শেষ বেলায়ও সেই বাঙালিই থাকতে চাই

শেষ বেলায়ও সেই বাঙালিই থাকতে চাই
ছবি: প্রতীকী

ক্ষমা করা আর ক্ষমা চাওয়া—দুটোই হচ্ছে জীবনের অন্যতম শিক্ষা। বাঙালি কখনো এ শিক্ষা ভুলে যায়নি। পদে পদে তার প্রমাণ রেখেছে বাঙালি। শত দুর্ভোগেও বাঙালি তার রসবোধ হারায় না—এটা বাঙালির আর এক সত্যের সন্ধান। এসব নিয়েই মূলত বাঙালিয়ানা। বাঙালির দুর্যোগ আছে, থইথই বৃষ্টির জল আছে। তার পরও তার রসবোধের কমতি নেই। জমা জলে বাটি দিয়ে মাছ ধরার আনন্দও তাকে তার রসবোধই উপহার দেয়। যে জাতির রসবোধ নেই, সে জাতির কিছুই নেই—কিন্তু বাঙালির আছে। বাঙালির রসবোধটুকু আছে। আর আছে বলেই নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির মধ্যেও বাঙালি ঘরে আটকে থাকে না। ভেসে যাওয়া শহরের রাস্তায় বাঙালি নির্দ্বিধায় বানের জলে ভেসে আসা মাছ ধরতে নেমে পড়ে।

দেখুক না পাড়া-পড়শি, দেখুক ভার্চুয়াল দুনিয়া, ফেসবুক লাইভ—কে দমে তাতে! হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে, পলিথিনে মোড়া মোবাইল ফোন গলায় ঝুলিয়ে, হাঁটুজল ঠেলে বাঙালির অফিসযাত্রার ভাইরাল ভিডিও দেখুক নেট দুনিয়া! তাতে বাঙালির দমে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেখুক না সবাই—মাথার ওপর ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে হেসে হেসে অফিসের পথে। দুর্যোগ-দুর্ভোগেও বাঙালি ভ্যান কিংবা রিকশায় চড়ে পেটের দায়ে রুজির খুঁজে বেরিয়ে যেতে কেমন যেন আনন্দ খুঁজে পায়। উপচে পড়ছে খালের জল, পুকুরের জল; রাস্তায় লাফাচ্ছে পুঁটি, ট্যাংরা, বাটা, কই আর পোনা; বাবা হাফপ্যান্ট পরে মাছ ধরছে, মেয়ে সেই ছবি তুলছে আর ঝটপট আপলোড করে দিচ্ছে ফেসবুকে।

হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, ইউটিউব—কিছুই বাদ নেই। রিয়েল লাইফের টাইম লাইভ, ছবি শেয়ার—যাকে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় একেবারে তোলপাড় আর কি! এত কষ্ট, এত নেই নেই, তবু বাঙালি আছে আপন ছন্দেই। গোটা দেশ কিংবা গোটা শহর জলে থইথই। কিন্তু আমোদে-বাঙালির তাতে কিছুই যায়-আসে না। স্ত্রী কিংবা মা হাত ধরে বলছে—যেতে নাহি দেব এ বিপাকে। আর স্বামী বা ছেলে হাত ছাড়তে ছাড়তে বলছে—হবেই যেতে, কাজে যেতেই হবে। রাস্তায় নামতেই বাইক নুয়ে পড়ছে, পঞ্চাশ টাকা দক্ষিণার আনন্দে চার চাকা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বেকার শিশু। ঘরে খাবার নেই, পানীয় জল নেই, আলো নেই— বাঙালিকে আটকায় কে? অন্ধকারে মোবাইল ফোনের টর্চ তো আছে! নিচু এলাকায় থাকা, খালপাড়ে থাকা এবং বস্তি-কলোনি এলাকার ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষদের কথাই বলছি। কষ্টের শেষ নেই তাদের—কিন্তু পরক্ষণেই হাসিমুখে গামলা বা বাটি হাতে জল ছেঁচতে নেমে পড়ে গোটা পরিবার। সেখানেই তারা খুঁজে পায় বেঁচে থাকার আনন্দ।

শুধু কি আমাদের দেশেই? পৃথিবীর কোন শহরে জল না জমে? জল জমে অমন পরিপাটি দেশ জার্মানিতে। জল জমে ইতালির মতো চকচকে দেশেও। ঘণ্টাখানেকের ঝমঝম বৃষ্টিতে ভেসে যায় কানাডা, আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের রেলপথ। ট্রেন বাতিল হয় তাদেরও। সুড়ঙ্গে গাড়ি ডুবে নাকাল হতে হয় তাদেরও। ভেনিসের ৭০ ভাগ এলাকাই তো থাকে জলের নিচে! কিন্তু কোথাও কি মাছ ধরার এমন মনোমুগ্ধকর ছবি-ভিডিও ভাইরাল হতে দেখবেন? মোটেই নয়। এ দৃশ্য একেবারেই বাঙালির এক্সক্লুসিভ, একেবারেই নিজের। এ দৃশ্য শুধু দেখতে পারে ঢাকা, রাজশাহী, চিটাগাং, যশোর বা কলকাতা। রাতে মুখে ভাত উঠবে, কি উঠবে না—তা অনিশ্চিত জেনেও ছেলেমেয়ের সঙ্গে বুড়ো বাপ মিরপুরের নিচু অঞ্চলে কাগজের নৌকা ভাসায় মহা আনন্দে। কোথায় পাবেন এমন দুর্লভ ছবি! এ ছবি তো শুধু একান্ত বাঙালির।

‘বাঙালি’ মানে যাদের হাজার বছরেরও বেশি হিলারিয়াস হিস্ট্রি অর্থাত্ হাসিখুশির ইতিহাস। তাদের অনেকেই মনে করেন, তারা বাঙালি হলেও মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এই মানুষের কর্মযোগে বাঙালি যে একেবারেই জ্ঞানযোগে উন্নীত হতে পারেনি এমনও নয়। অনেকটাই পেরেছে। কিন্তু পুরোটা হয়তো পারেনি। তাই তার ইতিহাসের এই ব্যঙ্গোক্তি। বাঙালি হয়তো তেমন করে কখনো ভাবেনি শুদ্ধ জাতীয়তা, বিশ্ব নাগরিকতা। কিন্তু তার পরও বাঙালির সম্মিলিত ধর্মবোধ এবং অন্যমত সহিষ্ণুতা শুধু এ মহাদেশকে নয়, বিশ্বের আগামীকে এবং আগামীর সব সুন্দরকে ভাবিয়ে তুলবে, উদ্বুদ্ধ করবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নিরন্তন নির্মাণকে—এ বিশ্বাস বাঙালির আছে। বাঙালির কবিতা, চিত্রকর্ম, সাহিত্য এবং সীমা ভাঙার রাজনীতি যেভাবে অতীতের অসংখ্য ভাঙন আর নিষ্ঠুর পরিহাসকে অতিক্রম করে, অতীতের গৌরব আর ঐতিহ্যকে বুকে জড়িয়ে বাঙালিয়ানা রসবোধের একটি চেনা চেহারা দাঁড় করিয়েছে—তাতেই বাঙালির স্বস্তি আছে, প্রত্যাশার ঝলমলে রোদ আছে, হূদয়ের উষ্ণতা আছে। তাই তো বাঙালি তার শত শত বছরের সংশয় কাটিয়ে বাঙালি হয়ে উঠতে পেরেছিল। স্পষ্ট ভাষায় একসময় নির্ণীত হয়ে গেল বাঙালির সামাজিক, রাজনীতিক আর সাংস্কৃতিক সংজ্ঞা; বাঙালির রসবোধের বিরল গাথা। সেই বাঙালিয়ানার পথ মাড়িয়ে সীমাবদ্ধতা, সাম্প্রদায়িক ক্ষুদ্রতা আর আঞ্চলিক মূঢ়তা পেরিয়ে বাঙালি হয়ে উঠল এক অখণ্ড জাতি।

বাংলা ভাষার শরীর থেকে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি যে রক্ত বেরোল, সেখানেও দেখা গেল বাঙালির অখণ্ড চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ’৫২-এর একুশ হয়ে গেল বাঙালির সূচনাগৃহ, আর একাত্তরের ২৫ মার্চ হয়ে উঠল বাঙালির বাস্তববোধের মরণপণ বিস্তার। একদিকে বাঙালির এমন বদনামও আবার উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, বাঙালি রুগ্ণ, ভাগ্যহত, আত্মবিস্মৃত, আত্মঘাতী আর বিভাজিত। কিন্তু তার পরও বাঙালির রসবোধের মিলন ঘটেছে এবং বাঙালিকে একটি চেনা সুতায় বেঁধে ফেলতে পেরেছে। তাই বাঙালি এত কিছুর পরও ভড়কে যায়নি, লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। বরং বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার মাটি তাদের ক্রমাগত দেশপ্রেমের মিনার গড়তে সাহায্য করেছে; অগ্রগতির সোপান সৃষ্টিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। তাই তো বাংলার মাটি, বাংলার বায়ু, বাংলার মানুষ, বাঙালির ধারাবাহিক ভাবনা, স্বাতন্ত্র্যের নির্মাণ, রসবোধ, শুভবোধ আর মনন তাকে যুগ যুগ ধরে বলতে শিখিয়েছে—উদার হও, আকাশের দিকে তাকাও এবং সবার সংস্কৃতিকে বরণ করে নাও।

বাঙালির নাগরিক অভ্যাস, লোকায়ত বিষয়ের চেতনা, রসবোধ, নিজেকে চেনা-জানার সুযোগ দিয়ে নির্দেশ দিয়েছে কায়মনে বাঙালি হওয়ার। আর সেই বাঙালিয়ানাই তাকে বিশ্বমানব হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। কেননা, বাঙালির স্বদেশিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতা বোধ বা ধারণার কোনো বিরোধ নেই। বাঙালির অন্তর ও বাহির শিল্পিত হয়েছে তার কবিতায়, ছবিতে, গানে, রসবোধে। প্রকৃতির আহ্বানে সমৃদ্ধ আর অনুপ্রাণিত বলেই বাঙালি সীমাকে প্রশ্রয় না দিয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছে। আইডেন্টিটি পলিটিকসের নামে বাংলায় অর্থাত্ বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে গোটা সমাজটাকে হিন্দু আর মুসলিম আড়াআড়ি দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার এ সন্ধিক্ষণে ধর্মান্ধ শিবিরের যাবতীয় চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিতে পারে শুধু বাঙালিয়ানার শক্তিই। মেরূকরণের রাজনীতি দুই বাংলায়ই ধর্মীয় বিভাজন, সামাজিক বিভাজন, সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, এপার বাংলা-ওপার বাংলার বিভাজনসহ বাঙালি চেতনার বিরুদ্ধে যত রকমের বিভাজন হতে পারে, সব বিভাজনকে হাতিয়ার করে ধর্মান্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কৌশল নির্ধারণ করে রেখেছে।

ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালিয়ানা তার জবাব দিয়ে দিয়েছে সেখানকার ভোটযুদ্ধে। বাংলাদেশেও বাঙালিয়ানার জয় ঠেকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই—যতক্ষণ মনেপ্রাণে বাঙালি বাঙালিই থাকবে; যতদিন বাঙালির মনে তার রসবোধ জাগ্রত থাকবে; যতদিন বাঙালি ক্ষমা চাইতে পারবে, ক্ষমা করতে পারবে। ক্ষণিকের মতিভ্রম কিংবা বিজাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির পাশ কাটিয়ে বাঙালির এ বিশেষ গুণই তাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে তার নিজস্ব ঢঙের বাঙালিয়ানার কাছে। তার নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ভাষা তাকে ডাকছে সব সময়ই। কদিন সে উপেক্ষা করবে সেই ডাক? পেশা, নেশা, ইতিহাস, জীবন ইত্যাদিকে যে বহন করে চলছে তার ভাষা! মাতৃভাষার প্রতি তার ভালোবাসাই শেষ জবাব দিতে পারে অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্রের।

তাই তো আমি সারা জীবন ভরে শুধু বাঙালিয়ানারই জয়গান করতে চাই। বিলাসবহুল গুলশানের অমন যে বিশাল আবাসন, শখ করে যার নাম ‘সুখবৃষ্টি’ রাখতে চেয়েও শেষ মুহূর্তে বদলে অন্য কোনো নাম হয়েছিল; প্রবল বর্ষাধারায় আজ তার ডাকনাম হয়তো ‘দুখবৃষ্টি’ হয়ে যেতে পারে। সেখানেও সাপে কাটার আতঙ্ক আছে, পানীয় জলের সঙ্গে মিশে আছে নোংরা জল। পাশেই বস্তির শতচ্ছিন্ন অস্তিত্ব—যেন মিলেমিশে যায় বৃষ্টির তোরের আঘাতে। সেই বাঙালিকেই আমি জানাই শত প্রণাম। তার হয়তো বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ভয় আছে, বাড়ি ভেঙে পড়ার আতঙ্ক আছে, অভুক্ত থাকার কষ্ট আছে—কিন্তু তার মধ্যেও আমি সেখানে গোপাল ভাঁড়ের মতো রসিক বাঙালিই খুঁজি। খুঁজি হুজুগে বাঙালি, খুঁজি রসে টইটম্বুর বাঙালি। আমি শেষ বেলায়ও সেই বাঙালিই থাকতে চাই।

  • লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x