আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে

আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে
লকডাউন।

দেশে ‘নো লকডাউন’ চলছে! বেসরকারি হিসাবে লাখ লাখ লোক যখন দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তখনই সরকারের কৌশলগত অবস্থানের কারণে হাজার হাজার লোক নেমে পড়েছেন রাস্তায়, ফেরিতে হাটবাজারে এবং ঈদের বাড়ি যাত্রায়।

আক্রান্তের যে সংখ্যার কথা বললাম সরকারি খাতায় সে হিসাব পাওয়া যাবে না। তবে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মোশতাক হোসেন একটি সংবাদপত্রে সাক্ষাত্কার দিয়ে এ কথা বলেছেন। তার মতে, দেশে এ মুহূর্তে প্রায় ৩ লাখ থেকে ৭ লাখ লোক করোনায় আক্রান্ত।

এই যখন পরিস্থিতি তখন আমরা সবকিছু অবাধ করে দিয়েছি। এটা ঠিক, দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন দেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর কোনো দেশেরই নেই। কিন্তু লকডাউনের একটা যৌক্তিক ও আদর্শিক সময় আছে। সংক্রমণের বৃদ্ধির হার কেমন তার ওপর ভিত্তি করে সরকার ও বিশেষজ্ঞরা মিলে নির্ধারণ করেন তাদের দেশে কতদিন লকডাউন চলবে।

লকডাউন বিষয়ে একদল মার্কিন গবেষকের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হচ্ছে, কোনো দেশ যদি তিন সপ্তাহ কঠোর লকডাউন মান্য করে, তাহলে এই মহামারি কিছুটা সংযত করা সম্ভব। আর এক মাস লকডাউন চালিয়ে গেলে এই মহামারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আর ৪৫ দিন পূর্ণ লকডাউন করা হলে করোনা ভাইরাস থেকে প্রায় মুক্ত হওয়া যায়।

তবে করোনা ভাইরাস বিস্তারের যে ধরন তাতে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দুই মাসের পূর্ণ লকডাউনই একমাত্র কার্যকর উপায়।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত ভাইরোলজিস্ট ইয়ান লিপকিন বলেন, ‘একমাত্র পূর্ণ লকডাউনই করোনা থেকে বেরোনোর রাস্তা। কিন্তু বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে কোনো লকডাউন হয়নি। সময়মতো উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা এবং জনগণের একটি অংশের অসহযোগিতার কারণে একটি আদর্শিক লকডাউন করা যায়নি। যে দেশের মানুষের ঘরে খাবার থাকে না তাকে লকডাউনে বাধ্য করা যায় না। তাছাড়া শুরু থেকেই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের মধ্যে অস্থিরতা লক্ষ করা গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, এই লকডাউন কতদিন চলবে? জবাবে মরিসন বলেন, যখন সংক্রমণ থাকবে না অথবা যতদিন না ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে।

সাংবাদিকরা পালটা জিজ্ঞাসা করেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হতে হতে তো এ বছর চলে যেতে পারে। এতদিন মানুষকে ঘরে বসিয়ে কীভাবে বাঁচাবেন? মরিসন বলেন, সম্পদ বিক্রি করব। ঋণ করব। আমাদের নাতি-পুতিরা এসে সেই ঋণ শোধ করবে, তবু মানুষকে বাঁচাব।

অস্ট্রেলিয়া বা উন্নত দেশগুলোর মতো পদক্ষেপ, ব্যবস্থাপনা তো আর বাংলাদেশ করতে পারবে না। সেই সামর্থ্যও নেই। কিন্তু যেটুকু সামর্থ্য বাংলাদেশের ছিল সেটি কী করেছে? সংক্রমণের লাগাম টানার জন্য গণহারে টেস্ট করার প্রয়োজন ছিল। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সেই ট্রেন মিস করেছে বাংলাদেশ।

গত মার্চ মাসে টেস্ট করার অনুমতি চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরকারের কাছে লিখিত আবেদন দেয়। ফাইল ঝুলিয়ে রেখে আড়াই মাস পর গত ১৮ মে সরকার মাত্র সাতটি বেসরকারি হাসপাতালকে অনুমতি দিয়েছে। অথচ সক্ষমতা যাদের আছে সকলকেই তো অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। আমেরিকায় ফার্মেসি, ভিয়েতনাম রাস্তার মোড়ে টেস্ট করছে। আমাদের মতো জনবহুল জনসংখ্যার দেশে প্রয়োজন ছিল র্যাপিড টেস্ট।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা আমাদের দেশের উপযোগী একটি টেস্ট পদ্ধতি আবিষ্কার করলে তা আমলতান্ত্রিক জটিলতায় ফেলে রাখা হয়েছে। এছাড়া দেশে বেসরকারি পর্যায়ে ১৫টি পিসিআর ল্যাব আছে, যার দৈনিক ২০-২৫ হাজার টেস্ট করার সক্ষমতা ছিল। শুরু থেকে দৈনিক ২০-২৫ হাজার টেস্ট করতে পারলে সংক্রমণ এ পর্যায়ে যেতে পারত না।

বতর্মানে টেস্টের সংখ্যা দৈনিক ১০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। এর সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ের সক্ষমতাকে যুক্ত করা হলে দৈনিক ৩৫ হাজার টেস্ট করা যেত। ধীরে ধীরে এ সংখ্যাকে ৫০ হাজারে উন্নীত করা গেলে অল্প কদিনের মধ্যে দেশের প্রায় সব মানুষকে টেস্ট করা সম্ভব হতো।

এভাবে টেস্ট করা সম্ভব হলে এবং পজিটিভ ব্যক্তিকে আইসোলেশন নেওয়া গেলে সংক্রমণটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। তা না করে যেভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে তা বাংলাদেশ মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের জনগণকে হার্ড ইমিউনিটির দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে! সত্যিই যদি তা-ই হয়, তাহলে বাংলাদেশ আরো বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। প্রতিটি দেশই তার পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণার পর সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে করণীয় নির্ধারণ করে থাকে।

কোভিড-১৯ ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন আদৌ সম্ভব কি না সেই গবেষণা কি বাংলাদেশে করেছে? এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো তথ্য কারো জানা নেই! এ সংক্রান্ত যে জাতীয় ও কারিগরি কমিটি রয়েছে এ বিষয়ে তারাও কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। হার্ড ইমিউনিটি কী এবং এটি কাদেরকে সুরক্ষা দেয় এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন নলেজ প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে।

সেখানে বলা হয়েছে, যখন একটি এলাকার বেশির ভাগ মানুষকে কোনো একটি সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক দেওয়া হয় তখন ঐ এলাকায় ঐ রোগটির ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে না।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, প্রতিষেধক ছাড়া হার্ড ইমিউনিটি কাজ করবে না। কমিউনিটির বেশির ভাগ সদস্যকে প্রতিষেধক দেওয়া সম্ভব হলেই এটি কাজ করবে। আর তা না হলে উলটো রোগটি ছড়িয়ে পড়বে খুব তাড়াতাড়ি। প্রতিষেধক ছাড়াও হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের দ্বিতীয় আরেকটি পথ আছে কিন্তু তা হবে খুবই বিপজ্জনক।

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতিষেধক ছাড়া হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ ভাগ লোকের করোনায় আক্রান্ত হতে হবে। অর্থাত্ প্রতি ১০ জনে সাত-আট জন আক্রান্ত হতে হবে। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ লোক আক্রান্ত হলে রোগীর সংখ্যা হবে ১২ থেকে ১৪ কোটি!

বর্তমান যে মৃত্যুহার আছে সে অনুযায়ী মারা যাবে ১৫ থেকে ২০ লাখ লোক। এদের মধ্যে যদি ৪ শতাংশ মানুষকেও হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, তাহলে কি বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর সেই সক্ষমতা আছে? প্রতিষেধক ব্যতিরেকে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এত ব্যাপকভাবে রোগপ্রতিরোধক্ষমতা তৈরির চেষ্টা, অত্যন্ত ঝুঁকি এবং চড়া মাশুলের কারণ হতে পারে।

মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া নয় বাঁচানোই হলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সবকিছু খুলে দেবেন নাকি কারফিউ দিয়ে এক মাসের একটা কার্যকর লকডাউনে যাবেন? এরপর সুরক্ষা বলয় তৈরি করে আস্তে আস্তে শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করুন।

সত্যিকারের লকডাউন দিতে হলে পুলিশ, বিডিআর ও সশ্রস্ত্র বাহিনীতে আমাদের যে ৫ লাখ সদস্য রয়েছে তাদের সবাইকে ব্যবহার করে অন্তত ৬ কোটি লোককে ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। এই ৫ লাখ সদস্যকে ব্যবহার করলে দুই দিনেই ঘরে ঘরে খাদ্যপণ্য পৌঁছানো সম্ভব। তা না করে লকডাউন করলে অসংখ্য মানুষ কিন্তু অনাহারে মারা যাবে!

আমাদের পাশের দেশ ভারত লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তার রাজ্যেকে তিনটি জোনে ভাগ করেছেন। লাল, হলুদ ও সবুজ জোন। সবুজ জোন হলো সেই সব জেলা, যেখানে কেউই করোনায় আক্রান্ত হননি।

এসব জেলা থেকে লকডাউন ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হচ্ছে। কম সংক্রমিত জেলাকে হলুদ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঐসব জেলায় লকডাউন কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় লকডাউন অব্যাহত আছে। অথচ আমাদের সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত এলাকা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ খুলে দেওয়া হয়েছে সবার আগে।

বর্তমানে টেস্টের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। তার পরও প্রতিনদিন হেল্পলাইনে ফোন আসে প্রায় দেড় লাখ। আর হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে আগের রাতে এসে লাইন দিয়ে মানুষকে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে হাসপাতাল তো দূরে থাক, ফুটপাতেও মানুষ জায়গা পাবে না!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

ইত্তেফাক/জেডএইচ

ঘটনা পরিক্রমা : করোনা ভাইরাস

পরবর্তী
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত