বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

ভবিষ্যত অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় পল্লী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন

ভবিষ্যত অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় পল্লী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন
করোনা বিশ্ব ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ করে দিয়েছে যা পল্লী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে করা সম্ভব।

বর্তমান বিশ্বের এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর মতে দেশে ইতোমধ্যে দারিদ্র্যতার হার ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেশে বেকারত্বের হার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে এবং অনুমান করা যাচ্ছে ১৪ লক্ষ বাংলাদেশি অভিবাসী দেশে ফেরত এসেছে কিংবা ফেরার পথে। বাংলাদেশ ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তবে এই বিপর্যয়কে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে গ্রামীণ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক সঙ্কট থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রেক্ষাপটে বলেছেন, "করোনা বিশ্ব ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ করে দিয়েছে যা পল্লী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে করা সম্ভব"।

গ্রামাঞ্চলে অবস্থানরত সাধারণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মান উন্নয়নের প্রক্রিয়া হলো পল্লী উন্নয়ন। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও দেশকে তৃতীয় বিশ্বের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের খাতিরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পল্লী উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৮০ ভাগ মানুষই গ্রামে বাস করে। সুতরাং এই বিপুল পরিমান জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের ধারায় না এনে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রামাঞ্চলগুলোতে জীবিকা নির্বাহের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকার ফলে শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত চাপ লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে শহরগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বসবাস অযোগ্য বস্তি গড়ে উঠে যা সেখানে এবং আশপাশে অসাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। দেশের জনগণের এই অতিরিক্ত শহরকেন্দ্রিকতা যে কখনোই সুফল এনে দিতে পারে না তা বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে প্রমাণিত হয়েছে। গ্রামীণ সাস্থ্য পরিসংখ্যান (২০১৯) এর তথ্যানুসারে ৬৮.৮% মহিলা পারিবারিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য রাখতে শহরে গমন করে এবং ৮৫.৩% পুরুষ উচ্চ আয়ের আশায় শহরে কিংবা বিদেশে গমন করে। এদের বেশিরভাগই ঢাকায় (৬৮.১%) এবং চট্টগ্রামে (১৫.৭৭%)স্থিতিশীল হয়। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। করোনা ভাইরাসের মত এই ভয়াবহ মহামারীতেও দেখা যাচ্ছে টেস্ট, চিকিৎসা এবং এ সম্পর্কিত কার্যক্রম সম্পাদনে গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত জনগণকে অতিরিক্ত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। সাধারণ অবস্থাতেও উন্নত চিকিৎসা সেবা পেতে মানুষকে শহরের দিকে যেতে হয়। এছাড়া দেশের এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। পল্লী উন্নয়ন যেসকল বিষয়াদির কারণে বাধাগ্রস্হ হচ্ছে তার অন্যতম একটি হলো অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেশের আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুন্দর এবং সহজ করবার জন্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে এবং কিছু চলমান রয়েছে। তবে সমসাময়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় পল্লী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরায় গড়ে তুলতে কৃষি সবচাইতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। মহামারী পরবর্তী বিশ্বে টিকে থাকতে ক্ষুধা নিবারণ ও খাদ্যের নিশ্চয়তাকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিতে হবে। যেখানে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মূখ্য উপাদান কৃষি এবং দেশের মোট জিডিপির ১৪.১০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে, সেখানে সার্বিক অর্থনীতিতে কৃষির অবস্থান কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা এই সঙ্কটকালে প্রমানিত হচ্ছে। দেশের বিপুল পরিমাণ মানুষ কৃষিকে ঘিরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। শ্রমিক উন্নয়ন পরিসংখ্যান (২০১৬-১৭) এর তথ্যানুসারে গ্রামাঞ্চলের ৪১.২% মানুষই কৃষির সাথে জড়িত। তাছাড়া হস্তশিল্প, কুটিরশিল্পের মত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে। পরিসংখ্যান মতে হস্ত ও কুটির শিল্পে ১৪.১%, চাকুরী ও পণ্য বিক্রেতা হিসেবে ১৩.৫%, কারখানার শ্রমিক হিসেবে ৬.১% এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত আছে ০.২% মানুষ। গ্রামাঞ্চলে মানুষদের যথেষ্ট কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে দিতে হবে। কারণ এই বিপুল পরিমান জনগোষ্ঠীর জন্য উপরোক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যথেষ্ট নয়। সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে গ্রামাঞ্চলের মানুষদের নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করতে হবে।তবেই গ্রামাঞ্চলে মানুষেরা স্বাবলম্ভী হওয়ার সুযোগ পাবে যাতে করে বর্তমান ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব হারও হ্রাস পাবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে। বাংলাদেশ সরকারের সঠিক দিক নির্দেশনায় গত কয়েক দশকে শিক্ষা হার বিশেষত নারী শিক্ষা হার বৃদ্ধিতে সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নারীদের যোগদান বৃদ্ধি পেয়েছে যার ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন দ্রুত ত্বরান্বিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দেশি বিদেশি এনজিও পল্লী উন্নয়ন নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড এর ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া ব্রাক, আশা, প্রশিকার মত প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। বিগত শতকে পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু মডেল উদ্ভাবন করা হয়। ১৯০৪ সালের গ্রামীণ সমবায় ব্যাংক, ১৯৫৩ এর V-AID কর্মসূচি, ১৯৬০ এর দশকের কুমিল্লা মডেল ইত্যাদি। ড. আক্তার হামিদ খানের কুমিল্লা মডেল তৎকালে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং বিশ্বের সকল অনগ্রসর রাষ্ট্রের পল্লী উন্নয়নের জন্য আদর্শস্বরূপ। কুমিল্লা মডেল প্রধান যে ৪টি কর্মসূচি গ্রহণ করে তা হল; পল্লী পূর্ত কর্মসূচি, থানা সেচ কর্মসূচি, থানা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র এবং দ্বি-স্তর বিশিষ্ট সমবায়। তাছাড়া দারিদ্র্য বিমোচনে ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত গ্রামীণ ব্যাংক ভূমিহীন ও দরিদ্র নারীদের ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। তবে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড এর মতে উপরোক্ত কোনো মডেলই জনগণের মাঝে সেবা সুবিধা প্রদানে সমন্বিত কোনো কার্যক্রম অনুশীলন করেনি। ১৯৯০ এর দশকে বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ গবেষণার পর "লিংক মডেল" উদ্ভাবন করা হয় যা বর্তমানেও বিভিন্ন সময়কাল অনুযায়ী দেশের ৬৪টি জেলার ২০০টি উপজেলার ৬০০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এর আলোচ্যসূচি ২০৩০ এ বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের বেশ কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পল্লী অঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নসহ উক্ত আলোচ্যসূচিতে বিভিন্ন লক্ষ্য তুলে ধরা হয়। তাছাড়া আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আব্দুল কালাম কর্তৃক ধারণা প্রদত্ত জনপ্রিয় 'PURA' মডেল এর বিভিন্ন দিক অনুকরণ করতে পারি।

পল্লী উন্নয়নে বাংলাদেশের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অগ্রগতি প্রশংসার দাবি রাখলেও বেশ কিছু ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।পল্লী উন্নয়নে প্রধান একটি বাধা হলো দারিদ্র্যতা। উল্লেখ্য, দেশে দারিদ্র্য প্রবণ ১০টি জেলার মধ্যে ৫টিই রংপুর বিভাগে। সেখানের মানুষ অত্যন্ত গরীব এবং তাদের বেশিরভাগই পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত খাদ্য চাহিদা পূরণে অক্ষম। এসকল জেলার দারিদ্র্য বিমোচনে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন। তাছাড়া দূর্নীতি, সঠিক দিক নির্দেশনার অভাব, অদক্ষ নেতৃত্ব, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহের সাহায্য জনগণের নিকট না পৌঁছাবার দরুন সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। এসকল সমস্যার কার্যকরী সমাধান প্রয়োজন। দূর্নীতি রোধে সরকারের কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যদিকে তথ্য অনুযায়ী দেশের ২ কোটি ৬০ লক্ষ কৃষকদের মাঝে মাত্র ২৫% কৃষক পল্লীঋণ গ্রহণ করে এবং বাকী ৭৫% কৃষকই ঋণ আবেদনের পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে এ সুযোগ হতে বঞ্চিত হয়। এই সমস্যা সমাধানে গ্রামাঞ্চলে উক্ত বিষয়ে উপর্যুক্ত তথ্য সরবরাহ করে কৃষক ও বেকার যুবক-যুবতীদের ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত করা অতি জরুরি। এতে করে দেশের বর্তমান ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হার ও দারিদ্র্যতার হার হ্রাস পাবে। এদিকে ঋণগ্রহণকারী ৭৫% কৃষকের লাভের পরিবর্তে লোকসানের মুখে পরতে হয় যা তাদের ঋণ গ্রহণে অনুৎসাহিত করে তোলে। এক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ, কৃষিশিক্ষা ও সঠিক দিক নির্দেশনাই পারে এ সমস্যার সমাধান করতে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় পল্লী উন্নয়ন নিয়ে বিস্তর আলোচনা, সঠিক দিক নির্দেশনা, সুষ্ঠ সমাধান ও সকলের যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন। নীতি নির্ধারনের পূর্বে শুধুমাত্র পরিসংখ্যান ইত্যাদির দিকে না তাকিয়ে প্রকৃত অবস্থা পরিদর্শন যুক্তিসংগত। মহামারী পরবর্তী বিশ্বে পল্লী উন্নয়নে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন যে ভবিষ্যতের আরো এক বা একাধিক সঙ্কট মোকাবিলায় দেশ,জাতি ও অর্থনীতিকে রক্ষা করবে তা বলার আর অবকাশ নেই।

শিক্ষার্থী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ (প্রথম বর্ষ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত