বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭
২৯ °সে

নাগরিকমত

বঙ্গবন্ধুর ঢাবি ছাত্রত্ব ফিরে পাবার দিনকে জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস ঘোষণা করা হউক

বঙ্গবন্ধুর ঢাবি ছাত্রত্ব ফিরে পাবার দিনকে জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস ঘোষণা করা হউক
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর অন্যায়ভাবে প্রদান করা বহিষ্কার আদেশ ২০১০ সালের ১৪ আগস্ট প্রত্যাহার করে নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে 'জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস' (National Students Day) হিসেবে পালনের জন্য প্রস্তাব করছি।

বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকালে আমার কাছে সমগ্র বাংলাদেশের ছবি ভেসে ওঠে। আবার বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। কারণ বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু। যখনই বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকাই এবং চোখে চোখ রাখি তখনই মনে হয় বঙ্গবন্ধুর ওই চোখ কথা বলে এবং চোখগুলো জীবন্ত। মনে হয় বঙ্গবন্ধুর চোখ বলে-আমার দেশের তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, নবীন-প্রবীণ, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সোনার বাংলা গড়বে। আমাদের বঙ্গবন্ধু সারাজীবন দেশের জন্য, এই বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য, অসহায়, শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, শ্রমিক, চাষী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ও সকল শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছেন। সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, অন্ধকার কারাগারে থেকেছেন। তিনি ছিলেন বিশ্বনেতা। জীবনে ব্রিটিশ আমলে ৭ দিনসহ সর্বমোট ৪৬৮২ দিন কারাগারে বন্দী থেকেছেন। তিনি আপামর জনসাধারণের জন্য,বাংলার স্বাধীনতার জন্য ২২ বার গ্রেফতার হন ও ১৮ বার কারাবরণ করেন।

১৯৩৯ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করার কারণে তাঁকে কারাভোগ করতে হয়। দেশের প্রয়োজনে প্রতিটা সংগ্রামে, আন্দোলনে,সকল গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে কারাগারেই তিনি অনশন শুরু করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা কর্মসূচী পালনের পরামর্শও দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ 'বাংলাদেশ' তিনিই করেন।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ভাষণে সমস্ত নিরস্ত্র বাঙ্গালীরা যুদ্ধের অনুপ্রেরণায় পায়। পরবর্তীতে নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙ্গালী জাতি বিজয় অর্জন করে। মহান এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানি হয়। আমি সশ্রদ্ধচিত্তে তাঁদের স্মরণ করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি একই সাথে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ আপনার পরিবারের সকল শহীদদের প্রতি জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে ৩০ অক্টোবর ২০১৭ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য ঘোষণা করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO)। বঙ্গবন্ধুর কাব্যিক কথামালার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউজউইক ম্যাগাজিন ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল তাঁকে ‘Poet of politics’ বা রাজনীতির কবি উপাধি দেয়।

আমাদের বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বনেতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আগেও পড়েছি। কিন্তু বিসিএস ও অন্যান্য সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধুর জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত লেখাপড়া করছিলাম। হঠাৎ এক জায়গায় আমার দৃষ্টি আটকে যায় এবং একটি ভাবনা মাথায় আসে। তা হলো- ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করায় বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ বহিষ্কৃত হন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মুচলেকা ও ১৫ টাকা জরিমানার বিনিময়ে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি এবং ছাত্রত্ব ফিরিয়ে নেননি। এ দিনটি নিশ্চিতভাবে ইতিহাসের এক কলঙ্কিত দিন। ৬১ বছর পর ১৪ আগস্ট ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিলের নির্দেশ প্রত্যাহার করে। কিন্তু আমার মতে এ সিদ্ধান্তেই এ কলঙ্কিত ইতিহাসের দায় শোধ হয় না। বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্য এ সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। কারণ ১৯৪৯ সালের ২৬ মার্চ যে শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়, সেই শিক্ষার্থীই ঠিক ২২ বছর পর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ নিজ দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাই আমি এই মুজিব শতবর্ষে প্রস্তাব করছি যেন এ বছর থেকেই প্রতিবছর ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু স্মরণে তাঁর ঢাবি’র ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার দিনটি ‘জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস’ (National Students Day) হিসেবে পালন করা হয়। তাহলে ওইদিন দেশের সকল শিক্ষার্থী বুঝতে পারবে এ দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। যতদিন বাংলাদেশ রবে ততদিন প্রত্যেক শিক্ষার্থী এই ইতিহাস শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনে, পরিবারে, সমাজে, দেশে শিক্ষাকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি শিক্ষার্থী হিসেবে লেখাপড়াকে যে গুরুত্ব দিয়েছেন তা তাঁর লেখা দুটি চিঠির দিকে তাকালে বোঝা যায়। ১৬ এপ্রিল ১৯৫৯ সালে ঢাকা জেল থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে চিঠি লিখলেন- 'আমার কবে মুক্তি হবে তার কোন ঠিক নাই। তোমার একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখানো। টাকার দরকার হলে আব্বাকে লিখিও। কিছু কিছু মাসে মাসে দিতে পারবেন। হাসিনাকে মন দিয়ে পড়তে বলিও। কামালের স্বাস্থ্য মোটেই ভালো হচ্ছেনা। ওকে নিয়মমতো খেতে বলিও। জামাল যেন মন দিয়ে পড়ে আর ছবি আঁকে। এবার একটা ছবি এঁকে যেন নিয়ে আসে আমি দেখব। রেহানা খুব দুষ্টু। ওকে কিছুদিন পর স্কুলে দিয়ে দিও জামালের সাথে। যদি সময় পাও নিজেও একটু লেখাপড়া করিও।'

আরও একটি চিঠি ১৬ এপ্রিল ১৯৬৭ সালে তিনি লিখেন কারাগারে বসে। তিনি লিখেছেন- 'কয়েকদিন পর্যন্ত মাথার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্যারিডন খাই। খাওয়ার পরে কিছু সময় ভাল থাকি। মাথার যন্ত্রণা হলে লেখাপড়া করতে পারিনা, লেখাপড়া না করলে সময় কাটাই কি করে!'

এ দুটি চিঠি দেখলেই বোঝা যায় তাঁর কাছে ছিল শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই প্রতিবছর বঙ্গবন্ধু স্মরণে ১৪ আগস্ট 'জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস' (National Students Day) পালনের প্রস্তাব করছি।

লেখক: এমবিএ শিক্ষার্থী, ঢাকা কমার্স কলেজ

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত