেরিকা কোনো ছাড় দেবে না।
সীমান্ত থেকে আমেরিকান সেনাবাহিনী চলে যাওয়ায় ইরান স্বস্তি প্রকাশ করলেও শিয়া-সুন্নির মৌলিক বিবাদ থাকায় ইরানের জন্য নতুন রকমের নিরাপত্তা শঙ্কার সৃষ্টি হবে। ওয়াহাবিতন্ত্রের কট্টর পন্থায় বিশ্বাসী তালেবান শিয়াদের মুসলমানই মনে করে না। আমেরিকা চলে যাওয়ায় সংগত কারণে চীনের জন্য তা স্বস্তির এবং চীন আপাতত তালেবানদের পাশে দাঁড়াবে, তালেবানও অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে। তবে জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলমানদের ওপর চীন কর্তৃক নির্যাতনের ঘটনা একসময়ে এসে এই সুবিধাবাদী সম্পর্কের অবসান ঘটাতে পারে। ভূরাজনীতির বর্তমান সমীকরণে চীনের সঙ্গে রাশিয়া থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আপাতত সবচেয়ে বেশি অস্বস্তির ও অসুবিধায় পড়তে যাচ্ছে ভারত। বিশাল বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের বিপরীতে যে স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা ছিল সেটা ভারত হারাতে চলেছে। এই সময়ে বন্ধু ভারতের বিষয়টা আমেরিকা কতখানি ভেবেছে, সে এক প্রশ্ন।
চীন-পাকিস্তান অক্ষ সংগত কারণেই ভারতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির জন্য যা করণীয়, তার সবই করবে। আগের মতো পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মুহম্মদের তত্ত্বাবধানে আফগানিস্তান থেকে ফ্রি হওয়া জিহাদিদের কাশ্মীরের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ ঘটাবে। পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠনের নেতারা বলা শুরু করেছে, আমেরিকার কবল থেকে তারা আফগানিস্তানকে মুক্ত করেছে। এবার তাদের টার্গেট কাশ্মীর। সুতরাং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ বৃদ্ধির প্রবল শঙ্কা সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশের জন্যও এই ঘটনার বড় তাত্পর্য রয়েছে। তা নিয়ে অন্য এক লেখায় বিস্তারিত থাকবে। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, বিপজ্জনক তালেবানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের জন্য আশঙ্কার বিষয়।
লেখক :গবেষক এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক


