বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

স্বপ্ন ছোঁয়ার পথে পদ্মা সেতু

স্বপ্ন ছোঁয়ার পথে পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু

একটি দেশের জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়নশীল এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নয়ন ও জ্ঞান-মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তনে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্গত একটি নদীমাতৃক দেশ। শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পদ্মা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান নদী। বিশ্বে আমাজন নদীর পরই দীর্ঘতম ও খরস্রোতা নদী হচ্ছে পদ্মা। এই নদীর গভীরতা ও স্রোতের প্রখরতা জয় করে শুরু হয়েছে সেতু নির্মাণের কাজ।

এটি হিমালয়ে উত্পন্ন গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী, যার সর্বোচ্চ গভীরতা ১ হাজার ৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট (২৯৫ মিটার) আর দৈর্ঘ্যে ১২০ কিলোমিটার। এই নদীর দুই পারে অনেক সুবিধাবঞ্চিত বিস্তীর্ণ জনপদ। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতু স্বপ্ন হয়ে ছিল এতদিন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে।

আর এই স্বপ্ন পূরণে পদ্মা নদীতেই নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের তথা দক্ষিণবঙ্গের স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

বাংলাদেশে অবকাঠামোর দিক থেকে এই প্রথম সেতু নির্মাণ হতে যাচ্ছে, যেখানে ওপরে সড়ক, নিচে রেল। এটি দক্ষিণ এশিয়ারও দীর্ঘতম সেতু, যার দৈর্ঘ্য হবে ৬.১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ হবে ১৮.১০ মিটার। অবস্থান হবে মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট (মুন্সীগঞ্জ-শরীয়তপুর)। নির্মাণ ব্যয় ২৯০ কোটি ডলার, উভয় প্রান্তে সংযোগ সড়কের দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার, নদী শাসন ১৪ কিলোমিটার, ভূমিকম্প সহনশীল মাত্রা রিখটার স্কেল ৯, সেতুর আয়ুষ্কাল হবে ১০০ বছর, লেন চারটি, পাইলসংখ্যা ২৬০, কাঠামো দ্বিতল, নির্মাণ দ্রব্য ইস্পাত সড়ক ভায়াডাক্ট ৩ দশমিক ১৪৮ কিলোমিটার, রেল ভায়াডাক্ট শূন্য দশমিক ৫৩২ কিলোমিটার। ভূমি অধিগ্রহণ হবে ১,১২৪ দশমিক ৭৭ হেক্টর। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে দেশব্যাপী উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য নিরসনের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পদ্মা সেতুতে সংযোজিত হবে সেতুর ২ কিলোমিটার ভাটিতে ৪০০ কেভিএ বিদ্যুত্ লাইন প্ল্যাটফরম, ৭৬০ মিলিমিটার ব্যাসের গ্যাস পাইপলাইন এবং ১৫০ মিলিমিটার ব্যাসের অপটিক্যাল ফাইবার টেলিফোন ডাক্ট। এ ছাড়া পদ্মা সেতু সার্ভিস এরিয়া-১-এ থাকবে টোল প্লাজা, পুলিশ স্টেশন, ওজন স্টেশন, আর সার্ভিস এরিয়া-২-এ ডুপ্লেক্স বাড়ি, মসজিদ, হোটেল, মেস, চিত্তবিনোদন ভবন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানির ট্যাংক, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন, অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ইত্যাদি।

পদ্মা একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী চাহিদা। প্রথম থেকেই পদ্মা সেতু নিয়ে বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র ছিল। বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের কেউ কেউ এই সেতু নির্মাণে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে বিশ্বব্যাংক প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ঋণ অনুমোদন করতে অস্বীকার করে। ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট একনেকের বৈঠকে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নির্মাণব্যয় সংশোধন করে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার টাকা ধরা হয়। এতে অর্থায়নের জন্য ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় চারটি দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে। এগুলো হলো দাতা চুক্তি স্বাক্ষর পরিমাণ (মার্কিন ডলারে) WB ২৮ এপ্রিল ২০১১ ১২০ কোটি, ADB ৬ জুন ২০১১ ৬২ কোটি, JICA ১৮ মে ২০১১ ৪০ কোটি, IDB ২৪ মে ২০১১ ১৪ কোটি মোট ২৩৬ কোটি (মার্কিন ডলার)। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। কিন্তু দাতাগোষ্ঠীগুলো পদ্মা সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৩ সালে ঋণ চুক্তি বাতিল করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ করছে। যদিও দুর্নীতির অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে কানাডিয়ান কোর্ট পরবর্তী সময়ে মামলাটি বাতিল করে দেয়। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বসবাস। মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট ও পাটুয়ারিয়া-দৌলতদিয়ার বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী নানান সংকটের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থার সংযোগ চালু হবে। দেশের দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দর মংলা ও চট্টগ্রাম। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বেনাপোল স্থলবন্দর ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে অধিক বাণিজ্যসুবিধা পাওয়া যাবে। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি পাবে। টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুত্ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। জাইকার সমীক্ষামতে, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন যাতায়াতে সক্ষম হবে আর ২০২৫ সালে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৬০০তে। দেশের ১ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে আঞ্চলিক জিডিপি বৃদ্ধি দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। দক্ষিণবঙ্গে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক বেড়ে যাবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অসামান্য অবকাঠামোগুলোর একটি। ধীরে ধীরে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই স্তরবিশিষ্ট পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রায় ৬৩ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এবং দক্ষিণ পশ্চিমের জনগণের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, আহ্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত