বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭
২৯ °সে

নাগরিকমত

ঢাকা, পানি, ওয়াসা ও বৃষ্টি

ঢাকা, পানি, ওয়াসা ও বৃষ্টি
ঢাকায় মুষুলধারে বৃষ্টি (ফাইল ছবি)

বিশুদ্ধ পানির অভাব অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকার একটি অন্যতম সমস্যা। সেবার মান না বাড়িয়ে পানির দাম বছরে দুই বার বৃদ্ধিতে ঢাকা ওয়াসার উপরে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। বাড়িতে পানি নেই, লাইন দিয়ে সবাই মিলে পানি সংগ্রহ করা, পাইপে ছিদ্র, সরবরাহকৃত পানিতে নোংরা, জীবাণু ও দুর্গন্ধ – ঢাকা শহরের কোন না কোন এলাকার প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতে নিয়মিত ৪৫% নগরবাসী নিরাপদ পানি পায়। যদিও সকলের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

ঢাকা ওয়াসা নগরের দুই সিটি কর্পোরেশন এবং নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকা মিলিয়ে প্রায় ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কাজ করে। দৈনিক প্রায় ২৪০-২৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে যার মাঝে শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে আর বাকি ১৫-২০ ভাগ পানি শোধনাগারের মাধ্যমে।

শুরু থেকেই ঢাকার পানি চাহিদার মূল অংশ পূরণ করে আসছে ভূগর্ভস্থ পানি। ফলে ঢাকায় বাড়তি জনসংখ্যার জন্য বাড়তি পানির চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর বাড়তে থাকে মাটির নীচে থেকে পানি তোলার পরিমাণ। ১৯৯৫ সালে যেখানে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ৩০ মিটার নীচে থেকে পানি তোলা হত ২০০৭ আসতে আসতে সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় দ্বিগুনেরও বেশি প্রায় ৭০ মিটার। যা ২০১৬ সালে ৯০ মিটার পার করে ফেলেছে। বর্তমানে ডীপ একুইফায়ার থেকে পানি সংগ্রহ করা হয় যার গভীরতা প্রায় ১৮০ – ২৫০ মিটার যার অর্থ প্রায় ৬০ তলা বিল্ডিং এর উচ্চতার সমান গভীরতা থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

পানি শোধনাগারের মাধ্যমে পানি পরিষ্কার করে সরবরাহ বিভিন্ন কারণে (দূষণের মাত্রা, পানি সংগ্রহের বা সরবরাহের দুরত্ব) বেশ ব্যয়সাধ্য। মূলত শীতলক্ষ্যার পানি সংগ্রহের পর পরিষ্কার করে আবাসিক এলাকায় সরবরাহ করা হয়। শীতলক্ষ্যার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত দূষণের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটিই বেশ জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। সেই সাথে যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় তার অনেকটাই বেশ পুরনো হওয়ায় ছিদ্রসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়মিত লেগেই থাকে। ফলস্বরূপ পরিষ্কার পানি পুনরায় অপরিষ্কার আকারে মানুষের দোরগোড়ায় হাজির হয়। পদ্মা এবং মেঘনা থেকে পানি সংগ্রহ করে শোধনাগারের মাধ্যমে পরিষ্কার ও সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও গবেষকদের মাঝে এর কার্যকারিতা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

অথচ এ দুইটি ছাড়াও আমাদের কাছে আরো একটি প্রাকৃতিক উৎস আছে যা নিরাপদ এবং যার সরবরাহের পরিমাণও বেশ সমৃদ্ধ। বাৎসরিক সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে দশম। রাজধানী ঢাকা গড়ে প্রতি বছর ২,১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত দেখে। এ সময়ে রাস্তায় পানি জমে থাকা এক নিয়মিত দৃশ্য। অপরিকল্পিত নগরায়ণ হওয়ায় এ বিশাল বৃষ্টির পানি মাটির মাধ্যমে ভূগর্ভে না গিয়ে ড্রেইনেজের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে ভূগর্ভের পানি ভরাট হওয়ার প্রাকৃতিক উপায়ও ঢাকায় বন্ধ।

একটু সাংখ্যিকভাবে আমরা যদি দেখার চেষ্টা করি তাইলে এই বৃষ্টিপাত কিভাবে বিশাল তা আমরা বুঝতে পারব। যেহেতু ঢাকা ওয়াসা দৈনিক আমাদের প্রায় ২৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে তাহলে বছরে সরবরাহকৃত এ পানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯১,২৫০ কোটি লিটার। আর ঢাকা ওয়াসার কর্মক্ষেত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বছরে গড়ে ২,১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের ফলে যে পরিমাণ পানি পড়ে তার পরিমাণ প্রায় ৮০,০০০ কোটি লিটার অর্থ্যাৎ ঢাকা ওয়াসা কর্তৃক মোট সরবরাহকৃত পানির প্রায় ৮৭ শতাংশ। যদিও কার্যকরীভাবে এ ৮০,০০০ কোটি লিটারের পুরোটা সংগ্রহ ও ব্যবহার সম্ভব নয়, এখানে এ তুলনা করা হয়েছে যে উৎসকে আমরা আমাদের পরিকল্পনাতেই রাখছি না তার সরবরাহের বিশালতা বোঝাতে।

মূলত নগরীতে বৃষ্টি পড়ে চার রকমের জায়গায়- বিল্ডিঙের ছাদ, রাস্তা, মাটি এবং লেক, পুকুর বা যেকোন রকমের ওয়াটার বডি। এর মাঝে ছাদে যে পানি পড়ে (যে পানি মূলত জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী) তার একটি বিশেষ সুবিধা আছে। আমরা আমাদের ব্যবহার্য পানি ছাদের ট্যাংকে প্রথমে উঠিয়ে নেই এরপরে অভিকর্ষের টানে পানি নিজে থেকেই নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পড়ে। বৃষ্টির যে পানিটুকু ছাদে পড়ে তাতে তাই শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি থাকে। ছাদের পানিগুলো যদি আমরা প্রথমে বাড়ির নীচে রিজার্ভারে সংগ্রহ করি এবং তার পরে অবশিষ্টটুকু এলাকাভিত্তিক চ্যানেল করে ছোট ছোট কেন্দ্রীয় রিজার্ভার বানিয়ে সেখানে রাখতে পারি এবং পরবর্তীতে ওভারহেড ট্যাংকের সাহায্যে পুনরায় বিল্ডিংগুলোয় পাঠাতে পারি তবে এক বিশাল অংশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সঠিক ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও ডিজাইনের মাধ্যমে নগরীতে এ কাজ মোটেও দুঃসাধ্য নয়।

বৃষ্টির পানির আরেকটি বিশেষ সুবিধা হচ্ছে তা অনেকটাই পরিষ্কার। ছাদে পড়া প্রথম ৫ মিনিটের পানি আলাদা করে বাকিটা রিজার্ভারে নিলে শুধুমাত্র খাওয়ার জন্য সে পানির আলাদা করে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাকি যে কোন কাজই এই পানি অনায়াসে করা সম্ভব। আর খাবারের জন্যও যে পরিষ্কারের প্রয়োজন তা শোধনাগারের পানি পরিষ্কারের খরচের তুলনায় বহু অংশে কম।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ব্যবহারের খরচ মূলত এককালীন। পুরো সিস্টেম ডিজাইন, সংগ্রহ ও পরিশোধন পদ্ধতি, রিজার্ভার তৈরি এবং সরবরাহ সিস্টেম- এ চারভাগে মোট খরচকে ভাগ করা যায়। এর মাঝে ডিজাইন ও রিজার্ভার বাবদ মূল খরচের প্রায় ৫০ ভাগ। বাকি ৫০ ভাগ সংগ্রহ, পরিশোধন ও সরবরাহ বাবদ খরচ হয়। তবে ডিজাইন ভেদে ৩ - ৭ বছরের মাঝেই বিনিয়োগ উঠিয়ে আনা সম্ভব। ঢাকায় মোট বৃষ্টিপাতের ৮০ ভাগই মে-সেপ্টেম্বর এই সময়ে সংঘটিত হয়। এই পাঁচ মাসের বৃষ্টির পানি যদি মে-অক্টোবর পর্যন্ত এই ছয় মাস ব্যবহার করা যায় তাহলে একদিকে যেমন ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ অর্ধেক কমে তেমনি ভূগর্ভে পানি রিচার্জের পরিমাণও বাড়ে আর চাপ কমে পানি শোধনাগারের উপরে, খরচ কমে সরকার এবং নগরবাসীর।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাসাবাড়িতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ১৮০০ - ২০০০ স্কয়ার ফিটের একটি বিল্ডিং এ পানির বিল প্রায় (১০-১৫)% কমানো সম্ভব। আর নতুন তৈরি বাড়িগুলো যদি শুধুমাত্র বাৎসরিক বিশুদ্ধ খাবার পানির চাহিদা মেটানোর জন্যও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করে তবে বিল ২০% এর বেশি কমানো সম্ভব।

ওয়াসার মতে পানির চাহিদা ঢাকায় একজনের মানুষের প্রতিদিন ১৪০ লিটার। সে হিসেবে প্রতিদিন চাহিদা শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ৩০০ কোটি লিটারের বেশি। অথচ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ ওয়াসা প্রতিদিন সরবরাহ করছে ২৫০ কোটি লিটার। এ ঘাটতির কথা কারোই অজানা নয়। সবচেয়ে শংকার ব্যাপার চাহিদা নিয়মিতই বাড়ছে সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে মূল উৎস- ভূগর্ভস্থ পানি। একটা সময়ে যেমন পাওয়া যাবে না ভূগর্ভস্থ পানি তেমনি খরচ বাড়লেও আনুপাতিক হারে বাড়বে না শোধনাগারগুলো থেকে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ। সঠিক ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং উৎসগুলো থেকে প্রাপ্ত পানির সঠিক ব্যবহারই পারে একমাত্র ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত পানি সমস্যা মোকাবেলা করতে।

বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাজধানীর বাইরের জন্যও একটি বিকল্প হিসেবে এখনি পরিকল্পনা করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে শতকরা ৯৭ ভাগ মানুষ পরিমাণমত পানি পেলেও এর মাঝে ৬০ ভাগেরই পানির উৎস পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয়। আর্সেনিক সমস্যা আর লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ পানির সমস্যা দেশব্যাপী তাই আরো প্রকট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ব্যবহার কোন অত্যাধুনিক সমাধান নয়। সৃষ্টির আদি থেকেই মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে এ পানি ব্যবহার করেছে। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে সঠিক প্রকৌশলবিদ্যা ব্যবহার করে প্রাকৃতিক এ উৎসকে অত্যাধুনিকভাবে কাজে লাগিয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব। ব্রাজিল, সিংগাপুর, চীন, জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া এখন বিশ্বে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে রোল মডেল। সেইসাথে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলংকাও তাদের অঞ্চলভিত্তিক পানির সমস্যা মোকাবেলা করছে এই পদ্ধতিতে। তাই অন্ধভাবে অনুকরণ করে শোধনাগার প্রতিষ্ঠা না করে তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

লেখক: বিএসসি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, বুয়েট।

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত