বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭
৩০ °সে

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ

নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতা তৈরি নয়, বর্তমানটাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায় চীন

কেনো চীন বিশ্বে ক্ষমতার পালাবদল চাইবে, যখন তারা বর্তমান 'ওয়ার্ল্ড অর্ডার' নিয়ন্ত্রণে সক্ষম!
নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতা তৈরি নয়, বর্তমানটাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায় চীন
কম্বোডিয়ায় চীনের পাঠানো মেডিসিন সহায়তা। নিউ ইয়র্ক টাইমস।

নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় চীনকে এখন রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। মহামারীতে তাদের ভূমিকা এবং হংকং-এর ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের জ্বলন্ত আগুন নেভাতে মরিয়া চীনের কর্মকর্তারা। এক্ষেত্রে তারা দুইভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; প্রথমত, করোনা মোকাবেলায় চীনের নিজস্ব তৈরি সফলতার গল্প প্রচার করে তাদের পূর্ববর্তী ভুলকে ঢাকা এবং দ্বিতীয়ত, তাদের আক্রমণ করা, যারা চীনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চায়।

এই যুদ্ধে নিজের অধীনস্থদের ব্যস্ত রেখেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিভ্রান্তের মত আচরণ করছে এবং বিশ্ব জুরে চলছে সংকট, সেই মুহূর্তে তার থেকেও বড় ক্যাম্পেইনে ব্যস্ত তিনি। আর তা হলো জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত সংগঠনগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যার মাধ্যমে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশ শান্তিপূর্ণ এবং নিষ্পাপ স্লোগান নিয়ে এগিয়েছে তারা, 'মানবতার জন্য সমন্বিত ভবিষ্যৎ নিয়ে সমাজ' (কমিউনিটি উইথ এ শেয়ার্ড ফিউচার ফর ম্যানকাইন্ড)। ২০১৩ সালে প্রথম বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করেন শি জিনপিং। তার দুই বছর পর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় আলোচনা পর্যালোচনা যেখানে সমন্বিত ভবিষ্যৎ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

চীন বরাবরই বলে আসছে 'গ্লোবাল অর্ডার'কে উৎখাত করার কোন ইচ্ছা তাদের নেই। তাদের এই কথাটি আমাদেরও শোনা উচিত। কেনো চীন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতাকে উৎখাত করতে চাইবে, যেখানে সেই ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে এবং কোন ক্ষতি না করে নিজেদের করায়ত্তে আনতে সক্ষম দেশটি।

গ্লোবালাইজেশনের সবচাইতে সুবিধাভোগী দেশ চীন। এটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা'র মত বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়েছে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের জন্য। এখনো অবশ্য বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ-এর মূল কর্তৃত্বের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি, কিন্তু জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ চারটি জরুরি অঙ্গ সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছে তারা, যেই সংগঠনগুলো বিশ্বের জন্য বিভিন্ন নিয়ম এবং মূল্যমান নির্ধারণ করে। (এর পাশাপাশি পঞ্চম সংস্থা হিসেবে চলতি বছর ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি'র মত একটি সংস্থারও প্রায় নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় দেশটি)।

আর এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, জাতিসংঘের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ সহায়তা প্রদানকারী দেশ চীন। বেশ ধীরস্থিরভাবে বিগত বছরগুলোতে তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

আর সে কারণেই নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরির চাইতে পরিচিত মাঠে যুদ্ধ করতেই বেশি পছন্দ করছে চীন। বিশ্বের জন্য তাদের বার্তা বেশ স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু তার বৈশ্বিক দায়িত্ব গ্রহণ থেকে অবসর নিচ্ছে, চীন প্রস্তুত রয়েছে সেই দায়িত্বভার গ্রহণে। মহামারীর কারণে বিপর্যস্ত এবং মন্দায় থাকা পৃথিবীর জন্য এটি নেশা ধরা এক প্রস্তাবনা। যেই এর লাগাম ধরবে সেই ভালো। খুব মানুষই 'গ্লোবাল অর্ডার' নিয়ে ভাববে এ সময়। চীনের নেতৃত্ব গ্রহণের উচ্চাভিলাষের বিষয়ে ভাববার চাইতে অধিকাংশ দেশের জন্য নিজেদের উন্নয়ন এবং স্থিতি নিয়ে চিন্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বর্তমানে।

আর এ বিষয়ে জুয়া খেলার ভালো কারণও রয়েছে। এই মহামারী হয়ত চীনের বেশ কিছু ভুলত্রুটি সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় ঘাটতিগুলোকেও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থ সামাজিক সমস্যা জর্জরিত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ এমন একটি ভাইরাস মোকাবেলায় একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের হাতে তৈরি সংস্থাগুলো ছিলো নিয়ন্ত্রণহীন। আর পৃথিবীর অন্য সকল দেশ নিজেদের রক্ষা করতেই ব্যস্ত।

এই মহামারীর শুরুতে সবচাইতে বড় আঘাত চীনের ওপর এসেছে, এটি সত্য। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব তাদের নৈতিক উচ্চাবস্থান হারিয়ে ফেলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং বিশৃঙ্খলরা মধ্যে থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার আগেই বিশ্বর বুকে নির্ভরশীলতার প্রতীক হয়ে উঠবে চীন। আর তারপর এই সুযোগকে ধীরস্থিরভাবে কাজে লাগাবে দেশটি।

এমন এক পরিস্থিতি প্রত্যয় পূর্ণ হয়ে থাকা বেশ কঠিন। বিশ্বে ভারসাম্য প্রয়োজন। আর বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোন দেশের পক্ষে এই ভারসাম্য তৈরি করা অসম্ভব। আর দেশটির নেতৃত্ব থেকে বিষয়টি অবশ্যপালনীয়। কিন্তু এটি আসলে তার থেকেও বেশি কিছু। মানবতার সমন্বিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে স্বাধীনতা ও সম্মান যে সর্বোত্তম পথ তা আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে আমেরিকার নেতৃত্বে থাকা মানুষগুলোকে। 'দ্য বেইজিং মডেল' দেখে অনেকের বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু চীনের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ব্যবস্থাপনা শুধু তাদের জন্য কার্যকর। আর গণতন্ত্র, এটি বৈশ্বিক একটি বিষয় যা যে কোন স্থানের সকলে অনুসরণ করতে পারে।

চীনের একটি প্রবাদ রয়েছে, 'বাতাস ও স্রোতের গতিবিধি বুঝে মাছ ধরার নৌকায় শক্ত করে বসতে হয়'। চীন প্রসঙ্গে এতটুকু বলা সম্ভব, তারা ঝড়ে রওনা দিতে প্রস্তুত। এবং পশ্চিমারা গণতন্ত্রের বৈশ্বিক শক্তির উপর বিশ্বাস আর পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। ভারত থেকে ইন্দোনেশিয়া বা ঘানা থেকে উরুগুয়ে, পৃথিবী যেমন আছে সেভাবেই নিয়ে নেবে চীন।

লেখক: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং চীনে নিযুক্ত ভারতের সাবেক অ্যাম্বাসেডর।

ইত্তেফাক/আরএ

ঘটনা পরিক্রমা : করোনা ভাইরাস

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত