আফগানিস্তানের ঘটনাবলি এবং ভবিষ্যৎ

আফগানিস্তানের ঘটনাবলি এবং ভবিষ্যৎ
ফাইল ছবি

আমরা আশা করব, আফগানিস্তানের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আরো গতি পাবে। বিশ্বজনমতের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, জাপান, জার্মানিসহ গণতান্ত্রিক দেশসমূহ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে। বিশ্বের উন্নয়নশীল গণতন্ত্রকামী দেশসমূহও এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। এটাই বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করে আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত একটি রাষ্ট্র। সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের মাধ্যমে বিশ্বসভ্যতার শক্তিশালী কেন্দ্র হলো ভারতীয় উপমহাদেশ। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এখানে মিলন ঘটেছে।

Press review: Impact of US-NATO Afghan pullout on Central Asia and Tokyo's  endless talks - Press Review - TASS

এই উপমহাদেশের একটি দেশ হিসেবে আফগানিস্তান এই উপমহাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতের কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের রাজধানী পুরুষপুর তথা আজকের পেশোয়ার উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন নগরগুলোর মধ্য একটি। যোগাযোগব্যবস্থায় এই উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই অগ্রগামী ছিল। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সময়ে বাংলাদেশের মহাস্থানগড় থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছিল। আফগান সম্রাট শেরশাহ সুরি স্বল্প সময়ের জন্য ভারত শাসন করলেও তিনি গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড নির্মাণ করেন এবং পরবর্তীকালে মোগল সম্রাটরা তা আরো উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় আফগানিস্তান ও নেপাল পরোক্ষভাবে শাসনাধীন ছিল এবং বাকি পুরো ভারতবর্ষ সরাসরি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তৎকালীন বিশ্বে উন্নত রেল ও সড়কপথের কারণে জনগণের মধ্য যোগাযোগ ও সংযোগ বৃদ্ধি করেছিল। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারিত হওয়ার ফলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছিলেন যে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তিনটি রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল। তিনটিই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০ শিশু অপহরণ করলো তালেবানরা

আমরা জানি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর সহযোগী হিসেবে আফগান নেতা আবদুল গাফ্ফার খান, যিনি সীমান্তগান্ধী হিসেবে পরিচিত, তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আফগানিস্তানের জালালাবাদে তার সমাধিসৌধ রয়েছে। তিনি আজীবন অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করেছেন। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে আফগানিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রে বিভক্ত আফগানিস্তান রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের অধীনে শাসিত হচ্ছিল। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের কর্তৃত্বভার গ্রহণ করে এবং তাদের মনোনীত ব্যক্তিরা শাসনকার্য পরিচালনা করে। পাকিস্তান আফগানদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকে। যারা পরবর্তীকালে তালেবান নামে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব এ ব্যাপারে সহযোগিতা করে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণের অবসান হয়। ধর্মান্ধতার ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানি রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত তালেবান ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল। এই সময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়েদা ও অন্যান্য গোষ্ঠীর জন্য আফগানিস্তান অভায়ারণ্যে পরিণত হয়। তারা ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে বুদ্ধমূর্তিসহ ইতিহাসও ঐতিহ্যের নিদর্শনসমূহ ধ্বংস করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে আক্রমণ ও হতাহতের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণে নেয়। হামিদ কারজাই থেকে আরম্ভ করে আশরাফ ঘানি সরকার ক্ষমতাসীন ছিল, এর ফলে সমাজ রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারী ও সংখ্যালঘুর সম্পৃক্ততা বেড়ে যায়।

Bring the Troops Home' Is a Dream, Not a Strategy

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিভিন্ন স্তরে নারীর শতকরা ২০ ভাগ কোটাও চালু হয়। কাতারের দোহায় আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সেনা আগস্টের মধ্যে চলে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তালেবান গোষ্ঠী আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। আশরাফ ঘানি সরকারের সাড়ে ৩ লাখ প্রশিক্ষিত এবং প্রায় ৫০ হাজার সশস্ত্র আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের প্রতিহত করতে পারেনি। যদিও বিগত দুই দশকে মুক্ত চিন্তার ফলে আফগান সমাজ, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনীতিক শক্তির অভাবে তারা তালেবানদের মোকাবিলা করতে পারেনি। তবে ইতিমধ্যে আহমেদ মাসুদের নেতৃত্বে এবং প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট সালেহর ও প্রতিরোধ যোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারেনি। এছাড়া তালেবানদের বিরুদ্ধে কাবুলসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, নারীদের নেতৃত্বেও মিছিল হচ্ছে। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে তালেবানদের বিরোধী একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক শক্তির আত্মপ্রকাশকেই ইঙ্গিত করে। আমরা জানি, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবান সরকার মধ্যযুগীয় পশ্চাত্পদ ধ্যানধারণা নিয়ে ধর্মকে অপব্যবহার করে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করেছে, নারী ও সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অধিকার হরণ করেছে। ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল-কায়েদা গঠন করে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এদের মতাদর্শে বিশ্বাসী জইসি মোহাম্মদ, লস্কর এ তৈয়বা ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন স্থানে হামলা করেছে। যদিও ভারত, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সরকার জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী শক্ত অবস্থানের কারণে কর্মকাণ্ড সীমিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন নামে এখনো তারা কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা চালাচ্ছে। পাকিস্তান এখনো ঐ অপশক্তিকে মদত দিয়ে যাচ্ছে। ওসামা বিন লাদেনকে শায়েস্তা করাটাও পাকিস্তান হজম করতে পারেনি। তাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে লাদেনকে শহিদ বলে অভিহিত করেছেন। এর থেকে প্রমাণিত হয়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদকে ধারণ করেই রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিচালনা করছে। আমরা জানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তার মিত্রদের ন্যাটো বাহিনী সামগ্রিক বিবেচনায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করেছে। যদিও কোনো কোনো ইস্যুতে সমালোচনার সুযোগ আছে। কিন্তু চীনের কর্তৃত্ববাদী, অগণতান্ত্রিক ও সম্প্রসারণবাদী কর্মকাণ্ড সবারই জানা। সাম্প্রতিক কালে দক্ষিণ চীন সাগর এবং অনন্যা অঞ্চলে এ কার্যকলাপ চরম আকার ধারণ করে। এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান অস্ট্রেলিয়া, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোয়াড গঠন করে মোকাবিলা করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সফল ও হচ্ছে। কোয়াড প্লাসে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও নিউজিল্যান্ড। দক্ষিণপূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনন্যা দেশও এর সঙ্গে সহযোগিতা করছে। শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নে এই দেশগুলো ভূমিকা রাখছে এবং রাখবে। আমরা জানি, আধুনিক বিশ্বে জাতি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পারিচালিত হয়। সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করে মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় ফলে সেখানে জ্ঞানবিজ্ঞান বিকশিত হয়। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি সমাজ ও রাজনৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পায়। ধর্ম সমাজে মূল্যবোধ সমৃদ্ধ করে সমাজকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ধর্ম, বর্ণ নৃতাত্ত্বিক বিষয়কে ব্যবহার করে সমাজ ও রাজনীতিতে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। জাঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে নিয়ে যায়। পাকিস্তান, মিয়ানমার, উত্তর-কোরিয়া এর উদাহরণ।

China may send peacekeeping force to Afghanistan after US troops leave,  observers say | South China Morning Post

এখানে উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মাবলম্বী, খ্রিষ্টান, মুসলিম, হিন্দুও বৌদ্ধ বিভিন্ন দেশে রয়েছে। কোন দেশে তারা সংখ্যাগুরু অন্য দেশে তারা সংখ্যালঘু। উল্লেখ্য, মুসলিম রাষ্ট্রে কমপক্ষে শতকরা ৬০ ভাগ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বাস করে, অন্যদিকে ৪০ ভাগ যেখানে তারা সংখ্যালঘু। আধুনিক বিশ্বে ধর্মীয় সংহতির বিষয় বলে শান্তি ও সংহতির পরিবর্তে বিভেদ ও মতানৈক্য সৃষ্টি করে। অন্যদিকে বিদেশি গণতান্ত্রিক শক্তি অনেক ক্ষেত্রেই দেশের অগ্রগতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে, এমনকি বিদেশি সৈন্য দেশের মুক্তিসংগ্রামে এবং শান্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যার ফলে জাতি রাষ্ট্রের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে। এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বরং ইউরোপের জার্মানিসহ অন্যান্য দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও নেপালের জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়ও ভারত সহযোগিতা করেছে। আমরা আশা করব, আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক শক্তি শক্তিশালী হবে এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের সহযোগিতায় আফগানিস্তান তার অতীত সভ্যতাকে ধারণ করে গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

দুই দশক পরেও তালেবানদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং হবে। চিহ্নিত সব সন্ত্রাসীকে অন্তর্ভুক্ত করেই সরকার পরিচালনা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আফগানিস্তানের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে সভ্যতা ইতিহাস ঐতিহ্য মেনে নিয়ে বহুত্ববাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। আফগানিস্তানের ৪২ শতাংশ পশতু জনগোষ্ঠী রয়েছে, ২৭ শতাংশ তাজিক ৯ শতাংশ উজবেকসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী আছে, ধর্মের ভিত্তিতে ৮৪ শতাংশ শিয়া, ১৫ শতাংশ সুন্নি এবং ১ শতাংশ ছিল হিন্দু-শিখ। আমরা আশা করব, আফগানিস্তানের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আরো গতি পাবে। বিশ্বজনমতের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, জাপান, জার্মানিসহ গণতান্ত্রিক দেশসমূহ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে। বিশ্বের উন্নয়নশীল গণতন্ত্রকামী দেশসমূহও এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। এটাই বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করে।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত, বীর মুক্তিযোদ্ধা

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x