বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর করণীয় 

বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর করণীয় 
,

করোনা ভাইরাসের কারণে দেড় বছর আগে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তারপর শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষার মাধ্যমে চলে শিক্ষা কার্যক্রম। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মাটির ঘ্রাণ পায়নি কোনো শিক্ষার্থী। দিনের পর দিন ঘরে থেকে তাদের পার করতে হয়েছে অনেকটা একঘেয়েমি জীবন। আজ ১২ সেপ্টেম্বর যখন প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছে সরকার। এখন বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার আশায় বুক বাধছে শিক্ষার্থীরা। আবারও তাদের পদচারণায় মুখরিত হবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার এমন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সরকার সত্যিই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। সবকিছু খুললেও শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এ জন্য সরকারকে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। কিন্তু সেই সমালোচনায় কান দেয়নি সরকার। কারণ, মহামারির ভয়ঙ্কর থাবায় একটু ভুল হলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারতো। এমনিতেই বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। তার উপর রয়েছে সচেতনতার অভাব। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি। সেখানে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মানা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সচেতন। আবার তারা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তাই এমন মহামারি পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণসহ জরুরি কিছু করণীয় আছে।

বাংলাদেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এক কথায় বলতে গেলে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব চিকিৎসাকেন্দ্রে কোভিড চিকিৎসা সেবা চালু করা প্রয়োজন। কারণ মহামারি কখন শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা। সেখানে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কাজটি সহজ হবে না; কিংবা কেউ সংক্রমিত হলে আইসোলেশনের থাকাও হবে কঠিন। ক্যাম্পাসের একাডেমিক ও হলগুলোতে পর্যাপ্ত স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থা রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষকদের সার্বিক দিক-নির্দেশনায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা, প্রাণোচ্ছল শিক্ষাঙ্গন

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষকদের মহামারি পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে চালিয়ে নিতে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়মিত তাপমাত্রা মাপা। প্রতিষ্ঠানের একটি কক্ষ প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ আইসোলেশন কক্ষ হিসেবে প্রস্তুত রাখতে হবে। ক্যাম্পাসের সব কক্ষ, সিঁড়ি, আঙ্গিনা ও ওয়াসরুম নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বসার ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি মহামারি পরিস্থিতিতে সরকার প্রদত্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে আনন্দঘন শিখন কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা বেশ জরুরি।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে চালু রাখতে ও গত ১৮ মাসের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু করণীয় রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত ও সফলভাবে চালু রাখতে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক গ্রুপিং, প্রভাব বিস্তার, পদ-পদবীসহ নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে মাঝে মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা প্রায় সবারই জানা। তাই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে সেখানে শিক্ষার্থীদের এই সব কার্যক্রম থেকে সরে এসে ক্যাম্পাসে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনায় প্রশাসনকে সহায়তা করা বেশ জরুরি।

যেসব শিক্ষার্থী এখনো কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিতে পারেনি, তাদের অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভ্যাকসিন নিতে হবে। অন্যদিকে মহামারি পরিস্থিতিতে বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আবাসিক হল থেকে ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে অহেতুক ঘোরাঘুরি না উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে যেহেতু শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি তাই এক্ষেত্রে করোনা সংক্রমণ ও অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার বেশ সম্ভাবনা থাকবে।

মোদ্দাকথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ক্ষেত্রে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এই চ্যালেঞ্জে অবশ্যই আমাদের জিততে হবে এবং অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় খুলে শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত রাখতে হবে। কারণ এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি স্নেহের শিক্ষার্থীরা। যাদের মেধা, মনন ও উন্নত চিন্তাভাবনায় সফলভাবে এগিয়ে যাবে দেশ। মহামারি পরিস্থিতিতে শিক্ষাখাতের ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x