চাহিদার তালিকায় মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থান কোথায় 

চাহিদার তালিকায় মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থান কোথায় 
গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

স্বাস্থ্যই সম্পদ। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। কিন্তু কোন স্বাস্থ্য? শুধু শারীরিক না কি শারীরিক-মানসিক উভয়ই? আপাত দৃষ্টিতে যে মানুষটি মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন, তিনিও ঠিক উত্তর দিতে অস্বস্তিবোধ করবেন। কারণ, আমাদের চাহিদার তালিকায় মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থান প্রকাশ্যভাবে নেই বললেই চলে। নিম্নবর্গ এই শব্দটি চেনে না, মধ্যবিত্ত শব্দটিকে এড়িয়ে চলে। আর উচ্চবিত্ত শব্দটিকে প্রশ্রয় দেয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসিক সুস্থতা হলো ব্যক্তির মনের এমন একটি ভালো অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি তার নিজস্ব দক্ষতা উপলব্ধি করে, জীবনের স্বাভাবিক চাপকে মোকাবিলা করতে পারে, উৎপাদনশীল ও ফলদায়কভাবে কাজ করতে পারে। নিঃসন্দেহে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা শারীরিক সুস্থতার সমান গুরুত্বের দাবিদার। কখনো কখনো বেশি। কারণ মনের বলেই নাকি সব রোগ-বালাই দূর করা যায়। সব নেতিবাচক পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বিজয়ী হওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে আমরা মানসিক সুস্বাস্থ্যের দিকে কজন, কীভাবে নজর দেই, তার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাই।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে দশম। বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, আত্মহত্যাকারীদের বেশিরভাগেরই বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, যে বয়স দক্ষ মানব সম্পদ হওয়ার বয়স। তবু মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের জন্য যেন বিলাসবহুল কোনো দামি বিষয়, যার প্রয়োজনীয়তা শূন্যের কোঠায়।

আত্মঘাতী জাতি হিসেবে আমাদের সুনাম তো বহু পুরনো, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু এই অসচেতনতা ক্রমবর্ধমান হারে আমাদের যে হুমকির মুখে ঢেলে দিচ্ছে, সেটা কতদূর প্রসারী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের মাঝে বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষই জানেনই না যে, শারীরিক সুস্থতার জন্য যেমন কতিপয় নিয়ম ও বিধি-নিষেধের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তেমনি মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্যও কিছু বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়। এর মাঝে প্রথম বিষয়টি হলো মানসিকভাবে ভালো থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা। কিন্তু আমাদের কাছে ভালো থাকা মানে অর্থ কষ্ট না হওয়া, যে অর্থ দিয়ে সুখ নিশ্চিত করা গেলেও শান্তি নিশ্চিত করা যায় না অনেক ক্ষেত্রেই।

মোটের ওপর জীবনে অর্থনৈতিক ও মানসিক অবস্থার যে একটা সমন্বিত অবস্থান প্রয়োজন, সেটা যেন আমরা জানিই না। আমরা সবাই অর্থনৈতিক অবস্থানটা ঠিক করার পর যদি হাতে সময় থাকে তবে ছুটি সামাজিক অবস্থানের পেছনে। আর এই দৌড় প্রতিযোগিতায় পা পিছলে যদি জীবন হানিও হয়, তবু আমাদের ক্ষতি নেই। বড় জোর কিছুদিনের হা-হুতাশ আর উচ্চস্বরের বিলাপ। তারপর আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর পথে পা বাড়ানো। যার ফল হলো প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারণে কারও না কারও আত্মহত্যা করা।

আমাদের ধারণা, বেঁচে থাকার জন্য কেবল শারীরিক সুস্বাস্থ্যই প্রয়োজন। তাই শারীরিকভাবে বাঁচাকে নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের জন্যও প্রস্তুত থাকি। শরীর বাঁচানোর প্রচেষ্টায় আত্মা মরে গিয়ে পচা গন্ধ এলেও সে দুর্গন্ধ আমরা টের পাই না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই আত্মিক মৃত্যু আমাদের তথাকথিত জীবন যাপনে প্রত্যক্ষভাবে কোনো না কোনো প্রভাব ফেলে। নিরাশার কথা এই যে, আমরা আমাদের সেই যাপিত জীবনের নানাবিধ মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যাগুলোর আধার যে মানসিক অসুস্থতা, তা স্বীকার পর্যন্ত করি না। উল্টো তার বিপরীতে ব্যক্তির মধ্যেকার বিবিধ নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি আছে ধারণা করতে থাকি। তাই সমস্যার মূল কারণ না ধরা পড়ায় সমাধানও অধরাই থেকে যায়।

২০১৮ সালে ডব্লিওএইচও (হু)-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ১ দশমিক ২৩ শতাংশই আত্মহত্যাজনিত কারণে হয়ে থাকে। আমরা তবু একজনের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে পড়াশোনা, এর পরের পর্যায়ে চাকরি, এরপর সমাজে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তি, যশ- খ্যাতি-ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যক্তিকে পরোক্ষ চাপের মুখে রাখি। তথাকথিত সফলতা অর্জনের ভিত্তিতে ব্যক্তির মূল্যায়ন হয়ে থাকে। এই সামাজিক ও পারিবারিক নিপীড়ন ব্যক্তিকে ক্রমশ অনুভূতিহীন ও আদর্শ বিবর্জিত করে তোলে, যা একদিকে তার নিজের জন্য ক্ষতিকর; অন্যদিকে তার সঙ্গে যুক্ত অনেকের জন্য হুমকি স্বরূপ। এ থেকেই সূত্রপাত ঘটে নানা ধরনের মানসিক অপরিপূর্ণতার, যা সমাজে ও পরিবারে ভয়ঙ্কর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবু আমরা এই বাঁধা-ধরা জীবন ব্যবস্থার বাইরে যাই না।

প্রমথ চৌধুরীর মনে করেছেন, হাসপাতালের চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন লাইব্রেরি। এ বিষয়ে টলস্টয়ের ভাবনাও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি যত বেশি বই পড়বে, তত বেশি জগৎ তৈরি হবে তার, যেখানে ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টকে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যক্তি তত বেশি মুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু যেহেতু ভাববাদে আমাদের অরুচি আর বস্তুবাদে উদরপূর্তি, সেহেতু স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক সুস্থতাই আমরা বুঝি। মানসিক অসুস্থতা তো ধনী সম্প্রদায়ের বিলাসিতা, ওখানে সাধারণের কোনো সংযোগ নেই বলেই আমরা জানি। অথচ মানসিক অতৃপ্তি থেকে সৃষ্ট অপরাধ প্রবণতা, বিবাহ বিচ্ছেদ, হত্যা, পারিবারিক অসহিষ্ণুতা ইত্যাদির সঙ্গে আমাদের সংযোগ আছে ঠিকই।

যখন আমরা এসবের ভুক্তভোগী হই, তখন অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষের দূর থেকে বা কাছ থেকে অক্ষর না চেনাকে যেমন তার চোখের অন্ধত্ব বলে মনে হয়, তেমনি মানসিক সুস্বাস্থ্যের গুরুত্ব না বোঝা মানুষকেও অবোধ বলে হয়। কিন্তু তাদের সমস্যা আসলে অন্য। মূলত যিনি অক্ষরই চেনেন না, তিনি নিরক্ষর আর যিনি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন না তিনি অপরিণামদর্শী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্নের পরে হাওয়া খাওয়ার অপ্রয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বুঝবেন না, আর এটাও তার বোধগম্য হবে না যে, তিনি মরার আগে কেন মরে যাচ্ছেন।

বলা প্রয়োজন, আমাদের দেশে বয়স ৪৫ পেরুনোর পর পরই আমরা বুড়ো হয়ে যাই। পোশাকের রঙের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হতে থাকে আমাদের কর্মক্ষমতা ও জীবনীশক্তি দুটোই। সময়ের আগে আমরা অন্যের গলগ্রহ অসহায় এক প্রাণীতে পরিণত হই, যা পরিবার ও সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের পক্ষেও অস্বস্তিকর। এর অন্যতম কারণ আমাদের মানসিক দুর্বলতা, মনোজাগতিক হীনম্মণ্যতা; সর্বপরি মানসিক সুস্বাস্থ্যের অভাব। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় ঠিকই পঞ্চাশোর্ধ মানুষ দাপটের সঙ্গে জীবন ও কর্ম দক্ষতা উপভোগ করে। কারণ তারা মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ, যেকোনো নেতিবাচক পরিস্থিতির চেয়ে জীবন অনেক বড়; এই বোধ তাদের আছে।

বিবিসি নিউজে প্রকাশিত ল্যানসেটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি, কারণ তাদের অবস্থান সমাজে প্রায় গুরুত্বহীন। কোনো নেতিবাচক ঘটনা যেমন ধর্ষণ কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদ অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপ্রীতিকর ছবি বা ভিডিও প্রকাশ, পারিবারিক কলহ, যৌতুক প্রথার প্রভাব, পারিবারিক গুরুত্বের অভাব, মত প্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, অর্থনীতিক পরনির্ভরশীলতা ইত্যাদি নারীদের মানসিক অসুস্থতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ। আর এর ফলই হলো আত্মহনন।

আমাদের সমাজে নারী মন থেকে স্বস্তি পাচ্ছে কি না, তা কোনো প্রকার গুরুত্বই রাখে না। মানিয়ে দেওয়াই হচ্ছে নারীর প্রধান কাজ যা সম্ভাবনার সব দ্বার একে একে রুদ্ধ করে দেয়। পরিবার সমাজকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কন্যা, জায়া জননী, সহদরাকে পরোক্ষভাবে এমন মানসিক অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে, যেখান থেকে উঠে আসার সাহস ও শক্তি পায় না অসংখ্য নারী। মানসিক সুরক্ষা না দিতে পেরে পরিবার, সমাজই পরোক্ষভাবে হত্যা করে চলেছে অনেক সম্ভাবনাকে। আমরা প্রতিনিয়ত কথায়, কাজে ও আচরণে প্রমাণ করি, যেকোনো কিছুর মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি। এমনটা যে শুধু নারীর ক্ষেত্রে হয় তা নয়, অপেক্ষাকৃত ভিন্ন কারণে পুরুষও হচ্ছে ভুক্তভোগী। পুত্র সন্তানকে কেন্দ্র করে পিতা-মাতার পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা, চাপিয়ে দেওয়া লক্ষ্য, বেকারত্ব, প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তিগত অসন্তুষ্টি, বৈষম্যমূলক বাজারব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদা, পরকীয়া ইত্যাদি পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়।

এছাড়া প্রথাগত ভাবেই পুরুষকে অর্থ উপার্জনের যন্ত্র জ্ঞান করা তো আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবহমান। যেকোনো মূল্যে তাকে অর্থের জোগান দিতেই হবে। আমরা পুরুষকে জানান দেই যে, জীবনের চেয়ে প্রতিষ্ঠা বড়। মোটের ওপর আমাদের অধিকাংশ আচরণ ও প্রত্যাশাই ব্যক্তির মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার বিপক্ষে কাজ করে।

এমন অবস্থায় করণীয়টা যার যার বোধ সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে ভাবাটা সবারই প্রয়োজন। কারণ সময় গেলে সাধন যেমন হয় না, তেমন সামনের মানুষটির মনের আবেগি স্রোতধারাও সব মৌসুমে স্থির হয়ে বয়ও না।

লেখক: শিক্ষক, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x