বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

ভালো মানুষ সৃষ্টির শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন

ভালো মানুষ সৃষ্টির শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন
মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ।ছবি: সংগৃহীত

আমাদের শিক্ষার একাল-সেকাল, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক উন্নয়ন, সংকট, শিক্ষা, দুর্নীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে উপর কথা বলেছেন তরুণ শিক্ষাবিদ ও এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রধান নির্বাহী ও হেড অব স্কুল মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ। কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, এমনকি বর্তমান নেতৃত্ব প্রসঙ্গেও।

তার মতে, আমরা বাঙালি জাতি এখন সুবর্ণ রেখায় স্বর্ণালি সময় পার করছি। দেশ এখন যথাযথ নেতৃত্বের ভেতর দিয়েই যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর দীর্ঘ সময় আমরা অন্ধকারে ছিলাম, দেশ উল্টো রথের চাকায় চলছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেওয়ার পর, তিনি বিরোধী দলেই থাকুন আর ক্ষমতায় থাকুন, আমরা সঠিক নেতৃত্ব পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ তথা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নপূরণে আমরা কাজ করার প্রয়াস পাচ্ছি। কিন্তু কিছু অনিয়ম, দুর্নীতি তো রয়েছেই; যে কারণে আমরা বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকি। তবে বাঙালি পরিশ্রমী জাতি, সাধারণ মানুষ কষ্টসহিষ্ণু, বিপরীতে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের অন্যায়-দুর্নীতি আমাদের আটকে রাখতে পারবে না। আমরা এগিয়ে যাবই। আর এ জন্যই আমাদের বন্ধবন্ধুর দেখিয়ে যাওয়া পথ অনুসরণ করতে হবে। তার আদর্শকে লালন করতে হবে। তবেই আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারব, সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

শিক্ষা ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শের কথা আমরা জানি বা বলে থাকি, বর্তমান আওয়ামী লীগের হাতে তার সেই আদর্শ কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছ এর উত্তর আওয়ামী লীগের নেতারাই ভালো দিতে পারবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে পিতার অনেক কিছুই বাস্তবায়নে সচেষ্ট। যেমন— স্কুলগুলোতে মিড ডে চালু করা, প্রাইমারি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নির্ধারণ করা। এগুলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু তিনি তা করে যেতে পারেননি। কন্যা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন ও আদর্শগুলোকেই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদেরও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করতে হবে। আমাদের জাতীয়তা বোধে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না। এই পদ্ধতি আরো আগে চালু করা উচিত ছিল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেই গলদ রয়েছে। এখন চলছে জিপিএ-৫ পাওয়ার শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে না আমাদের ছেলেমেয়েরা। বঙ্গবন্ধু যেটি চেয়েছিলেন। তিনি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের শিক্ষা রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই আমরা তাকে হত্যা করলাম। ওই রিপোর্টে ছিল কি? অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হবে। প্রাইমারি পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা হবে। যেখানে শিশু শিক্ষার্থীরা বাংলাভাষা জানবে, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিখবে, খেলাধুলার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করবে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেকে গড়ে তোলার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাও গ্রহণ করবে। বর্তমানে ওই শিক্ষাব্যবস্থাকেই ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। আগে আমরা যখন পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় মুরুব্বিদের সালাম করতাম, তারা বলতেন ‘মানুষের মত মানুষ হও’। এখনকার অভিভাবকরা বলেন, ‘পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া চাই’। আমাদের এখন ভালো মানুষ সৃষ্টির শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যারা ভালো মানুষ তৈরি করবে, সেই স্কুলের শিক্ষকদেরই তো মান-মর্যাদা আমরা রাখিনি। না আছে তাদের সামাজিক মর্যাদা, না আছে আর্থিক নিরাপত্তা। একটা পরিবারে যদি কয়েকটা ছেলে থাকে, তার কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা থাকলে, আর একটি যদি স্কুল শিক্ষক হয়; তার পরিচয়ও আমরা দিতে চাই না। বলি ও আছে আপাতত একটা স্কুলে, চেষ্টা করছে অন্য কিছু করার। আমাদের এই মানসিকতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই স্কুল শিক্ষকের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা আমরা ভালো মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হব।

শিক্ষা ব্যবস্থায় ভিন্ন ধারা প্রবর্তন করে আপনি ইতিমধ্যেই অনেক মানুষকে আশাবাদী করছেন, অনেকেই আপনার পরিবর্তনের এই পথচলাকে প্রায়ত মেয়র আনিসুল হকের সাথে তুলনায় দেখা যায়, এই শহরের সবচেয়ে সুন্দর মানুষ৷ নামের মিল নিয়ে অনেকেই মজা করেছে৷ ছোটবেলায় যে দু-তিনজন মানুষের উপস্থাপনা দেখে আমার চোখ আটকে যেত তারমধ্যে আনিসুল হক ছিলেন অন্যতম। তিনি আমার চলার পথের আইডল বলতে পারেন। নিঃসংকোচে বলতে পারি, বাংলাদেশের আরও অনেক কিছু পাওয়ার ছিল মেয়র আনিসুল হকের কাছ থেকে৷ একজন বিবেকবান, অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি৷ তার কাছ থেকে দেখে শিখেছি, স্বপ্ন কীভাবে দেখতে হয়, স্বপ্নগুলোকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দিতে হয়, কীভাবে লালন করতে হয়, অদম্য ইচ্ছা শক্তি দিয়ে জীবনকে জয় করা মানুষটা সত্যিই একটা সার্থক মানুষ৷ বাংলাদেশের মানুষের মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে তাঁর অনিন্দ্য সুন্দর মুখচ্ছবি৷ সত্যি সত্যি সফল হতে হলে একজন আনিসুল হক হতে হবে।

শিক্ষকরা কখনো বিচারকের মতো আচরণ করবেন না। তাঁদের হতে হবে বন্ধুর মতো। শিক্ষককে ধৈর্যশীল ও স্নেহশীল হতে হবে। শিক্ষককে আস্থা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মন জয় করতে হবে। এটা না হলে তিনি আর শিক্ষক থাকবেন না। একজন শিক্ষক হওয়া মাত্রই তাঁকে জানতে হবে, তাঁর টাকা-পয়সা বেশি হবে না। শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, ভালোবাসতে হবে। যেকোনো সমস্যা আদরের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। এ ছাড়া কাউকে অপমান করার অধিকার কোনো শিক্ষকের নেই। একটা স্কুল হচ্ছে একটা বাচ্চার সেকেন্ড হোম। এখানে এসে যদি একজন শিক্ষার্থী শাস্তি পায় তাহলে সে তার ভুবনটা হারাবে।

দিন দিন শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, শিক্ষার হারের সঙ্গে শিক্ষার মানও এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা উদারনৈতিক নয়, তারাই মূলত এই প্রশ্নগুলো তুলছেন। বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি বোঝেন ও অনেক বেশি জানেন, এ ব্যাপারে কারও কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। সময় যতই সামনের দিকে গড়াচ্ছে গোটা বিশ্ব ততই ছোট হয়ে আসছে। সুতরাং গোটা বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের আরও বেশি পুঙ্খানুপঙ্খরূপে ধারণা রাখতে হবে। আমাদের জানতে ও বুঝতে হবে বিশ্বের কোথায়, কখন, কী ঘটছে। জাতির বিবেককে জাগ্রত করতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শিক্ষক, ব্যবসায়ী, তরুণসমাজের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তার এ বক্তব্যকে আমি স্বাগত জানাই। দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বিষয়গুলো তার নজরে এসেছে। তিনি মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে বলেছেন। কতিপয় শিক্ষকের অশিক্ষকসুলভ আচরণের দায় পুরো শিক্ষকসমাজকে নিতে হচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থের ওপরে দেশের স্বার্থ। এই সত্য শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষকে অনুধাবন করতে হবে। ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ করতে হবে। নিজের স্বার্থ উদ্ধারে শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশাকে কলঙ্কিত করা যাবে না।

দেশে অনেকেই ই-লার্নিং বলতে ইন্টারনেটের শিক্ষা পদ্ধতিকেই বুঝে থাকে। বিষয়টি অনেকের মধ্যে দেখেছি। এটি পুরোপুরি ঠিক নয়। শুধুমাত্র জুম, গুগল ক্লাসরুম, ইউটিউব এই জনপ্রিয় মাধ্যম গুলিই ই-লার্নিং নয়, সমস্ত ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তিই ই-লার্নিংয়ে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল, সিডিরমসহ নানা ডিভাইস হতে পারে এর মাধ্যম।

আমি ধরে নিচ্ছি আমাদের মানসিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটছে। তাহলে প্রথমেই উচিত হবে অনলাইন বা ই-লার্নিংয়ের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান রেখে ভিন্ন স্ট্যার্ন্ডাডের শিক্ষার্থীদের জন্য কনটেন্ট তৈরি করা। প্রয়োজন ভাচুর্য়াল শিক্ষার ব্লেন্ডেড লার্নিং, মিক্সড মোড টেকনোলজির প্রয়োগ।

আগামীর বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। শুরুতেই বলেছি বাঙালি কষ্টসহিষ্ণু। বিদেশেও আমরা ভালো করছি। কিছু অসৎ লোকের জন্য হচ্ছে না। কিন্তু তা বাধা হতে পারবে না। এই ক্ষেত্রে সকলের কাজ হওয়া উচিত সৎ ও অসতের পার্থক্য নিরূপণ করা এবং নিজেকে নিজে সঠিক বিচার করা। সাধারণ মানুষ সব কিছু জানবে, বুঝবে আর আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ সুখী, সমৃদ্ধশালী হবে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত