তরুণদের নতুন দুশ্চিন্তার নাম হৃদরোগ

তরুণদের নতুন দুশ্চিন্তার নাম হৃদরোগ
[সংগৃহীত প্রতীকী ছবি]

বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হার্ট অ্যাটাক মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। একটা সময় সকলের ধারণা ছিল প্রবীণরাই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে থাকেন। তবে সেই ধারণাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি এবং তরুণ, যুবক বা মধ্যবয়স্করা হার্ট অ্যাটাকের শিকার হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যায়, যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। আবার এই মৃত্যুহারের ৬০ শতাংশ হয় হার্ট অ্যাটাকের কারণে। দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে করোনারি হৃদরোগের কারণে তিন চতুর্থাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে হৃদরোগের কারণে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত ১০ বছরে হার্ট অ্যাটাকের ফলে মৃত্যুর হার বাংলাদেশে পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩৫ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৪৮ গুণ বেড়েছে। তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ক্রমশ বাড়ছে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা।

প্রফেসর ডা. এ কিউ এম রেজা।

কমন হলেও অনেকেই হয়তো জানেন না যে হার্ট অ্যাটাক কি বা কেন হয়। তাদের সুবিধার্থে বলে রাখি, মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন, হার্ট অ্যাটাক যে নামেই ডাকুন না কেন, এটি একটি রক্তপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা জনিত মেডিক্যাল জটিলতা। কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে হার্টের রক্ত চলাচল হঠাৎ থেমে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে। সাধারণত রক্তনালীতে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে প্লেক গঠিত হয়, যাকে আমরা ব্লক নামেও চিনি। এটি হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ। সহজভাবে বলতে গেলে, ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনী হৃদযন্ত্রের একাংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। যার ফলে হার্ট অ্যাটাক হয়। যদি ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনী দ্রুত পুনরায় চালু করা না যায়, তাহলে সেই ধমনী দ্বারা চালিত হৃদযন্ত্রের অংশটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়।

সাধারণত হার্ট অ্যাটাক হওয়ার কিছুদিন বা সপ্তাহখানেক আগেই উপসর্গ দেখা দেয়। এসময় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে, সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে। তবে হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক হলে সেক্ষেত্রে মৃত্যুরঝুঁকিই বেশি। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক শরীরের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা এবং এর নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই। বরং জীবনযাপনে অসংগতি, অস্বাস্থ্যকর খাবার, জিনগত সমস্যা, মানসিক চাপ ইত্যাদি এর ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তবে হঠাৎ করে হয় বলে যে এটি উপসর্গহীন, তা কিন্তু নয়। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কিছু উপসর্গ হলো; বুকে অনবরত ব্যথা বা চাপ অনুভব করা, যা কিছু মিনিট স্থায়ী হয় এবং থেমে থেমে কয়েকবার হতে পারে; কাজ করার সময় ব্যথা অনুভব করা, কিন্তু বিশ্রাম নিলে আবার ভালবোধ করা। এছাড়া বমিভাব, বদহজম, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, ক্লান্তি ইত্যাদি হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের কিছু প্রচলিত উপসর্গ। তবে সকলের ক্ষেত্রেই যে এমনটিই হবে, তাও নয়। অন্যদিকে বর্তমানে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো কোভিড পরবর্তী হার্টের সমস্যা। যারা কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হয়েছেন তাদের অনেকেই রক্ত জমাটবদ্ধতার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, যা হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলেছে।

১ মাস আগে হার্ট অ্যাটাকের জানান দেবে যে ৫টি উপসর্গ!

এটা সত্য যে, বার্ধক্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে হার্টে ও রক্তনালীতে সমস্যা থাকলে ঝুঁকি যে আকাশচুম্বী হয়ে যায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আজকাল অল্প বয়সেও উল্লেখযোগ্য হারে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বাড়ছে। গত ১০ বছরের বিশ্ব পরিসংখ্যান বলছে, তরুণ ও মধ্যবয়স্কদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার প্রতিবছরে ২ শতাংশ করে বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, আধুনিক জীবনযাপনে অসংগত পরিবর্তন ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাই হলো হার্ট ও রক্তনালীতে সমস্যা বেড়ে যাওয়ার দুটি বড় কারণ। অতিরিক্ত ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি, পর্যাপ্ত না ঘুমানো, ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্বাস্থ্যকর খাবার বিশেষ করে চর্বি ও কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার খাওয়া, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বংশগত ইত্যাদি কারণে তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তবে এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

উত্তরটা খুবই সহজ। তরুণ বা বৃদ্ধ, হার্ট অ্যাটাক যে কারোই জীবন-নাশের কারণ হতে পারে। এমনকি মৃত্যু না হলেও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই এমন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে যা হার্টে সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায় না। এমন খাবার খেতে হবে যা রক্তনালীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। এমন কাজ করতে হবে যা শরীরকে সচল রাখবে। করণীয় হিসেবে; খাদ্যতালিকায় হার্টের জন্য উপকারী খাবার রাখুন, প্রতিদিন শরীরচর্চা করুন, মাদক ও তামাকজাত দ্রব্য পরিহার করুন, মনকে প্রফুল্ল রাখুন, বংশে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলে অল্প বয়স থেকেই স্ক্রিনিং করুন। দেখবেন, একেবারে না হলেও, আস্তে আস্তে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে আসবে।

নারীদের মধ্যে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি

প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু অকাল মৃত্যু কারোই কাম্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হার্ট অ্যাটাক। তাই সকলকেই সচেতন হতে হবে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে আগ্রহী হয়ে উঠতে হবে এবং হার্ট অ্যাটাকের মৃত্যু প্রতিরোধ করতে হবে।

লেখক: কোঅর্ডিনেটর এন্ড সিনিয়র কনসালটেন্ট - কার্ডিওলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x