বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

‘পৃথিবীতে আজ কোনো সুখবর নেই’

‘পৃথিবীতে আজ কোনো সুখবর নেই’
‘পৃথিবীতে আজ কোনো সুখবর নেই’। ছবি: প্রতীকী

চারদিকে শুধু আজ মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বময় করোনার গ্রাস। বিজ্ঞানীরা সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন, চার মাস পর—ডিসেম্বরে সারা দুনিয়ায় কোভিড-১৯-এর আরো ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউ (second wave) আসবে। তাতে আরো লাখ লাখ লোক মারা যাবে। এ ক্ষেত্রে একটি ভরসা, করোনার বর্তমান ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে মানুষ এই বিবাদ সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন।

সুতরাং আত্মরক্ষার জন্য তারা যদি এখন থেকেই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশগুলো মেনে চলে তাহলে হয়তো করোনার আগামী ঢেউয়ের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমানো যাবে। কিন্তু আফ্রো-এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিরাট দরিদ্র জনসংখ্যা বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে চাইবে কি, না মেনে চলতে পারবে, সেটাও এক প্রশ্ন। আর যদি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সাহেদ করিমের মতো মার্চেন্ট অব ডেথ বা মৃত্যু-ব্যবসায়ীরা কোনো দেশে থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

দুরুদুরু বুকে রোজ ঘুম থেকে উঠি। আজ আবার কার মৃত্যুসংবাদ শুনব কে জানে? গতকাল (শুক্রবার) শুনেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর এমাজউদ্দীন আহমদ এবং রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মো. আবদুল হাইয়ের মৃত্যুসংবাদ। ড. আনিসুজ্জামান থেকে কামাল লোহানী পর্যন্ত বন্ধু বুদ্ধিজীবীদের একের পর এক মৃত্যুসংবাদ মনটাকে একেবারে মুষড়ে ফেলেছে। আমারও বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি। বিশ্বময় করোনার এই দাপটের মধ্যে এখনো যে বেঁচে আছি এটা একটা বিস্ময়!

ব্রিটেনে বসবাস করি। এখানেও করোনার মৃত্যু-মিছিল ছোট নয়। সারা বিশ্বে করোনা ছড়িয়েছে। পালাব কোথায়? বাংলাদেশের মানুষই পালাবে কোথায়? অথবা ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মানুষ? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যখন লন্ডনে হিটলারের ভি-রকেটের হামলা ঘণ্টায় ঘণ্টায় চলছে, মনে হয়েছিল প্যারিসের মতো লন্ডনও হিটলারের সেনাবাহিনী দখল করে নেবে।

তখন ব্রিটিশ রাজপরিবারের নিরাপত্তার জন্য মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজা, রানি এবং তাদের পরিবারের বিশিষ্ট সদস্যদের ভারতের রাজধানী (তখন ব্রিটিশ উপনিবেশ) দিল্লিতে সরিয়ে নেবেন। দিল্লি তখন হিটলারের ভি-রকেট থেকে নিরাপদ ছিল। কিন্তু রানি এলিজাবেথ (বর্তমান রানির মাতা) এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ জনগণকে হিটলারের বোমার মুখে রেখে তারা কোথাও পালাবেন না।

রানির দৃঢ়তায় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত পালটে যায়। রাজা ও রানি লন্ডনে বোমা হামলার সময় ভূগর্ভস্থ বাংকারে গিয়ে রাত কাটিয়েছেন। তবু লন্ডন ছাড়েননি। এবার হিটলারের ভি-রকেটের চাইতেও ভয়াবহ কোভিড-১৯-এর হামলায় সারা বিশ্বের সঙ্গে লন্ডনও যখন আক্রান্ত, তখন বিশ্বের আর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই, যেখানে এই রাজপরিবার আশ্রয় নিতে পারেন। অবশ্য নিরাপদ জায়গা থাকলেও তারা যেতেন না। বর্তমান রানি এলিজাবেথ (দ্বিতীয়) মনোবল খুবই দৃঢ়। করোনার ভয়াবহ প্রকোপের সময়েও তিনি জনগণকে তার ভাষণে আশার বাণী শুনিয়েছেন— ‘ইউ উইল মিট এগেইন’—আমাদের আবার দেখা হবে।

লন্ডনের অবস্থা এখন একটু ভালো। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু ভাইরাসের দাপট এখনো যায়নি। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক এবং সোশ্যাল আইসোলেশন এখনো বলবত্। আমাদের ধর্মশাস্ত্রে আছে, রোজ কেয়ামতের দিন হাশরের মাঠে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, বন্ধুবান্ধব কেউ কাউকে চিনবে না, চিনতে চাইবে না। কারণ, নিজেকে রক্ষা করার জন্য তারা এত ব্যস্ত থাকবে যে, আর কারো জন্য চিন্তা করা হবে অম্ভব। শুধু বলবে ইয়া নফিস ইয়া নফিস। আমাকে বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও।

নিজের জীবনকালে এই রোজ কেয়ামত বা ডে অব রেজারেকসনের আভাস নিজ চোখে দেখে যাব তা স্বপ্নেও ভাবিনি। করোনায় কেউ আক্রান্ত হলে ভাইবেরাদার কেউ কাছে যান না। মৃত্যু হলে তো কথাই নেই। নিঃসঙ্গ অন্তিম যাত্রা। করোনার ভয়ে স্বামী-স্ত্রী একত্র থাকেন না। এত বড় ব্রিটিশ সামাজিক রীতি শেক হ্যান্ড, হাগিং, প্রেমিক-প্রেমিকার চুমু খাওয়া (ব্যতিক্রম অবশ্য আছে), শিশুকে আদর করা সব উঠে গেছে। সবার মুখে না হলেও মনে একই আর্তি আমাকে বাঁচাও। সেই ইয়া নফিসর মতো। কেউ কারো দিকে তাকাতে চান না।

আজ থেকে কত দশক আগে জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে আজ কোনো সুখবর নেই।’ কবির কথাটা আজ দীর্ঘকাল পর পৃথিবীর জন্য কঠিন সত্য— ‘পৃথীবিতে আজ কোনো সুখবর নেই।’ সারা বিশ্বে আজ লাখ লাখ মানুষ মরছে। সুতরাং সুখবর কোথা থেকে আসবে? অনেকে বলছেন, ম্যালথাস থিয়োরি অনুসারে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানোর জন্য এই মহামারি। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশে এরশাদের আমলের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। এটা জেনেছিলাম ব্রিটেনের সাবেক থ্যাচার সরকারের মন্ত্রী এডউইনা কারির কাছে।

প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে বাংলাদেশ উড়িরচর এলাকায় এক ভয়াবহ ঝড় হয়। ওই এক রাতের ঝড়ে ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আর ঝড়ের তাণ্ডবে ধ্বংস ছিল অবর্ণনীয়। বাংলাদেশের এই বিপদের কথা শুনে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জয়াওয়ার্দনি, এমনকি পাকিস্তানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকও উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনের জন্য বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী এডউইনা কারিও ঢাকা সফর করেছিলেন। শাড়ি পরে পার্লামেন্ট ভবন ঘুরেছিলেন।

তিনি এত বিশাল পার্লামেন্ট ভবন দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। আর এক রাতে ঝড়ে ২ লাখ মানুষের মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত হয়েছিলেন। লন্ডনে পার্লামেন্ট হাউজের রেস্টুরেন্টে বসে এডউইনা কারি আমাকে এই গল্পটা (গল্প নয়, সত্য কাহিনী) বলেছিলেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদের সঙ্গে ব্রিটিশ মন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাত্ হয়েছিল। কারি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনার দেশে এই রাতের ঝড়ে ২ লাখ লোক মারা গেছে। আপনি কি উত্কণ্ঠিত নন? এরশাদ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন, ম্যাডাম, আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে এক রাতে ৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়, আমার উত্কণ্ঠিত হওয়ার কী আছে?

প্রেসিডেন্ট এরশাদের কাছে কারির দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট হাউজের চাইতেও আপনাদের পার্লামেন্ট হাউজ বড়। কেউ পথ না দেখালে এই হাউজে পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সে দেশে এত বড় পার্লামেন্ট হাউজের দরকার কী? এরশাদ এই প্রশ্নের জবাব দেননি। বাংলাদেশের জন্মহার সম্পর্কিত প্রশ্নটির জবাব দু-একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে সরকারিভাবে তা প্রত্যাহার করে নেয়।

বাংলাদেশে জন্মের হার সম্পর্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ যে মন্তব্য করেছিলেন, আজ তা পৃথিবীর মানুষের জন্মহারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ইউরোপে না হোক, এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত জন্মহারের জন্য করোনা বিশ্বে হয়তো মানুষের সংখ্যা কমাতে পারবে না, কিন্তু মানবতা ও মানব সভ্যতার জন্য এক বিরাট সংকট সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। শুধু একটি দেশ নয়, সারা বিশ্বের দেশগুলোই আজ শোক ও শঙ্কায় পীড়িত। তাদের সৃজনশীল মেধা ও প্রতিভা নিষ্ক্রিয়। শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীরই অনেক বরেণ্য মানুষের প্রাণ হরণ করেছে করোনা। তা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

পৃথিবীর দুটি বড় শক্তি আমেরিকা ও চীন করোনা নিয়ে পরস্পরের ওপর দোষারোপে ব্যস্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনার উত্স সম্পর্কে তদন্তে নেমেছেন। কিন্তু ঘোষণা করেছেন, চীনের যে উহান প্রদেশ থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে, সেই উহানের ল্যাবরেটরিগুলো তাদের তদন্তের আওতায় আনা হবে না। অন্য দিকে চীনও ঘোষণা করেছে, উহানে চীনের ল্যাবরেটরিগুলো নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক তদন্তে চীন রাজি নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সিদ্ধান্ত এবং চীনের একগুঁয়েমি কি মানুষের মনে এই সন্দেহই বাড়াবে না যে, চীনের উহান প্রদেশের কোনো ল্যাবরেটরি থেকেই এই ভয়াবহ ভাইরাস, যা পরমাণু অস্ত্রের চাইতেও ভয়াবহ, তা বিশ্বময় ছড়িয়েছে? আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেব তো এই সন্দেহটাই বিশ্ববাসীর মনে বিশ্বাসে পরিণত করে আগামী প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনেও কাজে লাগাতে চান। আমেরিকায় দ্বিতীয়বারের জন্য ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে সারা পৃথিবীর জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ।

তবে অপরাজেয় মানবতার জন্য সুখবর যে একেবারেই নেই তা নয়। করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন শিগিগরই বের হচ্ছে। বিজ্ঞানের কাছে আমাদের এজন্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, পৃথিবীতে মানবতার প্রতিটি দুর্যোগে বিজ্ঞানই তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে।

লন্ডন, ১৮ জুলাই, শনিবার, ২০২০

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত