বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭
৩৩ °সে

নাগরিকমত

শেখ সাহেব শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, তিনি বিশ্ব নেতা

শেখ সাহেব শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, তিনি বিশ্ব নেতা
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

আমার বাড়ি মাদারীপুর জেলা বাহাদুরপুর ইউনিয়ান হবিগঞ্জ হাটের সংলগ্ন। হবিগঞ্জ হাটের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আড়িয়াল খাঁ নদী। ৭০দশকে নৌপথই ছিলো আমাদের একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা। খুলনা টেকেরহাট হবিগঞ্জ হয়ে ঢাকা প্রতিদিন আড়িয়াল খাঁ নদী দিয়ে অনেক লঞ্চ যাতায়াত করত।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সকালবেলা এক অস্বাভাবিক ভাবে আমার ঘুম ভেঁঙ্গে যায়। বাড়িতে দেখলাম কেমন জানি এক শোকের ছায়া। তেমন কিছু বুজলাম না। কারণ আমি খুব ছোট। আমার বয়স তখন ৭/৮ বৎসর। দেখলাম লঞ্চ ঘাটে অনেক লোক জড়ো হয়ে বসে আছে। আমার বাবা-চাচা-দাদা গ্রামের অনেক মরুব্বি সেখানে উপস্হিত। আমি আস্তেআস্তে দাদুর কোলে গিয়ে বসলাম দেখলাম অনেকের চোখে পানি। সাদাপাকা দাড়িওলা দাদাদের চোখে পানি। দেখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। খুব মনোযোগ সহকারে বুজতে চেষ্টা করছিলাম কেন গ্রামের মানুষ একসাথে শোকে বাকরুদ্ধ। এক মুরব্বি কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'ওরা শেখ সাহেবকে মেরে ফেললো! ওরা কি করে পারলো শেখ মুজিবকে মারতে?'

সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে রেডিও শুনছে। কিন্ত কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাই সবাই অপেক্ষা করছে ঢাকা থেকে লঞ্চ আসলে সেখানে কি ঘটেছে তা জানবে। ঢাকা থেকে যথাসময় লঞ্চ আসলো। কিন্ত যাত্রীরা রেডিও সংবাদের বেশী তেমন কিছু বলতে পারলো না। কিন্ত বেলা বাড়ার সাথে সাথে সবাইকে বিশ্বাস করতে হল, কিছু সেনা সদস্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। হয়তো বঙ্গবন্ধুর কথা আমি আগেও শুনেছি। কিন্ত ১৫ আগস্টের ঘটনা ছাড়া কোন সৃতি আমার মনে পরে না। আমার দুর্ভোগ্য বঙ্গঁবন্ধুর হত্যার খবরের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয়।

এই স্মৃতি নিয়ে আমি বড় হতে লাগলাম। যা জানলাম, শুনলাম, বুঝলাম; বঙ্গঁবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতো না। বাংলাদেশের আরেক নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং বঙ্গঁবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি অর্জন করে ছিল স্বাধীনতা।

তিনি যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন সেই স্বাধীন বাংলাদেশেই তাকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যা করে আইন পাশ করা হয়- 'এই হত্যার বিচার করা যাবে না', 'বঙ্গবন্ধু বলা যাবে না', 'জাতির পিতা লেখা যাবে না' এবং '৭ মার্চের ভাষন শোনা যাবে না'। ইতিহাসের পাতা ছিঁড়ে ফেলা হলো, লেখা হলো নতুন ইতিহাস। দেখলাম রাষ্ট্র কিভাবে জাতির পিতাকে অস্বিকার করে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করতে লাগলো।

১৯৮৫ সালের ৭ অক্টোবর বিশেষ কারণে জীবনে প্রথমবার আকাশপথে এক অজানা উদ্দেশ্যে পশ্চিম জার্মান রওয়ানা হলাম। আপনজন ফেলে মনের মধ্য অনেক কষ্ট নিয়ে বিমানে উঠলাম। নিরব নিঃশব্দে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম নতুন স্বপ্ন নিয়ে। বার্লিন ইমিগ্রেশন পার হয়ে একটা টেক্সি নিয়ে গন্তব্য রওনা দিলাম। টেক্সি থেকে বার্লিন শহর দেখছিলাম। কি সুন্দর শহর, কত সুন্দর করে সাজানো। শহর দেখছিলাম আর ভাবছিলাম জীবনে প্রথম পর দেশে আসলাম। নতুন দেশ নতুন ভাষা। কি করে এই দেশে থাকবো? হঠ্যাৎ টেক্সি চালক কি জানি বলল আমি ইংরাজিতে বললাম, 'জার্মানিতে নতুন এসেছি, জার্মান ভাষা জানি না। তুমি কি ইংরেজি জান?' বলল, 'হ্যাঁ, আমাকে জিজ্ঞাসা করলো তুমি কোন দেশ থেকে এসেছো?' আমি বললাম, 'বাংলাদেশ'। ও জিজ্ঞাসা করলো, 'বাংলাদেশ কোথায় ইন্ডিয়া?' আমি বললাম, 'ইন্ডিয়া না, ইন্ডিয়ার পাশের একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ।' সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'তোমাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান?' বললাম, 'হ্যাঁ, আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।' আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, 'তুমি তাকে চেন?' সে জানালো, তাকে দেখি নাই, তার সম্বন্ধে জানি। তার মতে, শেখ মুজিবুর রহমান একজন মহান নেতা। এমন নেতা বারবার জন্মান না।

৮০ বা ৯০ দশকে জার্মানিতে বাংলাদেশ বললে অনেকই চিনতো না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে অনেক জার্মানরা চিনতো। একটা নেতার পরিচয়ে একটা দেশের পরিচয়। বিদেশে না আসলে হয়তো জানা হতো না, দেখাও হত না বঙ্গবন্ধুকে বিদেশিরা কত ভালবাসে।

২০২০ সালে আমরা পালন করছি জাতির জনক বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী। জার্মানির বিভিন্ন শহরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী ব্যপকভাবে পালন করার উদ্দ্যোগ নেওয়া হয়েছিল (করোনা ভাইরাসের কারনে আপাতত স্থগিত আছে)। বার্লিনে যে সমস্ত জার্মানরা ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে বন্যার কারনে বার্লিনে বসবাসরত প্রায় সকল বাংলাদেশিকে জার্মানিতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলো, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলো, ১/১১ চলাকালে জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির অন্দোলনে আমাদের সমর্থন করেছে, তাদের কয়েকজনকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির হিসেবে দেখা করে আমন্ত্রণ জানালাম। ১৯৮৬ সালে একজন জার্মান আইনজীবির সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তার মুখে 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' শুনে অবাক হয়েছিলাম। তার প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা অনেক গুন বেড়ে গিয়েছিল। ১/১১ সময়ে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রলায়ের সামনে একটা ডেমোনেসটেশন দিয়াছিলাম। পারমিশনের খুব অসুবিধা হচ্ছিল। এই আইনজীবির সহযোগিতায় পারমিশন পেয়েছিলাম এবং ডেমোনেসটেশন করেছিলাম। অনেক কষ্ট করে তার সাথে দেখা করলাম। ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশিদের সাহায্য করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানালাম এবং বললাম বার্লিনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সন্তান যারা এখানে জন্মগ্রহণ করেছে এই নতুন প্রজন্মের কাছে ও জার্মান বন্ধুদের কাছে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরার জন্য। তাকে বললাম, 'জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী বার্লিনে ব্যপকভাবে পালন করতে যাচ্ছি। আপনি উপস্হিত থেকে বঙ্গবন্ধুর উপর কিছু বললে আমরা আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।' তিনি খুব খুশি হলেন। বললেন, 'বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের নেতা না, শেখ মুজিবুর রহমান একজন বিশ্বনেতা। তাকে নিয়ে অনেক প্রচার হওয়া উচিত। বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা দরকার। আমি সুস্হ থাকলে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে উপস্হিত থাকবো।'

এমন এক সময়ে এসে আজ দাদুর কথা খুব মনে পড়ল। দাদু বেঁচে থাকলে দাদুকে বলতাম, 'শেখ সাহেব শুধু বাংলাদেশের নেতা নন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিশ্বনেতার নাম।'

মিজানুর হক খান

লেখক: সাবেক সভাপতি, বার্লিন আওয়ামী লীগ

ইত্তেফাক/আরএ

ঘটনা পরিক্রমা : মুজিববর্ষ,বঙ্গবন্ধু

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত