বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭
২৯ °সে

নাগরিক মতামত

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা: করোনা এবং ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা: করোনা এবং ভবিষ্যৎ
প্রতীকী ছবি

সর্বগ্রাসী করোনা সংক্রমণে বিপর্যস্ত বিশ্বে আজ মানুষের জীবনযাপনের কিছু মৌলিক সূত্র, যেমন পারস্পরিক যোগাযোগ, সামাজিক, পারিবারিক বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালন হয়ে পড়েছে কষ্টসাধ্য। এই নতুন বাস্তবতায় আমাদের জীবনাচরণ কেমন হবে, তা এখনো বোঝা না গেলেও এটুকু নিশ্চিত যে, কার্যকরি ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত আমাদের জীবন আর পূর্বাবস্থায় ফিরছে না।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে এই রূঢ় বাস্তবতা মেনে নিয়েই তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে আমরা সম্প্রতি ভার্চুয়াল আদালতের অগ্রযাত্রা দেখেছি, তবে এই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন অনেকেই। ভার্চুয়াল আদালতের পক্ষের যুক্তি মতে, জনাকীর্ণ আদালতে বিচারক ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবারই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। আর বিরোধী যুক্তিমতে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থার প্রায়োগিক দিকগুলো অধিকাংশ আইনজীবীদের অজানা থাকায় মুষ্টিমেয় কজন ব্যতীত অধিকাংশের পক্ষেই ভার্চুয়াল আদালতে মামলা করা অসম্ভব।

একদিকে খোলা আদালতে করোনার ঝুঁকি, অন্যদিকে অধিকাংশ আইনজীবীর উপার্জনহীনতার হাহাকার—এই দ্বিমুখী সমস্যা থেকে আমরা কীভাবে বেরিয়ে আসব?

এ ক্ষেত্রে, বিলাতের বিচারব্যবস্থার পারিবারিক ডিভিশনের প্রেসিডেন্ট স্যার অ্যান্ডরু ম্যাকফারলেইনের উক্তি প্রণিধানযোগ্য—‘এটি অনুমানযোগ্য যে সামাজিক দূরত্ব অনেকদিন ধরে চলতে থাকবে এবং ২০২০-এর শেষ বা ২০২১-এর আগ পর্যন্ত আমাদের স্বাভাবিক আদালতের পরিবেশে যাওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের এই পরিবর্তন মাথায় রাখতে হবে। কারণ, বিচার ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব পড়বে। একটি মামলা স্বল্প সময়ের জন্য মুলতবি করার যে যৌক্তিকতা আগে ছিল, তা এই দীর্ঘ সময়ের আলোকে নতুন করে পুনঃনির্ণয় করতে হবে। বিচারকার্যের পরিসমাপ্তির প্রয়োজনীয়তা, বিচারকার্যে বিলম্বতার বিরূপ প্রভাব, মামলা-মোকদ্দমার ক্রম বর্ধমান দীর্ঘজট এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত সব বিষয়সমূহ বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্তের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হওয়া বাঞ্ছনীয়।’

ওপরের কথাগুলো বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি। জরুরি ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ না নিলে করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে আমাদের যে মামলাজট ছিল, বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে তা প্রকটতর আকার ধারণ করবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের যে সাংবিধানিক গুরুদায়িত্ব, তাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে যাওয়া এই সম্ভাবনা আমাদের কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দুর্যোগকালে ভার্চুয়াল আদালত একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ভার্চুয়াল এবং স্বাভাবিক আদালতের একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা চিন্তা করাই সমীচীন। আমাদের সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা আরো বছরখানেক থাকতে পারে এবং এই সময়ে মামলার সংখ্যাও বেড়েই চলবে; এই দুইটি বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মামলা পরিচালনার বিষয়ে সময়ের সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা আমাদের সমাধানের একটি পথ হতে পারে। কেননা অধিকাংশ মামলাতেই অনর্থক এবং অযাচিত সময় নষ্ট এবং কালক্ষেপণ করা হয়। বিচারিক সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাই নিম্নোক্ত প্রস্তাবগুলো তুলে ধরছি—

বিচার্য বিষয় স্পষ্টীকরণ

ক. মামলার বিচার্য বিষয়সমূহ প্রতিদ্বন্দ্বী বিচারপ্রার্থীদের সম্মতি-সাপেক্ষে ঠিক করা। এ ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমার কার্যবিধিসংক্রান্ত আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ জরুরি।

খ. মামলার বিচার্য বিষয়সমূহ, যতদূর সম্ভব (মৌখিক শুনানি অপরিহার্য না হলে) লিখিত সাবমিশন এবং কাগজপত্রের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা।

গ, যে মামলায় মৌখিক শুনানি বা সাক্ষীদের জেরা অপরিহার্য, সে ক্ষেত্রে মৌখিক শুনানি বা সাক্ষীদের জেরা ও বিচার্য বিষয়, নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণসাপেক্ষে সম্পন্ন করা।

শুনানির বিন্যাস

ক. প্রতিটি শুনানির জন্য দিন ভিত্তিক শুরু থেকে শেষ সময় বেঁধে দেওয়া। এতে করে বিচারিক কাজে সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

খ. যেসব মামলায় মৌখিক শুনানি বা সাক্ষীদের জেরা অপরিহার্য, সে রকম শুনানি— সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে—প্রতিদিন কয়টি এবং কোন সময়ে হবে সে সংক্রান্ত নোটিশ আগেই সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা। এতে করে আদালত প্রাঙ্গণে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে লিখিত সাবমিশন এবং কাগজপত্রের ভিত্তিতেই শুনানি সম্পন্ন করা।

বিচারিক সহযোগী নিয়োগ

উন্নত বিচারব্যবস্থায় বিচারিক সহযোগী তথা জুডিশিয়াল ক্লার্ক বা অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকে, যারা মামলা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র বিশ্লেষণে বিচারককে সহযোগিতা করেন। পার্শ্ববর্তী ভারত এবং পাকিস্তানে প্রচলিত এই ব্যবস্থাটি বাংলাদেশেও প্রণয়ন করা হলে তা সময়-ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর পন্থা হিসেবে কাজ করবে; বিশেষত সেসব মামলায় যা শুধু লিখিত সাবমিশন এবং কাগজপত্রের ভিত্তিতে সম্পন্ন করা যায়।

ওপরের পরামর্শগুলো করোনাকালে দুটি উপকার করবে। প্রথমত, করোনার প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও বিচারের চাকা সচল থাকবে, যা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। দ্বিতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনজীবীবৃন্দ যারা উপার্জনহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের ভোগান্তি কমবে।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ভার্টেক্স চেম্বারসের ম্যানেজিং পার্টনার

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত