বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

পশ্চিমবঙ্গে করোনা পরিস্থিতি হাতের বাইরে, মানছে প্রশাসনও

পশ্চিমবঙ্গে করোনা পরিস্থিতি হাতের বাইরে, মানছে প্রশাসনও
করোনা ভাইরাসের প্রতীকি ছবি। ছবি: ইত্তেফাক

পশ্চিমবঙ্গে কয়েক হাজার কোভিড শয্যা খালি, কিন্তু রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি না করতে পারার অভিযোগ তুলছেন অনেক রোগীর পরিবার। গত কয়েক দিনে এমন ঘটনাও হয়েছে, যেখানে করোনা রোগীকে নিয়ে তিন-চারটি হাসপাতালে ঘুরেও জায়গা না পাওয়ার ফলে মৃত্যু হয়েছে রোগীর। উত্তর চব্বিশ পরগনার বাসিন্দা ১৭ বছরের এক কিশোরের কয়েক দিন আগে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় তার পরিবার দুটি সরকারি এবং একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়েও ভর্তি করাতে পারেননি। এরই মধ্যে পরীক্ষা করে জানা যায়, তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। অবশেষে পুলিশের সহায়তায় যখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে নিয়ে আসা হয়, সেখানেও দীর্ঘক্ষণ তাকে ভর্তি করানো হয়নি বলে অভিযোগ করছে ঐ কিশোরের পরিবার। শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। কলকাতার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অফিসার সুদীপ দত্ত তার কয়েক জন করোনা আক্রান্ত সহকর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়েও অনেকটা একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংক কর্মচারীদের মধ্যে নিয়মিতই কোভিড সংক্রমণ হচ্ছে, আর সেসব সহকর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য আমাদের দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। একদিকে হাসপাতালগুলোতে যখন ‘বেড নেই’ অজুহাত দেখিয়ে রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রকাশিত দৈনিক বুলেটিনে দেখা গেছে, সারা রাজ্যে হাজার হাজার করোনা রোগীর জন্য সংরক্ষিত শয্যা খালি পড়ে আছে। সম্প্রতি যে বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীদের জন্য সংরক্ষিত ১০ হাজার ৮৩২টি শয্যার মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশতে রোগী ভর্তি আছেন।

সরকারি চিকিৎসক সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব হেল্থ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক ডা. মানস গুমটার ব্যাখ্যাও তেমনই। তিনি বলছিলেন, এই যে হিসাবটা দেওয়া হচ্ছে, সেটা গোটা রাজ্যের। বিভিন্ন জেলায় কোভিড হাসপাতালগুলোতে দেখবেন সংরক্ষিত শয্যা খালি পড়ে রয়েছে, যেখানে অত রোগীই নেই। কিন্তু শয্যা প্রয়োজন কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়ার এই জেলাগুলোতে।

ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, এর দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে। প্রথমত, সরকারি হাসপাতালের তুলনায় মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা করাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। আর দ্বিতীয়ত, মোট যত বেডের হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা গোটা রাজ্যের। কিন্তু সংক্রমণ তো বেশি হচ্ছে কলকাতা আর তার আশপাশের তিন-চারটি জেলায়। এখন এই অঞ্চলের রোগীকে নিয়ে তো দূরের জেলায় ভর্তি করা হবে না, তাকে তো এখানকারই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যেই বেড বাড়ানোর জন্য একটা নতুন পররিকল্পনা করেছিল। হাসপাতালে শয্যা না পেলেও সেখানকার চিকিত্সকদের দিয়ে বাড়িতে অথবা কোনো হোটেলে রেখে চিকিত্সা করার কথা ভেবেছিল তারা। কোভিডের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বামপন্থি ছাত্র-যুবরা বিক্ষোভও করছে পশ্চিমবঙ্গে।

দেশের চার রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি এম আর শাহ, বিচারপতি অশোক ভূষণ ও বিচারপতি সঞ্জয় কিষান কাউলের ডিভিশন স্পষ্ট জানিয়েছে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানা হচ্ছে না করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেহ সত্কারের গাইডলাইন। ঠিকমতো টেস্টিংও হচ্ছে না। এর পরই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারসহ মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নোটিশ পাঠিয়েছে।

করোনা টেস্টিং কম হওয়া নিয়েও একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা। মুম্বাইতে যেখানে দিনে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টেস্ট হচ্ছে, সেখানে দিল্লিতে কেন ৭ হাজারেরও কম টেস্ট হচ্ছে? প্রশ্ন তোলেন তারা। দিল্লিতে টেস্টিংয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কমে গিয়েছে, অবিলম্বে টেস্টিং বাড়ানোর নির্দেশ দেয় আদালত। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ, কোনো অজুহাতে কেউ যেন টেস্টিং করতে বাধা না দেয় বা টেস্টিংয়ে বাধা না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমণের ওপর সরকারের যে আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, গত বুধবার নবান্নে তা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মেনেই নিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অভয়বাণীও দিয়েছেন, আতঙ্কিত হবেন না।

মমতা এদিন বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যাটা আগামী কয়েক দিনে বাড়বে। কারণ আমরা টেস্টিংয়ের সংখ্যা বাড়াব। আগামী দুই মাসে করোনা আক্রান্তের সংখ্যাটা শিখরে পৌঁছবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই টেস্টিং ট্রেসিং আর ট্র্যাকিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছি আমরা।’

যদিও গত এপ্রিলে ঠিক উলটো তত্ত্ব খাড়া করেছিল সরকার। তখন পশ্চিমবঙ্গে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছিল, পরীক্ষার সংখ্যার সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যার তেমন সম্পর্ক নেই। পরে দেখা যায় পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লেও সেই হারে বাড়েনি আক্রান্তের সংখ্যা। এখন আবার উলটো গাইছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার দাবি, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে বাড়বে আক্রান্তের সংখ্যা। করোনা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সাহায্য চান তিনি। বলেন, এই লড়াই সরকারের একার নয়। সবাইকে লড়াইয়ে শামিল হতে হবে। সবচেয়ে বেশি চিন্তা বাড়াচ্ছে শহর কলকাতার পরিস্থিতি। যত দিন যাচ্ছে ততই সেখানে সংক্রমিতের সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই ৩০০ জন করে করোনা রোগীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে এই বর্ধিত সংক্রমণ রুখতে আরো কড়া লকডাউনের পথে হেঁটেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে জারি হওয়ার মধ্যে রয়েছে মালদহের তিনটি পুরসভা এলাকা। এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে এই লকডাউন। পরে আরো এক সপ্তাহ তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। মালদহের ইংরেজ বাজার, মালদা টাউন ও কালিয়াচকে লকডাউন জারি রয়েছে। এছাড়া উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলা এবং উত্তর ২৪ পরগনার বেশ কয়েকটি পুরসভা এলাকায় লকডাউন জারি করা হয়েছে। এসব জায়গায় খোলা রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দোকান, তবে অন্য সব পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে।

রাজ্য সরকারের তরফে জারি করা নয়া লকডাউন বিধিতে জানানো হয়েছে, নতুন কনটেনমেন্ট জোনে সব অফিস বন্ধ রাখা হবে। একই সঙ্গে জরুরি নয় এমন কার্যাবলিও বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে গণপরিবহনব্যবস্থা। সব শপিংমল, কারখানাও বন্ধ রাখতে হবে বলে জানানো হয়েছে নয়া নির্দেশিকায়। রাজ্য সরকারের তরফে আরো জানানো হয়েছে, নতুন কনটেনমেন্ট জোনগুলোতে কেউই অফিসে যেতে পারবেন না। এছাড়া কনটেনমেন্ট জোনগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থান আপাতত পুরোপুরি বন্ধ রাখা হবে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর এমেরিটাস বিজ্ঞানী ও এইমস-এর প্রাক্তন ডিন নরেন্দ্র কে মেহরা আবার জানাচ্ছেন, যতক্ষণ না কোভিডের প্রতিষেধক বা ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে বা হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ সংক্রমণ রুখতে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, দূরত্ববিধি মানাসহ যাবতীয় নিয়মকানুন নিয়মিত মেনে চলতে হবে। তার কথায়, ‘উপসর্গহীন ও অল্প উপসর্গ রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও সংক্রমণ বাড়তে থাকলে অনেকেরই হাসপাতালে ভর্তির পরিস্থিতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।’

যদিও গোষ্ঠী প্রতিরোধক্ষমতার পক্ষে ‘মাইক্রোবায়োলজিস্টস সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’র প্রেসিডেন্ট এ এম দেশমুখ বলছেন, ‘শুধু সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা নিয়ে হইচই করলে হবে না। সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যা এবং অত্যন্ত কম মৃত্যুহারের বিষয়টিও দেখতে হবে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে হার্ড ইমিউনিটি এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার অন্যতম পথ।’ মাইক্রোবায়োলজিস্ট তথা বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান রাজেশ কুমারেরও বক্তব্য, ‘গোষ্ঠী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে একটু সময় লাগলেও এই মুহূর্তে সেটিই হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সেরা বিকল্প পথ।’

গবেষকদের একাংশের অবশ্য বক্তব্য, গোষ্ঠী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির তত্ত্বটি আসলে জনমানসে ভয়ভ্রান্তি কাটানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে দেশের মৃত্যুহার কতটা কম, সেটাই অনেকে তুলে ধরছেন। হু-র রিপোর্ট উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকও যেমন জানিয়েছে, যেখানে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় ব্রিটেন, স্পেন, ইতালি, আমেরিকা ও জার্মানির মৃত্যুহার যথাক্রমে ৬৩.১৩, ৬০.৬, ৫৭.১৯, ৩৬.৩ এবং ২৭.৩২; সেখানে ভারতে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় মৃত্যুহার হলো ১; যার পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকদের সতর্কবার্তা, মৃত্যুহার কম বলে অবশ্য আত্মসন্তুষ্টির কোনো জায়গা নেই।

লেখক :ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত