শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত দুটি সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে

শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত দুটি সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে
শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নানাভাবে বাজারকে গতিশীল ও চাঙ্গা করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। ইতিমধ্যে বাজারে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাজার ক্রমশ চাঙা হয়ে উঠছে এবং অধিকাংশ সূচকে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। করোনাকালীন অবস্থায় সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রসমূহ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে তারা অধিক হারে শেয়ারবাজারমুখী হচ্ছেন। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিএসইসির বর্তমান নেতৃত্ব নানাভাবে বাজারকে গতিশীল করার লক্ষ্যে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার পরও কিছু কিচু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিতর্কের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ থাকলেও সৃষ্ট বিতর্ক যে বাজারকে ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তাই সুচিন্তিতভাবে বিতর্কের অবসান ঘটানো প্রয়োজন। নানা ধরনের অসংগতির কারণে আমাদের দেশের বাজার অতীতে ঠিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি। উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাগণ সাধারণত ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর নির্ভর করেন না। তারা শেয়ারবাজার থেকেই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আহরণ করেন। কিন্তু আমাদের দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উলটো। আমাদের দেশে উদ্যোক্তাগণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শেয়ারবাজার নয়, ব্যাংকের ওপর নির্ভর করেন। এতে ব্যাংকের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। ব্যাংক স্বাভাবিক গতিতে বিনিয়োগ করতে পারে না। আমাদের দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলো সাধারণত শেয়ারবাজারে তেমন একটা আসতে চায় না। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগণ পছন্দনীয় কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ পান না। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না। যেসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত, তাদের করপোরেট ট্যাক্স তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির তুলনায় ১০ শতাংশ কম হলেও শক্ত মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে চায় না। আবার কোনো কোনো কোম্পানি নামকাওয়াস্তে শেয়ার ছেড়ে করপোরেট ট্যাক্স মওকুফের সুবিধা নিচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা নিরুত্সাহিত করার লক্ষ্যে বিএসইসি সম্প্রতি অন্তত তিনটি কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের নতুন করে শেয়ার বাজারে ছাড়ার নির্দেশনা দিয়েছে।

আবারও ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজার

এই তিন কোম্পানি হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। এই তিন কোম্পানি নামমাত্র শেয়ার বাজারে ছেড়ে ব্যবসা করছে। শেয়ারবাজারে ওয়ালটনের লেনদেনযোগ্য শেয়ারের পরিমাণ মোট শেয়ারের মাত্র ১ শতাংশ, অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তাদের হাতে রয়েছে। বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ৫ শতাংশ শেয়ার বাজারে রয়েছে। বাজারে আইসিবির লেনদেনযোগ্য শেয়ার রয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। পাবলিক ইস্যু রুলস, ২০১৫তে উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৫০ কোটি টাকার বেশি, সেই সব কোম্পানিকে মোট শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ বাজারে ছাড়তে হবে। উল্লেখিত তিনটি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৫০ কোটি টাকার বেশি। ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে এসব প্রাতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রতি সাধারণত প্রচণ্ড আগ্রহ লক্ষ করা যায়। কিন্তু তারা কম পরিমাণ শেয়ার বাজারে ছাড়ছে বলে বিনিয়োগকারীরা চাইলেও এসব কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারছেন না। আইনি বাধ্যবাধকতায় এসব কোম্পানির প্রতিটিকে মোট শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ বাজারে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা অবশিষ্ট শেয়ারের মধ্য থেকে শেয়ার ছেড়ে ১০ শতাংশের কোটা পূরণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের বাজেটে শেয়ারবাজারে লিস্টেড কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর ননলিস্টেড কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্সের হার ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। সামান্য কিছু শেয়ার বাজারে ছেড়ে কোম্পানিগুলো করপোটে ট্যাক্স রিবেট সুবিধা ভোগ করছে। তাই বিএসইসি তাদের মোট শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ বাজারে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই বিএসইসির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ার থেকে বর্ধিত শেয়ার বাজারে নিয়ে এলে কোম্পানির কোনো লাভ হবে না, বরং এই শেয়ারের অর্থ কিছুসংখ্যক উদ্যোক্তা-পরিচালকের পকেটে চলে যাবে। বিএসইসির একজন সাবেক চেয়ারম্যান বলেছেন, বিএসইসি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মূলত উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতে বাধ্য করা। এতে বিনিয়োগকারী ও কোম্পানি কেউই লাভবান হবে না। বরং রিপিট আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু অথবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে বাজারে কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল।

সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারবাজার নিয়ে গুজব, তদন্তে বিএসইসি

বিএসইসির দ্বিতীয় আর একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তা হলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে রিপ্লেসমেন্ট প্রথা চালু করার উদ্যোগ নিয়ে। বাজারসংশ্লিষ্টদের বেশির ভাগাই এই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। অনেকেই রীতিমতো এই সিস্টেমের বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করছেন, নতুন এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘ভুল বার্তা’ পৌঁছানোর শঙ্কা তৈরি করেছে। যারা শেয়ারবাজার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বিতর্কিত এবং তা অবশ্যই প্রশ্নের উদ্রেক করবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে। শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি আনার কাজে নিয়োজিত মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো নতুন এই সিদ্ধান্তের কারণে নতুন কোম্পানিকে বাজারে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদের নানামুখি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তবে মার্চেন্ট ব্যাংকের দায়িত্বরত ব্যক্তিগণ বিসিআইসির এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করছেন না। অন্যদিকে কোম্পানির মালিকগণ বলছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে তাদের ওপর একধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। শেয়ারবাজারে পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধন করে বিএসইসি গত ২৪ আগস্ট গেজেট প্রকাশ করেছে। কিন্তু এই নতুন আইনি সংশোধনী আনার আগে সংশ্লিষ্ট মহলের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায় না। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সংশোধিত বিধিতে নতুন ধারা হিসেবে আইপিওতে রিপ্লেসমেন্ট ব্যবস্থাটি সংযোজিত হওয়ায় এখন থেকে যেসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে লেনদেন করবে, তারা আইপিওর জন্য ইস্যুকৃত শেয়ারের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত স্বীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পছন্দনীয় যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারবে। যেসব কোম্পানি ফিক্সড প্রাইজের ভিত্তিতে বাজারে আসবে, তারা উক্ত শেয়ার ফেইস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। আর যেসব কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজারে আসবে, তারা বিএসইসি কর্তৃক নির্ধারিত যৌক্তিক মূল্যে শেয়ার বিক্রি করবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির অনুমোদন পাওয়ার পরই প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করা যাবে।

ডিএসইতে সামান্য উত্থান হলেও সিএসইতে পতন

ইস্যুটি নিয়ে মন্তব্য করার সময় বিএসইসির একজন সাবেক চেয়ারম্যান বলেছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তে বিতর্কের সৃষ্টি হবে। কিছু মানুষকে বিশেষভাবে সুবিধাভোগী বানানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অন্য একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শেয়ারবাজারে আসার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রণোদনা হিসেবে এ ধরনের শেয়ার দেওয়ার বিধান রয়েছে। আমাদের এখানেও সেটা করা যেতে পারে। তবে সেটা কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। বিএসইসির একজন মুখপাত্র বলেন, ১৫ শতাংশ প্লেসমেন্ট শেয়ার কর্মীদের কাছে বিক্রি করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক নয়। কোনো কোম্পানি চাইলে আইপিওর মাধ্যমে ইস্যুকৃত শেয়ারের ১৫ শতাংশ তাদের কর্মী অথবা পছন্দনীয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারবে। আবার ইচ্ছা না করলে পুরো শেয়ারই আইপিওতে ছাড়তে পারবে। কাজেই এটা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। শেয়ারবাজার অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিনিয়োগক্ষেত্র। এখানে সাধারণ মানুষ তাদের পুঁজির সঙ্গে সঙ্গে ‘বিশ্বাস’ও বিনিয়োগ করে থাকেন। কাজেই তাদের পুঁজি কানোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না। শেয়ারবাজার উন্নয়নে বিএসইসির বর্তমান শীর্ষ নির্বাহীদের আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় নেই। যেসব সিদ্ধান্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, তা ভেবেচিন্তে গ্রহণ করাই উত্তম।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x