বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭
৩০ °সে

আবাসন শিল্পে বিনিয়োগ করার এখনই সময়

আবাসন শিল্পে বিনিয়োগ করার এখনই সময়
বাংলাদেশের আবাসন শিল্প

বিশ্বব্যাপী কোভিড– ১৯ এর মহামারীতে এক কঠিন অর্থনৈতিক মন্দায় নিমজ্জিত সকল ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য। মহামারী হলে অর্থনৈতিক মন্দা হবে এটা খুবই স্বাভাবিক। এই অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আবাসন শিল্পে অনেক বেশি। ক্রেতার সংখ্যা হুট করে কমে যাওয়ায় আবাসন শিল্পে বিগত অনেক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। তবে এই সময়ের যোগান এবং চাহিদার ভারসাম্য না থাকায় এবং পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় ক্রয় বান্ধব হওয়াতে ক্রেতা বা বিনিয়োগকারীর জন্য খুব ভালো সময় বলা যায়। তাই এই সময় ফ্ল্যাট বা রিয়েল এস্টেট এর যে কোনো খাতে বিনিয়োগ করে একজন ক্রেতা কি কি সুবিধা পেতে পারেন তা ধারাবাহিক আলোচনা করা যেতে পারে।

চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যহীনতা

কোন পণ্যের চাহিদার তুলনায় যদি যোগান বেশি হয় স্বাভাবিক ভাবে বাজার ভারসাম্যের জন্য দাম কিছুটা কমে যায়। কোভিড– ১৯ এর পূর্বে রিয়েল এস্টেট বাজারের চাহিদার তুলনায় কিছুটা নির্মাণাধীন বা সম্পূর্ণ নির্মিত ফ্লাট এর যোগান বেশি ছিল, তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যান্য খাত সচল থাকায় ভালোই বেচাকেনা চলছিল। কোভিড– ১৯ এর কারণে ক্রেতার সংখ্যা হুট করে কমে যায়। কিন্তু বিক্রয়যোগ্য ফ্লাট যথারীতি বাজারে অবস্থান করছে।যে কারণে ছোট ও মাঝারি অনেক ডেভলপার কোম্পানী নগদ অর্থের সংকটে আছে তাই অনেকে প্রতিষ্ঠান এর আনুষঙ্গিক খরচ উঠানোর জন্য বিনিয়োগের চেয়েও কম মূল্যে ফ্ল্যাট বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে। ছোট এবং মাঝারি কোম্পানিগুলো এরকম ব্যবস্থা নেওয়াতে বড় কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হচ্ছে কম মূল্যে বা অধিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের পণ্য বিক্রি করতে। বাজারে এই চাহিদার তুলনায় যোগান অনেক বেশি হওয়াতে ক্রেতারা বিক্রেতার কাছ থেকে অধিক সুবিধা নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

কম সুদে ব্যাংক লোনের সুবিধা

বিগত অনেক বছরের মধ্যে ব্যাংক লোনের সুদের হার সবচেয়ে কম নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রহেলা এপ্রিল ২০১৯ থেকে ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত যে কোনো লোনের ক্ষেত্রে ৯% বা কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়ে অনেক কমে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক মাত্র ৬% হারে আমানতকারী কে সুদ দিচ্ছে। যা দুই বছর আগে বিভিন্ন ব্যাংক বা ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো ৯ থেকে ১১% হারে সুদ দিত। কাজেই এখন ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রেখে খুব অল্প পরিমাণে গ্রাহকরা সুবিধা পাচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করে অল্প সুদে পরিশোধ করার যে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে তা বিগত দিনগুলোতে কল্পনা করা যাচ্ছিল না।

বিনিয়োগের সঠিক মাধ্যম ও আস্থার অভাব

বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকে টাকা রেখে যেমন খুব অল্প পরিমাণ সুদ পাচ্ছেন তেমনি পুঁজিবাজারে মহা ধসের কারনে সবাই আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। পুঁজিবাজারে এখন এক অনিশ্চিত ও হতাশার জায়গা। তাই এখানে আর কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশিরভাগ খাতে বিক্রয় কমে যাওয়াতে এই সময় নতুন করে বড় অংকের বিনিয়োগ করা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ না,যেখানে পুরাতন ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছে। আর ঠিক এই অবস্থায় যেহেতু রিয়েল এস্টেট বাজারে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতা অনেক বেশি তাই এই মুহূর্তে প্রত্যেকটি ক্রেতা ফ্ল্যাট বা কোন কমার্শিয়াল স্পেস কেনার সময় অনেক গুলা দেখে একজন রিয়েল এস্টেট পরামর্শকের সহযোগিতায় তুলনামূলক কম দামের মধ্যে ভালো ফ্ল্যাট বা কমার্শিয়াল স্পেস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি যা কোভিড– ১৯ এর পূর্বে ও এতটা সুবিধা ছিল না।

কতদিন পর্যন্ত এই মূল্য হ্রাস থাকতে পারে

খুব সহজভাবে বলতে গেলে অর্থনৈতিক মন্দা যতদিন থাকবে ততদিনই এই মূল্য হ্রাস থাকবে। কোভিড– ১৯ এর ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক আবিষ্কার বা প্রকৃতিগতভাবে যদি ভাইরাস দুর্বল হয়ে যায় তবে এই মহামারী দুর্যোগ আংশিক কাটিয়ে উঠবে বলে মনে হয়। অর্থনীতি এমন দুঃসময় দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে না, একটা সময় পর স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফিরে আসে। বিগত দিনের সকল অর্থনৈতিক মন্দা সম্পর্কে বাজার অর্থনীতি বিশ্লেষকরা কখন ঘুরে দাঁড়াবে এটা যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কিন্তু এবারে এই মহামারী কোন বাজার বিশ্লেষক ব্যাখ্যা করতে পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছেন। অর্থনীতির এই মন্দার সময়টুকুকে পাঁচটি স্তরে বিভক্ত করা যায়। প্রথমতঃ মন্দার ঠিক পূর্ববর্তী সময়– এই সময়টা আমরা বাংলাদেশের পেক্ষাপটে ২০২০ সালের মার্চ মাস ধরে নিতে পারি। দ্বিতীয়তঃ বিক্রয় একদম কমে যাওয়া, এই সময়টা আমরা মে মাস বলতে পারি। তারপর স্তর হচ্ছে ধীরে ধীরে বিক্রয় ফিরে আসা, এ সময়টা জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু। চতুর্থতঃ হুট করে দাম বাড়তে শুরু করা। এই সময়টা এখন বলা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী আমাকে এই প্রশ্ন করেছেন কিন্তু এর সঠিক সময় কোন বাজার অর্থনীতি বিশ্লেষক বলতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ মহামারীর নিয়ন্ত্রণ অথবা তার সাথে সম্পূর্ণরূপে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং সকল প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল না হলে এই অবস্থাটা ফিরে আসবেনা। তবে বিগত বিশ্বযুদ্ধ বা মহামারী প্রভাব বর্তমান সময়ে মানবজাতির জীবনধারা ও বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন ধারণা থেকে অনুমান করা যায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে কোন একটা সময় অর্থনীতির চাকা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য গতিশীল হবে। সর্বশেষ স্তর হচ্ছে বাজার পূর্বের মত বা তার চেয়েও ভালো অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানো, এ সময়টা হবে পূর্ববর্তী স্তরের ছয় মাস পরে। অর্থাৎ চতুর্থ স্তর যদি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস হয় তবে পঞ্চম স্তর হবে ২০২২ সালের অগাস্ট মাস। ঠিক এই সময় ফ্ল্যাটের দাম প্রথম স্তরের চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ এই সময়টাতে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি আগের অবস্থায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল,যে কারণে বিদেশ থেকে রেমিটেন্স অনেক বৃদ্ধি পাবে স্বাভাবিক ভাবে প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করতে চাইবে। আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই দুই বছর ফ্লাট ক্রয়-বিক্রয় পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় কম থাকবে তাই ডেভলপার কোম্পানি গুলো খুব একটা নতুন করে কোন জমির মালিকের সাথে নতুন প্রজেক্ট করার পরিকল্পনা করবে না। যার ফলে একটা সময় বাজারে নতুন ফ্ল্যাটের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যোগান থাকবে না। কারণ একটা ছোট বা মাঝারি আকারের প্রজেক্ট নির্মাণ করতে আড়াই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।এদেশের আবাসন শিল্প ২১১ টি উপখাত নিয়ে প্রায় অর্ধকোটি লোকের কর্মসংস্থান চলমান রেখে কৃষি এবং তৈরি পোশাক খাতের পরে অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন যাবত সবচেয়ে বড় অবদান রেখে চলছে । রিয়েল এস্টেট খাতের সুদিন অবশ্যই ফিরে আসবে এরই মধ্যে সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ খুব সহজ শর্তে বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। যার ফলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে বিনিয়োগের এক নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।এছাড়া ফ্ল্যাট নিবন্ধন খরচ কিছুটা কমেছে এ বছরের শুরুর দিকে যা দীর্ঘদিন যাবৎ রিয়েল এস্টেট হাউজিংয়ের এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (রিহ্যাব)এর পরিচালনা পরিষদ থেকে দাবি করা হচ্ছিল।

আবাসন শিল্পে বিনিয়োগ করার এখনই সময়

এই সময় বিনিয়োগে সর্তকতা

একজন সচেতন ক্রেতা বা বিনিয়োগকারী হিসেবে যেমন এই সময় বিনিয়োগ করা সুবিধা অনেক বেশি তেমনি বেশকিছু সর্তকতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আপনি যে ফ্ল্যাট অথবা কমার্শিয়াল স্পেস কিনতে যাচ্ছেন তা কোভিড– ১৯ এর পূর্বে দাম কি রকম ছিল এবং বর্তমানে বিক্রেতা কি রকম দাম চাচ্ছেন তা একজন রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ পরামর্শকের সাথে আলোচনা করে সঠিক ভ্যালুয়েশন বা মূল্য নির্ধারণ করে নিতে হবে। সাধারণত মূল্য কমার ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বা আরো বেশি হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে জমির মালিক বা পূর্বে যারা ফ্লাট ক্রয় করেছিলেন তাদের কাছ থেকে আরো কম মূল্যে পেতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, যে সকল ডেভলপার কোম্পানির কাছে নগদ অর্থের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে তারা এই মুহূর্তেও মূল্য রাশ করতে রাজি হবেন না। এছাড়া এই সময় কারা বাজারমূল্য থেকেও কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে প্রস্তুত তার সঠিক তথ্য রিয়েল এস্টেট পরামর্শকের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই চেষ্টা করবেন প্রজেক্ট এর নির্মাণ কাজের শেষ পর্যায়ে বা সম্পূর্ণ নির্মিত প্রজেক্ট থেকে কিনার জন্য। তবে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির কাছ থেকে নির্মাণাধীন প্রজেক্ট থেকেও কেনা যেতে পারে। কয়েক বছরের পুরাতন ফ্ল্যাট ও মূল্য নির্ধারণ করে কিনা যেতে পারে। অবশ্যই একজন ক্রেতা হিসেবে বিক্রয় চুক্তিনামায় ভোক্তা বান্ধব সর্বোচ্চ সুবিধা গুলো নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের জন্য সকল আইনগত ও কৌশলগত বিষয় সহ রিয়েল স্টেট পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে একজন দক্ষ পরামর্শকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফরম্যাট এবং চেকলিস্ট অনুসরণ করে প্রপার্টি ভ্যালুয়েশন করে নিতে হবে। কোন অবস্থায় যাতে বিপণন ফাঁদে না পড়েন সে দিকে লক্ষ্য রেখেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে সকল ক্রেতা চিন্তা করেছিলেন এ বছর বা আগামী বছর ফ্ল্যাট বুকিং দিবেন তাদের জন্য সম্ভব হলে এ বছরই চিন্তা করা ভালো কারন একটা সময় পর অর্থনীতির এই মন্দা অবস্থা কেটে যাবে এবং ফ্ল্যাটের দাম এই অবস্থা থেকে হুট করে বেড়ে যাবে। রিয়েল এস্টেট খাতে এই মহা বিপর্যয় একমাত্র প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবে বাকিরা ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

বিগত দিনের পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের রিয়েল এস্টেট ক্রেতারা অর্থের বিনিময় সমপর্যায়ের পণ্য বিক্রেতা থেকে বুঝে নিতে পারেননি। তবে এখন হচ্ছে উপযুক্ত সময় এই খাতে সঠিক পরামর্শ, দিকনির্দেশনা ও সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগ করলে সেটা হতে পারে জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।

মো. শফিউল ইসলাম রায়হান

লেখক : রিয়েল এস্টেট পরামর্শক

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত