বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

করোনাকালে নতুন কর্মসংস্থান

করোনাকালে নতুন কর্মসংস্থান
করোনাকালে নতুন কর্মসংস্থান

ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ফল আনারস। ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে আদি নিবাস। বৈজ্ঞানিক নাম এনান্যাস স্টেইভ্যাস। পর্তুগিজ এনান্যাস থেকে আনারস শব্দের উত্পত্তি। রাসায়নিক বিচারে ব্রোমাইল অ্যালকোহলের জন্য আনারস স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। আনারস রেড ইন্ডিয়ানদের ধর্মীয় উত্সব বিশেষ করে মদ তৈরিতে ব্যবহূত হতো।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৩ সালে আমেরিকা আবিস্কারের সময় রসালো ফল আনারসের সঙ্গে পরিচিত হন। তারপর আমেরিকা থেকে আনারস আসে ইউরোপে। পর্তুগালে আনারস চাষের চেষ্টা চলে। কিন্তু আবহাওয়াজনিত কারণে বাণিজ্যিক আবাদ সম্ভব হয়নি। পর্তুগিজরা ১৫৪৮ সালে ভারতের কেরালায় আনারস নিয়ে আসেন। খ্রিষ্টান মিশনারিরা অষ্টাদশ শতাব্দীতে কেরালা থেকে এটি মেঘালয়ে নিয়ে আসেন। গারো পাহাড়ে এর সফল আবাদ শুরু হয়।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মেঘালয় থেকে সিলেট ও চট্রগ্রামে এবং ১৯৪২ সালে আসে মধুপুর গড়ে। মধুপুরের ইদিলপুর গ্রামের গারো সনাতন মৃ মেঘালয়ের গাছোয়া থেকে চারা আনেন। সেখান থেকেই ছড়ায় মধুপুর গড়ে। অপরদিকে কলার বৈজ্ঞানিক নাম মিউসা স্যাপ। ভারত ও চীন হচ্ছে কলার আদি নিবাস।

মধুপুর গড়ে বাণিজ্যিক কলা চাষ শুরু হয় ৮৬ সাল থেকে। বর্তমানে মধুপুরের পাহাড়ি এলকার ৪৫ হাজার একরে আনারস ও কলার আবাদ হয়। গাছ থেকে ফল বা ছড়ি নামানোর পর গাছ বর্জ্যে পরিণত হয়। এসব বর্জ্য এখন আর ফেলনা নয়। প্রযুক্তিগত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদে পরিণত হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নতুন পণ্যের উদ্ভাবন ও বিকাশ ঘটছে।

জানা যায়, ‘বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রিস’ সম্প্রতি ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ ও ‘শিল্প মন্ত্রণালয়’-এর আর্থিক সহায়তায় ‘বাংলাদেশ ইন্সস্পায়ার্ড’ নামক একটি প্রকল্প তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু করে দশ বছর আগে। পরে ব্যুরো বাংলাদেশ এ কাজে এগিয়ে আসে। হ্যান্ডিক্রাপ প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্যের আঁঁশ থেকে বাহারি পণ্য তৈরি শুরু করেন। বাহারি ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ, গহনার বাক্স, ওয়াল ম্যাট, টিস্যু বক্স, কলমদানী, হ্যাটসহ আকর্ষণীয় অলংকার তৈরি হচ্ছে। সংস্থা জানায়, এসব প্রাকৃতিক আঁশ থেকে পরিবেশ সম্মত পোষাক তৈরি সম্ভব।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের প্রাকৃতিক আঁশ থেকে পরিবেশসম্মত শিল্পপণ্য তৈরি হয়। বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন হলে বিদেশ থেকে সূতা আমদানি হ্রাস পাবে। গামের্ন্টস খাতে নতুন অনুষঙ্গ যোগ হবে। বর্জ্য থেকে জৈবিক সারও তৈরি সম্ভব। তবে আনারস ও কলার বর্জ্যে দৃষ্টিনন্দন পণ্য তৈরি করে দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছেন বাংলাদেশ ক্লাসিক্যাল হ্যান্ড মেইড প্রডাক্ট নামক একটি সংস্থা।

সংস্থার কর্ণধার হলেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাওহিদ বিন আব্দুল সালাম। সংস্থার শোরুম বারিধারায়। বগুড়া ও রংপুরে তিনটি কারখানায় দুই হাজার হতদরিদ্র নারী কাজ করছেন। ফ্লোর কার্পেট, কম্বলসহ দুই শতাধিক সৌখিন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উত্পন্ন হচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের ৩৭টি দেশে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে কারাখানায় দশ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে জানানো হয়। মধুপুর উপজেলার কাকড়াগুণি গ্রামের আনোয়ার হোসেন নিজ বাড়িতে খুলেছেন কারখানা। সেখানে আনারস ও কলার বর্জ্যে হচ্ছে সোনালী আঁশ।

কারখানায় কাজ করেন জনাপঞ্চাশেক হতদরিদ্র মানুষ। আঁশ চালান যায় বাংলাদেশ ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রডাক্টসহ অন্যান্য সংস্থার কারখানায়। তিনি জানান, পুঁজির জন্য কারখানার পরিসর বাড়াতে পারছেন না। এলাকায় বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল পচে বিনষ্ট হয়। এসব বর্জ্য কাজে লাগাতে পারলে কোটি কোটি টাকার আঁশ তৈরি সম্ভব। তিনচারশ লোকের কর্মসংস্থানও সম্ভব।

করোনায় যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে তখন আনোয়ার হোসেনের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তরা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এগিয়ে এলে তাওহিদ বিন সালাম এবং আনোয়ার হোসেনের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তরা হয়তো বেকারত্বের ধস কিছুটা ফেরাতে পারবেন।

লেখক : কলেজ শিক্ষক ও সংবাদকর্মী

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত