বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭
৩০ °সে

নাগরিক মতামত

বাংলাদেশের রূপকল্প

স্মার্ট ফার্মিং, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বাংলাদেশের রূপকল্প
প্রতীকী ছবি

ক্রমাগত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চলাচলে লকডাউনের কারণে সৃষ্ট বাধায় বিশ্ব অর্থনীতি এখন হুমকির সম্মুখীন। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে অনেকেই ইতোমধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পোশাকশিল্প, ব্যাংক, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, কৃষি ছাড়াও প্রায় সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক মন্দার আভাস যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনোবল হারালে চলবে না। যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে সম্ভাবনাও রয়েছে। Winston Churchill যথার্থই বলেছেন, “The pessimist sees difficulty in every opportunity. The optimist sees the opportunity in every difficulty.” আমরাও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রেখে বিশ্বাস করি, ‘মেঘ কেটে যাবে’ শিগিগরই। করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশকে অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা কাটিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট অব থিংস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। করোনার প্রাদুর্ভাবকালীন যে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আমাদের ভাবিয়েছে তা হলো খাদ্য ও চিকিত্সা। এখানে উল্লেখ্য, প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষ মন্দার সম্মুখীন। তাই প্রধানত কৃষি, চিকিত্সা ও আধুনিক যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরির ক্ষেত্রগুলো উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে কীভাবে করোনা-পরবর্তী মন্দাবস্থা মোকাবিলা করা যেতে পারে সে ব্যাপারেই নজর দেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের মোট আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই আসে এই কৃষি থেকে, যা বাংলাদেশের জিডিপিতে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ অবদান রাখছে। তাই কৃষিতে উন্নয়ন করলে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অভূতপূর্ব সাফল্য আনা যেতে পারে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ চীন, জাপান, আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলো। চীন বর্তমানে ড্রোন ব্যবহার করে ফসলি জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকে। ড্রোনটি একটি রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা চালিত এবং একজন কৃষকই এই ড্রোন চালনা করতে পারেন। এতে করে যেমন উত্পাদনক্ষমতা বাড়ছে, তেমনি তুলনামূলক বেশ দ্রুত কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করা যাচ্ছে। চীনে যেখানে একটি ড্রোন এক দিনে ৬ দশমিক ৭ হেক্টর জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করতে পারে, সেখানে এক দিনে তিন জন চাষি ১ দশমিক ৩৩ হেক্টরের বেশি জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করতে সক্ষম নন। তাই ড্রোন ব্যবহারে যেমন খুব সহজেই কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করা যায়, সঙ্গে খরচের পরিমাণও কমে যায়। শুধু তাই নয়, এসব ড্রোন বিশেষ অনুভূতিসম্পন্ন, যার ফলে এগুলো খুব সহজেই কীট আক্রান্ত ফসল ও গাছপালা শনাক্তও করতে সক্ষম। এই বিশেষ ক্ষমতাবলে এই ড্রোনগুলো সুপরিকল্পিতভাবে আক্রান্ত ফসলেই কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকে। শুধু কীটনাশকই নয়, উন্নত বিশ্বে যন্ত্র ব্যবহার করে মাটি খনন, বীজ রোপণ এবং উত্পাদিত ফসল কাটার কাজও যন্ত্র দ্বারা করা হয়ে থাকে।

বর্তমানে স্বল্প ব্যয়ে কৃষিজমিতে উত্পাদন বৃদ্ধির পেছনে একটি চালিকাশক্তি হলো ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), যা সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ বদলে দিয়েছে। স্মার্ট ফার্মিং ও স্মার্ট এগ্রিকালচার হলো জনগণের জন্য পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর খাবার উত্পাদনকারী, সময় ও মূলধন সাশ্রয়ী একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হাইটেক সিস্টেম। এই সিস্টেম বলতে কৃষিতে আধুনিক আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি) এবং ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তির ব্যবহারকে বোঝায়। কৃষিতে ইন্টারনেট অব থিংস অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্মের যানবাহন ট্র্যাকিং, প্রাণিসম্পদ পর্যবেক্ষণ, গুদাম পর্যবেক্ষণ এবং আরো অনেক কিছু। প্রাণিসম্পদ পর্যবেক্ষণের জন্য ওয়্যারলেস আইওটি অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার হচ্ছে অনেক উন্নত দেশেই। এটি অসুস্থ প্রাণী চিহ্নিত করতে সহায়তা করে, যাতে তাদের অন্য পশুর থেকে আলাদা করা যায়। এভাবে রোগের বিস্তার প্রতিরোধ করা যায়। এটি শ্রমের ব্যয় হ্রাস করে। কারণ পশুপালকেরা তাদের গবাদি পশু কোথায় রয়েছে তা শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া উদ্ভিদ ও মাটির গুণাগুণ নির্ধারণ, পরিমিত পানি সেচ, পরিমিত সার প্রদান, আবহাওয়ার পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করা ইত্যাদি কাজে আইওটি অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের ফলে কৃষিকাজে বাম্পার ফলনের পাশাপাশি সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হচ্ছে। আইওটিভিত্তিক স্মার্ট ফার্মিংয়ে কৃষকেরা যে কোনো জায়গা থেকে জমির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আইওটিভিত্তিক স্মার্ট ফার্মিং অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও উন্নত মানের।

এবার দৃষ্টিপাত করা যাক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর। আমাদের দেশে অনেক সময় অনেক ফসলের মাত্রাতিরিক্ত ফলন হয়। যেমন আলুর মৌসুমে আলু পচে যায়, আবার মৌসুম শেষে চড়া দামে কিনতে হয়। অনেক সময় তা রপ্তানি করাও যায় না। আর তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিভিন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রের দ্বারা বিশেষ প্রক্রিয়ায় গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফলমূল ও শাকসবজির তৈরি বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য দেশীয় জনসাধারণের চাহিদা মেটানো ছাড়াও বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এতে সব ধরনের ফল ও শাকসবজি সারা বছর গ্রহণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানসম্পন্ন টম্যাটো সস, বিভিন্ন ফলের জুস, আচার ইত্যাদি তৈরি ও রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশেই ক্যান্ড (canned) ফুড উত্পাদন করা হয়। মাছ-মাংস প্রক্রিয়াজাত করে ক্যানে ভরে ভোক্তাদের সরবরাহ করা হয়। এসব ক্যান্ড ফুড অনেক দিন মজুত করে রাখা যায়। এ কারণেই এ ধরনের পুষ্টিকর ক্যান্ড ফুড তৈরি ও বাজারজাত করা হলে দেশীয় চাহিদা যেমন মিটবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব।

করোনাকালীন চিকিত্সা বিজ্ঞানের কী কী উন্নতিসাধন করা প্রয়োজন তা আমরা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে ছিল চিকিত্সকদের Personal Protective Equipment বা সুরক্ষা পোশাকের অভাব, যার ফলে চিকিত্সকগণ অনেকটা দিন রোগীদের চিকিত্সাই দিতে পারেননি। ছিল টেস্ট কিটের অভাব, যার ফলে করোনা টেস্ট করতে পারা রোগীর সংখ্যাও ছিল নগণ্য। এর ফলে করোনা রোগী শনাক্তকরণই ছিল দুরূহ আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা তো অসম্ভব ছিল। এরপর এলো দ্রুত ভ্যাক্সিন আবিষ্কার না করতে পারার অপারগতা। শুধু আমাদের দেশই নয় বরং গোটা বিশ্বই একই ভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে করোনার ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের কিন্তু এখনো কোনো ভ্যাক্সিন সেভাবে মানুষের নাগালে আসেনি। আইসিইউয়ের অপ্রতুলতায় মানুষ মরছে। কৃত্তিম বুদ্ধির মাধ্যমে যুগোপযোগী চিকিত্সা বিজ্ঞানের গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চিকিত্সা বিজ্ঞানের আমূল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। দেশের নতুন প্রজন্মকে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিলে দেশেই অত্যাধুনিক যন্ত্রাবলী তৈরি করা সম্ভব হবে; যা চিকিত্সা ক্ষেত্রের উন্নতিতে ভূমিকা পালন করবে। এসব যন্ত্র আমদানি করতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা লেগে যায়। অথচ দেশের মেধা ব্যবহার করে তুলনামূলক স্বল্প খরচে এসব অত্যাধুনিক মেশিন তৈরি করা সম্ভব। এর সঙ্গে বিভিন্ন রোগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক তৈরি এবং তা রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। দেশের চিকিত্সা খাতের উন্নতি দেশের সমৃদ্ধির জন্য যে কতটা প্রয়োজন, তা করোনার এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ই প্রমাণ করে দেয়।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর হচ্ছে আরো একটি অন্যতম সেক্টর, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষির পরে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার অপর একটি সম্ভাবনাময় খাত। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল ও অটোমোবাইলের মতো লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যকে ‘বর্ষপণ্য’ ২০২০ বলে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ঘোষণা করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই খাত অল্প দিনের মধ্যেই জিডিপিতে অবদান রেখেছে ২.২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ আমদানি খরচ হ্রাস করা সম্ভব শুধু শিল্প, কৃষি এবং মেরামত কাজে সহায়ক যন্ত্রাংশ তৈরি ও মেরামত করার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে সরকার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং উত্পাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষিপ্রধান আমাদের এই দেশে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশিষ্টজনেরা। কেননা কৃষিতে আধুনিক যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে আমরা বেশির ভাগ সময়ে বিদেশি যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশি কৃষিবিজ্ঞানী ও উত্পাদনমুখী এই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যদি বাংলাদেশের জমিনির্ভর যন্ত্রাংশ আমাদের দেশেই তৈরি করা যায় তবে যেমন একদিকে দেশের কৃষিকে দ্রুত আধুনিকীকরণ সম্ভব তেমনি অন্যদিকে স্বল্পমূল্যে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া যাবে আধুনিক কৃষি যন্ত্রাংশ।

লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত