বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

নাগরিক মতামত

করোনার ঝাপটা: পেশাবদল, মধ্যবিত্তের সংকট

করোনার ঝাপটা: পেশাবদল, মধ্যবিত্তের সংকট
প্রতীকী ছবি

নিত্যদিন ফেসবুকে নানান কিছু লেখা হচ্ছে নোভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে। কয়েক দিন আগে রসিক একজন লিখেছিলেন, ‘করোনার কারণে বর্তমান বাংলাদেশের সমাজচিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। উচ্চবিত্ত এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। নিম্নবিত্তরা হাত পাতছে। আর মধ্যবিত্ত কী করছে? ঘনঘন সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছে।’

করোনার করাল থাবায় অর্থনীতির স্বাভাবিক চাকা আপন গতিতে ঘুরতে পারছে না। সচলতার পরিবর্তে প্রবল হয়ে উঠছে স্থবিরতা। অগুনতি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনিশ্চয়তার উত্কণ্ঠিত আঁধার ক্রমেই সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। শহরের বাসা গুটিয়ে দিশেহারা অনেক মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন ও হচ্ছেন। সেখানেও কি স্বস্তি, শান্তি ও বসবাসের নিশ্চয়তা আছে? রয়েছে কি কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা? এই প্রশ্নের সহজসরল উত্তর হচ্ছে না।

সরকারি চাকুরে ছাড়া অন্য পেশাজীবীদের জীবিকা এখন অনিশ্চিত। বেসরকারি অফিস প্রতিষ্ঠানে বেতনভাতা বন্ধ। কাজ করলেও মজুরি মিলছে না। পোশাক খাতের কর্মীরাও বরাবরের মতোই বঞ্চনার শিকার। অনেক কারখানা ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। আরো বন্ধ হবে। এই খাতের সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। যদিও পোশাক কারখানার মালিকরা সরকারি প্রণোদনার অর্থ পাচ্ছেন বা পাবেন। কিন্তু সেটা মেহনতি শ্রমিকদের কতটা অনুকূলে যাবে কিংবা যাচ্ছে, সেটা রীতিমতো ভাবার বিষয়। ভাবনা শুধু নয়, উদ্বেগেরও ব্যাপার। প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত কাজ হারাচ্ছেন। অনেকে স্বদেশে আটকা পড়ে আছেন। কবে ফিরে গিয়ে কাজে যোগ দিতে পারবেন, কারো সেটা জানানেই। মোদ্দা কথা হলো, কোথাও কোনো আশার আলো নেই। আভাসও নেই।

চাকরি হারা কেউ কেউ ভ্যানে করে সবজি বিক্রির কাজ নিয়েছেন। লাজ-লজ্জার ধার ধারলে না খেয়ে মরতে হবে। অতএব, দুই মুঠো অন্নের জন্য বেছে নিতে হয়েছে ফেরিওয়ালার জীবন। সাধ করে এই পথে কারো হাঁটবার কথা নয়। এই করোনাকালে কেউ-বা মোটরবাইকে করে পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার কাজ নিয়েছেন। হোটেল-রেস্তোরাঁও বেশ কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। পেশা বদলের সময় চলছে এখন।

এক তরুণী বিদ্যুৎ প্রকৌশলীর কথা জানি। বাড়ি থেকে অনলাইনে তিনি মাস দুয়েক কষ্টেসৃষ্টে অফিসের কাজকর্ম চালিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু হায়! আখেরে সুবিধা হয়নি মোটেও। বেতন মেলেনি। অর্ধেকও না। অগত্যা ছোট ভাইকে নিয়ে অনলাইনে তৈরি খাবার সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। অস্তিত্বের সংগ্রাম বলে কথা। টিকে থাকতে তো হবে। জীবনযুদ্ধে হার মানলে চলবে কেন? বাড়িভাড়া বাকি পড়েছে অনেকের। টু-লেট বাড়ছে। অনেক বাড়িওয়ালার মাথায় হাত! বাড়িভাড়া দিতে না পারা ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালা অনেকেই কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির। দ্বিধা, লজ্জা ও সংকোচ তাদের ক্রমবর্ধমান দুর্দশা ও বিড়ম্বনার কারণ। তারা কার কাছে হাত পাতবেন? মহামূল্য আত্মসম্মান কীভাবে বিকিয়ে দেবেন? অবলীলায় এই কাজ করা তো সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে প্রকাশ, নানান সেক্টরে কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৮২ লাখ। করোনা ভাইরাসের বিষাক্ত ছোবলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক ও আশঙ্কার, তা সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত কর্মহীন লোকের সংখ্যা ১৪ লাখ। এই সংকট শুধু দুর্ভাগা বাংলাদেশেরই নয়, গোটা বিশ্বেরই। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলওর সর্বশেষ রিপোর্টে যে তথ্য মিলেছে তা-ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। আইএলও বলেছে, করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় প্রবাহের জেরে বিশ্বব্যাপী ৩৪ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। বিপর্যস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের নামও।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, করোনা-অভিসম্পাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। সংকটাপন্ন হয়েছেন ক্ষুদ্রব্যবসায়ী সম্প্রদায়, যারা হারিয়েছেন মূলধন। কাজ হারিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন বেসরকারি খাতের লাখলাখ মানুষ। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচাল সেলিম রায়হানের অভিমত—‘সেবাজনিত পেশায় মন্দো চলছে বেশি। বেচাকেনা হচ্ছে না ছোটখাটো দোকানপাটে। ঢাকামুখী অনেক মানুষ সহায়সম্বল বিক্রি করে এসেছিলেন। পেশা হারিয়ে সেই গ্রামে ফিরে যাওয়ার তো অবস্থা আর নেই তাদের। তারা হয়তো গ্রামে ফিরে গিয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হওয়ার চেষ্টা চরিত্র করবেন। অনেকে পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখেই শহরে থাকছিলেন। সব মিলিয়ে গ্রামাঞ্চলের শ্রমবাজারে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। শ্রমের মূল্যও কমে যেতে পারে।’

করোনাকালে উদ্ভূত জটিল এবং অভূতপূর্ব এই পরিস্থিতিতে মহাসংকটে পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। হতদরিদ্র মানুষজন সরকার ও বিত্তবান শ্রেণির কাছ থেকে দান, সাহায্য, সহায়তা পেয়ে থাকেন। কিন্তু খাদে পড়া অসহায় মধ্যবিত্ত সমাজকে কে দেবে সহায়তা? মুখ বুজে পড়ে পড়ে মার খাওয়া ছাড়া তাদের গত্যন্তর কী? সামগ্রিক বিচারে মধ্যবিত্তের অবস্থা ইদানীং বড়ই সঙ্গিন।

যতই বাড়ছে করোনা-সংক্রমণের ব্যাপকতা, মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ তত প্রবল ও দুর্বিষহ হচ্ছে। কবে কখন যে এই অসহনীয় অধ্যায়ের অবসান হবে, তা কারো জানা নেই। ফলে মধ্যবিত্তের সংকট সমস্যার সমাধান হওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। রূঢ় এই বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি টিকে থাকবে কী করে? জটিল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। মধ্যবিত্তদের অস্তিত রক্ষার জন্য তাদেরও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই অভিমত বিশেষজ্ঞ মহলের। এক্ষেত্রে সরকারকেই যে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে, সে কথা বলা বাহুল্য। আমরা আশাবাদী যে, সরকার তাদের ঈপ্সিত ভূমিকা ও দায়দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করবে।

ব্র্যাকের যে গবেষণা, তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি—করোনার কারণে চাকরিচ্যুত হয়েছে শতকরা ৩৬ জন। তিন শতাংশ মানুষের চাকরি থাকা সত্ত্বেও তারা বেতন-ভাতা পান না। এই যে ভুক্তভোগী মানুষজন, এদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাহলে সংকট উত্তরণের কী উপায়? এমনটাই কী চলতে থাকবে? নিশ্চয়ই না। সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ সতর্কতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ সুকঠিন, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দায়-কর্তব্য এড়ানোরও কোনো রাস্তা খোলা নেই সরকারের সামনে।

কয়েক লাখ প্রবাসী কাজ হারিয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে এর মন্দ প্রভাব পড়বেই। সামাজিক বাস্তবতা, অর্থকষ্ট ও দুশ্চি ন্তায় মধ্যবিত্তসমাজ অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘোরপাক খাচ্ছে। জীবনমান নেমে যাচ্ছে। সংসারের নানা খাতে নির্মমভাবে খরচাদি হ্রাস করতে হচ্ছে। তাও রক্ষা নেই। মানবেতর পর্যায়ে জীবনযাপন করে কোনোমতে টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা পর্যুদস্ত। নিরুপায় হয়ে অনেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানেও কী সর্বগ্রাসী অভাব-আকাল তাদের পিছু নিচ্ছে না? গ্রামাঞ্চলে কাজ মিলবে কতখানি? গ্রামে চলে যাওয়ার তে সুযোগ বা অবস্থাও কিন্তু সবার নেই। এক হিসাবে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। তাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্তশ্রেণির পর্যায়ভুক্ত। আয় রোজগার যখন মোটেও ন্যূনতম সন্তোষজনক অবস্থায় নেই, তখন বাড়িভাড়ার জোগান কীভাবে দেওয়া সম্ভব?

করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই বর্তমান সময়ের ১ নম্বর এজেন্ডা। এটা জাতীয় দুর্যোগ। এই পরিস্থিতি কোনোমতে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে, যথাসম্ভব সামাল দিতে পারলে আবার অর্থনীতি পুরোটা নাহলেও বেশখানিকটা চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তখন আবার কাজ মিলবে। অনিশ্চয়তার অন্ধকার ধীরে ধীরে দূরীভূত হতে থাকবে। মধ্যবিত্ত সমাজ আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। সেজন্য করোনা নিয়ন্ত্রণ কর্মকৌশলে সাফল্য অর্জন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এক্ষণে। সুতরাং কোনো ধরনের দোদুল্যমানতা বা দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য ও বাঞ্ছনীয় নয়। এই সময় পরিধিতে মধ্যবিত্তের জন্য সাময়িক কিছু প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে সরকারকে সিরিয়াসলি চিন্তাভাবনা করতে হবে। সেটা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল।

লেখক : গবেষক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত