বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২১

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২১
ছবি: ফার্মাসিস্ট রাইয়ান আমজাদ।

সারা বিশ্বে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ফার্মাসিস্টদের অবদান এবং অগ্রগতিকে সমর্থন জানিয়ে ম্যানেজমেন্ট সাইন্সেস ফর হেলথ এর বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশও এই গুরুত্বপূর্ণ দিবসটি পালন করছে।

এ বছরের ফার্মাসিস্ট দিবসের থিমটি চমৎকার- ‘Pharmacy : Always trusted for your health’। বাংলায় আমরা বলতে পারি, ‘ফার্মেসি: আপনার স্বাস্থ্যের প্রতি সর্বদা বিশ্বস্ত’। এখানে একজন রোগী বা গ্রাহকের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে ফার্মাসিস্ট পেশাকে অভিহিত করা হয়েছে। যে কোনো সম্পর্কের মূলে আছে বিশ্বাস। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে বহুবার উঠে এসেছে যে কার্যকরী স্বাস্থ্যসেবার জন্য একজন রোগী এবং সেবাদানকারীর পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ভরসা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। PLOS One জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, যদি একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর জনগণের বিশ্বাস থাকে তবে তাদের মধ্যে অন্যদের তুলনায় রোগের উপসর্গ কম দেখা যায় এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়ে থাকে। গবেষণায় এও পাওয়া গিয়েছে যে, যদি একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর ওপর রোগীর বিশ্বাস থাকে তবে চিকিৎসার ফলাফল ইতিবাচক হয় এবং এক্ষেত্রে রোগীর সন্তুষ্টিও বেশি থাকে।

বৈশ্বিকভাবে প্রথম সারির সর্বোচ্চ বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পেশার মধ্যে ফার্মাসিস্ট পেশা একটি। গবেষণায় উঠে এসেছে সর্বোচ্চ বিশ্বস্ত পেশার কাতারে আরো আছে শিক্ষকতা এবং সাধারণ জনগণ বিজ্ঞানীদের ওপর সর্বোচ্চ ভরসা করেন। আনন্দের ব্যাপার হলো ফার্মাসিস্ট পেশাটি এই দুটি পেশারও প্রতিনিধিত্ব করে। ফার্মাসিস্টরা যেমন একাধারে ওষুধ তৈরি, বিপণন এবং নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন তেমনি ফার্মেসির পেশার সঙ্গে শিক্ষকতা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং একটি ফার্মেসি নিঃসন্দেহে আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য বিশ্বস্ত সঙ্গী বটে। এছাড়াও কোভিড-১৯ অতিমারিতে টিকা আবিষ্কার থেকে শুরু করে সমগ্র দেশ যখন লকডাউনে, ফার্মেসিতে ওষুধ নিশ্চিতকরণে দিনরাত কাজ করে গিয়েছেন ফার্মাসিস্টগণ। এই গুরুতর সময়ে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।

পেশা হিসেবে ফার্মাসিস্ট – lekhapora24.net

বাংলাদেশের অধিকাংশ ওষুধ বিক্রি হয় ফার্মাসিস্টের পরামর্শে। বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থান থেকে এটাই বাস্তব চিত্র যে, অধিকাংশ রোগীর কাছে ফার্মাসিস্টই তার প্রথম পরামর্শক, চিকিৎসক এবং আরোগ্য সহায়ক। ফার্মেসিতেই অনেক রোগী প্রথম জানতে পারে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রোগ বা ডায়াবেটিস এর কথা, জানতে পারে প্রথম গর্ভধারণের সংবাদ। জীবনের এই প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রোগী প্রথম যাকে কাছে পায় তিনি ফার্মাসিস্ট। আমরা জানি অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের বিষয়ে সারা বিশ্বে চলছে সতর্কতামূলক প্রচারণা। এই জটিল সমস্যার সহজ একটি সমাধান আমাদের এই ফার্মাসিস্ট ভাইবোনেরা। অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ করার গুরুত্ব একজন ফার্মাসিস্ট যখন রোগীকে বোঝাতে পারবে, যখন ফার্মাসিস্ট বলে দেবে যে অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ না করলে পরবর্তী সময়ে ওষুধ রোগীর দেহে আর কাজ করবে না অথবা কোর্স সম্পূর্ণ করার জন্য ফুড সাপ্লিমেন্ট না কিনে অ্যান্টিবায়োটিক ফুল কোর্স কেনা বেশি জরুরি, তখন একদম প্রাথমিক পর্যায়েই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো হাতিয়ারটি হয়ে দাঁড়ায় একজন ফার্মাসিস্ট।

বিষয়টি একজন ফার্মাসিস্টের জন্য যতটা আত্মতুষ্টির ঠিক ততটা নাজুকও বটে। প্রাথমিক পরামর্শক হিসেবে ফার্মাসিস্টের কাঁধে বর্তায় সঠিক তথ্য, সঠিক ওষুধ, সঠিক পরামর্শ প্রদানের দায়িত্ব। একজন ফার্মাসিস্টের ওপর দায়িত্ব বর্তায় রোগীকে ড্রাগ-ড্রাগ ইন্টারেকসন, ড্রাগ-ফুড ইন্টারেক্সান বুঝিয়া দেওয়া, ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে তার তথ্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে প্রতিবেদন হিসেবে পাঠানো, বাড়িতে ওষুধ সংরক্ষণের সঠিক উপায় বিস্তারিত জানানো যা আমাদের দেশে অনেকাংশে অনুপস্থিত।

প্রশ্ন হলো, একজন ফার্মাসিস্ট এত বড় এই দায়িত্ব পালনে কতটুকু প্রস্তুত? সত্তর ভাগ রোগীর রোগ নিরাময়কারী বন্ধু ভুল চিকিৎসা বা ভুল ওষুধ দিয়ে বড় কোনো ক্ষতি করে ফেলছে না তো? এই ভাবনা থেকে বাংলাদেশের সরকার দেশের সব ফার্মেসি এবং ফার্মাসিস্টদের উন্নয়ন সাধনে হাতে নেয় ‘বাংলাদেশ মডেল ফার্মেসি ইনিশিয়েটিভ’ নামের একটি প্রকল্প। প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যটি হলো ফার্মেসি এবং ফার্মাসিস্টের মান উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে নিরাপদ ওষুধ সেবা পৌঁছে দেওয়া। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটিতে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাংলাদেশের ব্যক্তিমালিকানায় যেসব খুচরা ফার্মেসি পরিচালিত হচ্ছে সেগুলোকে দুইটি স্তরে ভাগ করা হবে—প্রথম স্তর মডেল ফার্মেসি, দ্বিতীয় স্তর মডেল মেডিসিন শপ। মডেল ফার্মেসি আর মডেল মেডিসিন শপের পরিচালনার নিয়মকানুন নিয়ে একটি আদর্শমান তৈরি করা হয় যা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটিতে অনুমোদিত হয়।

মডেল ফার্মেসি হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো মডেল ফার্মেসিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকবেন যার দায়িত্বে থাকবে পুরো ফার্মেসিটি। ফার্মেসির আয়তন হবে ন্যূনতম ৩০০ বর্গফুট এবং থাকবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ওষুধ বিক্রয়ের সঙ্গে রোগীকে ওষুধ সেবনের পদ্ধতি বলে দেওয়া এবং নিয়মিত সঠিকভাবে ওষুধ গ্রহণ করার জন্য রোগীকে কাউন্সিলিং করা, সঠিক ওষুধ ডিসপেনিসং করা, বিক্রীত ওষুধ রেজিস্টার হালনাগাদ করা ইত্যাদি করবেন।

ওষুধের কাঁচামালের মজুদ তিন থেকে চার মাসের

মডেল মেডিসিন শপ মূলত বাংলাদেশের সর্বত্র সঠিক ওষুধ সেবা নিশ্চিত করার জন্য মডেল ফার্মেসি থেকে কিছুটা শিথিল শর্ত নিয়ে তৈরি। মডেল মেডিসিন শপের আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম ১২০ বর্গফুট। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এর অপ্রতুলতার কারণে গ্রেড বি (ডিপ্লোমা) ফার্মাসিস্ট বা ন্যূনতম গ্রেড সি ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের কিছু স্বল্প মূল্যের প্রস্তুতি রাখতে হবে যেমন: ফ্যান এবং এক্সজাস্ট ফ্যান। ওষুধ বিক্রয়ের সঙ্গে রোগীকে ওষুধ সেবনের পদ্ধতি বলে দেওয়া এবং নিয়মিত সঠিকভাবে ওষুধ গ্রহণ করার জন্য কাউন্সিলিং করা মডেল মেডিসিন শপের ফার্মাসিস্টেরও অন্যতম দায়িত্ব।

বাংলাদেশ মডেল ফার্মেসি ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ২০১৮ সালে বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রকল্পটি পরিকল্পনা করে এবং ব্রিটিশ সরকার প্রকল্পের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আর্থিক অনুদান প্রদান করে। বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের ২২টি উপাংশের একটি হলো মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপ। প্রকল্পের আওতায় ফার্মাসিস্টদের সার্বিক জ্ঞান উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩২টি জেলায় ৬০০০ জন সি গ্রেড ফার্মাসিস্টদের কোভিড স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনলাইনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রশিক্ষণে ফার্মাসিস্টদের জানানো হয় মডেল ফার্মেসি এবং মডেল মেডিসিন শপের আদর্শমান, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ওষুধ আইন, সঠিকভাবে ওষুধ সংরক্ষণ, বিতরণ এবং বিপণনের নিয়মকানুন। নকল, ভেজাল, আনরেজিস্টার্ড ওষুধ চিহ্নিতকরণের উপায়, কী করে এর অপব্যবহার রোধ করা যায় এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে রিপোর্ট করা যায় এ বিষয়েও তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আরো বলা হয় রোগীর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনের উপায়সমূহ, কার্যকর যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা, কাউন্সিলিং কী করে করতে হয়, কাউন্সিলিং এর সময় গোপনীয়তা বজায় রাখা, নথিপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং উপায় ইত্যাদি। এছাড়াও মডেল ফার্মেসি এবং মডেল মেডিসিন শপে রূপান্তরিত হতে কারিগরি সহায়তা, তথ্যসেবা প্রদান করা হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে প্রতিটি ওষুধের দোকানকে একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মডেল মেডিসিন শপের আদর্শমান অনুসারে উন্নীত করার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের পরিদর্শনের মাধ্যমে সেসব ওষুধের দোকানকে মূল্যায়ন করে তাদের মডেল ফার্মেসিতে উন্নীত করার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের কাছে উপস্থাপন করা হয় এবং মডেল মেডিসিন শপ হিসেবে সনদ বিতরণ করা হয়। ইতিমধ্যে ২১৯৩টি দোকানকে মডেল মেডিসিন শপ হিসেবে অনুমোদনের জন্য মনোনয়ন করা হয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

সুষ্ঠুভাবে ফার্মেসি পরিচালনার এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অপব্যবহার দূরীকরণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রকল্প একটি ফার্মেসি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরি করেছে। ঔষধ প্রশাসনে অনলাইন লাইসেন্সই এবং লাইসেন্স নবায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে অনলাইন সফটওয়্যার।

এছাড়া জনসাধারণের মধ্যে মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপ-এর প্রয়োজনীয়তা এবং সেবাসমূহ জনপ্রিয় করে তুলতে বেটার হেল্থ ইন বাংলাদেশ প্রকল্প ৩২টি জেলায় আয়োজন করছে জনসভা, র‍্যালি, রোড শো, বাউল গান, টিভিতে প্রচার করেছে ওষুধ বিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য টিভি স্ক্রল। টেলিভিশনে প্রচারের জন্য তৈরি করেছে একটি বিজ্ঞাপন যা জাতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হচ্ছে।

How to build a promising career in Pharmacy - Education Today News

পরিশেষে বলতে চাই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রাণ হলো ফার্মাসিস্ট ভাইবোনেরা। একজন ফার্মাসিস্টের কর্মক্ষেত্র শুধু ওষুধ তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানে নয় বরং ওষুধ নিয়ে গবেষণামূলক কাজ, ঔষধ প্রশাসনের মাধ্যমে কাজ করে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ, পাবলিক হেলথ সেক্টরে কাজ এমনকি মডেল ফার্মেসি বা মডেল মেডিসিন শপের উদ্যোক্তাও হতে পারে। ফার্মাসিস্ট ভাই বোনদের পরিশ্রম এবং কর্ম-সততার ওপর নির্ভর করছে দেশের সিংহভাগ রোগীর আরোগ্য। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, অনুদান সংস্থা সকলেই প্রস্তুত উন্নত ওষুধ সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু এই কর্মযজ্ঞ তখনই সফল হবে যখন ফার্মাসিস্টগণ এগিয়ে আসবে উন্নত ওষুধ সেবা আন্দোলনের কাণ্ডারি হিসেবে—দেশ এবং জনগণের কাছে নিরাপদ ওষুধ সেবা পৌঁছে দেবে, সফল করবে এই মহান আন্দোলন, এটাই কাম্য।

লেখক: ফার্মাসিস্ট এবং কারিগরি উপদেষ্টা, বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রকল্প, ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x