বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

নাগরিকমত

মহামারি কিংবা দুর্যোগ রুখতে চাই পরিকল্পিত নগরায়ন

মহামারি কিংবা দুর্যোগ রুখতে চাই পরিকল্পিত নগরায়ন
মহামারি কিংবা দুর্যোগ রুখতে চাই পরিকল্পিত নগরায়ন

মহামারি কিংবা দুর্যোগ এই পৃথিবীতে মানবজাতির কাছে নতুন কিছু নয়। সৃষ্টির শুরু থেকেই সময়ে সময়ে এই পৃথিবীতে নেমে আসে অনেক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারি। কোনো সংক্রামক রোগ যখন বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মাঝে খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়ে পড়ে; তখন বলা হয় রোগটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারির ঘটনা ঘটেছে এবং এসব মহামারিতে মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের।

এসব মহামারির মধ্যে প্লেগ আর ফ্লুর নামই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, নানা কারণে একটি ছোট অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঘটা রোগ ছড়িয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তখন এ মহামারি রূপ নেয় প্যান্ডেমিক বা বিশ্বমারিতে। মানুষ খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে অসংখ্যবার মহামারির মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক মহামারিও হয়েছে কয়েকবার। এখনকার সময়ের চেয়ে অনেক কম বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ছিল তখন। প্রতিষেধক বা চিকিৎসাও তেমন পায়নি আক্রান্ত মানুষ। তবে অনেক ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার জন্য সচেতন ও সতর্ক থেকেছে। এভাবে একটি বর্ম তৈরি করে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে মানুষ।

বাংলায় ষোলো শতক থেকেই অনেকবার মহামারির মুখোমুখি হতে হয়েছে বাঙালিকে। প্রতিবারই লক্ষাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। তবু হার মানেনি মানুষ। হার মেনেছে মহামারি।

মধ্যযুগের ইতিহাস লেখক আবুল কাশিম ফিরিস্তার বর্ণনায় জানা যায়, ১৫৪৮ সালে বিহারে ভয়ানক প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্লেগ অনেক প্রাচীন রোগ। বাংলায় প্লেগ ও কলেরা ভয়াবহ মহামারি হিসেবে কয়েকবারই দেখা দিয়েছে। ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আফগান সুলতানদের শাসন ছিল। এ সময় রাজধানী গৌড়ে প্লেগ রোগ দেখা দেয়। প্লেগের ধরন অনেকটা করোনার মতোই। জ্বর, মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি এবং ভীষণ ছোঁয়াচে; কিন্তু চিকিৎসা তেমন না থাকায় অসংখ্য মানুষ মারা যায়।

আরেক প্রাণঘাতী মহামারি ছিল কলেরা। ১৮১৭ সালে এ মহামারির প্রাদুর্ভাব প্রথম দেখা দেয়। কলকাতা থেকে কলেরা ছড়ানো শুরু হয়। ক্রমে তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, চীন প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮১৭ সালে শুরু হওয়া কলেরা মহামারি ১৮২৪ পর্যন্ত কম-বেশি এর দাপট নিয়ে অব্যাহত থাকে। এরপর একই সময়ে না হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে কলেরা বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হয়। ১৮১৭ সালের কলেরায় ঢাকায় প্রতিদিন দেড়শ থেকে দু’শ মানুষ মৃত্যুবরণ করত।

পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে আছে বাংলাদেশ। প্রকৃতির বিরূপ মনোভাবের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে এবং দেশটির সার্বিক উন্নয়ন তৎপরতাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। কখনও কখনও প্রলয়ঙ্করী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আবার কখনও খরার কবলে পড়েছে দেশ। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে প্রাণ থেকে সম্পদহানি ঘটছে বছর বছর। এটা শুধু দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় না, পরিবেশের বিপুল ক্ষতি করে। এমনকি এই বছরও বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনা ভাইরাসজনিত সঙ্কট কাটিয়ে উঠার আগেই বাংলাদেশের উপকূল এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাম্প্রতিক সময়ের দুর্যোগ শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষ। ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি ও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে উপকূলের সমাজ ব্যবস্থা।

পরিকল্পিত নগর বলতে পরিকল্পিত জনবসতিকেই বোঝায়। অর্থাৎ সার্বিক দিক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে নগরের সবকিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। পরিকল্পনা মাফিক হবে রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, অফিস-আদালত, অনাবাসিক স্থানে, খেলার মাঠ, বিনোদন কেন্দ্রসহ সব কিছুই। এসব হলে নগরের মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। নাগরিক জীবনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে এবং জীবনযাত্রা হবে মর্যাদাপূর্ণ, উন্নততর এবং স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ঢাকায় ক্রমবর্ধমান নগরমুখীতা এবং দ্রুত নগরায়নের সাথে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠছে না। ফলে নাগরিক সুবিধার অসম বণ্টন এবং চরম বৈষম্যমূলক নীতি প্রণয়নসহ অবকাঠামো কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জীবনযাত্রা এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত থাকছে।

সব শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, মানুষের জন্য বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগর তাই ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। এভাবেই দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে জনসংখ্যার আধিক্য ও যত্রতত্র কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দালানকোঠা গড়ে ওঠার পাশাপাশি রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব, মানসিক ও স্নায়ুবিক চাপ বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সঙ্কট, পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা, পরিবেশ ও বায়ুদূষণ ইত্যাদি অব্যাহতভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবার ওপর। এমন অভিযোগ তুলেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নগরীতে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের বিস্তার বহুগুণে বেড়ে গেছে। এমনকি সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে অপরিকল্পিত নগরায়ন।

পাশাপাশি আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর মনে করেন, ঘনবসতির কারণে রাজধানীতে করোনা রোগী বেশি। তিনি বলেন, ‘ঢাকার মতো জনবহুল, ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিত নগরে খুব সহজেই মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সুবিধা দেশের অন্য অন্য জায়গার তুলনায় ঢাকায় বেশি, সেটিও একটি কারণ। এছাড়াও ঢাকার হাসপাতালগুলোর মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। অর্থাৎ করোনা ভাইরাস ক্রমেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং কার্যকরী নগর স্বাস্থ্য ব্যহত করার জন্য অনেকাংশেই অপরিকল্পিত নগরায়নই দায়ী। তাই মহামারি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় পরিকল্পিত ঢাকা নগরী গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’

স্মার্ট সিটি বলতে এমন একটি আধুনিক শহরকে বুঝায় যা নগরের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবহার করে। সুতরাং সহজ ভাষায় বলতে স্মার্ট সিটি হচ্ছে টেকসই পরিকল্পনা, নির্মাণ, পরিচালনা ও সেবার একটি নতুন ধারণা ও পদ্ধতি যা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেটের তথ্যাবলী (আইওটি), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ভৌগলিক তথ্য (জিআইএস) ব্যবহার করে শহরের নাগরিকদের উন্নত সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। একটি স্মার্ট শহর কেমন হবে সেটা সেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ধারা, জনগণের পরিবর্তন করার ইচ্ছা, শহরে বসবাসকারীদের সম্পদ ও আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করে। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি স্মার্ট নগরী অবশ্যই আমেরিকা, জাপান বা ইউরোপের যেকোনো স্মার্ট নগরী থেকে ভিন্ন হবে।

বাংলাদেশের শহরগুলো খুব দ্রুত, কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ শহরে বসবাস করে। ২০৪০ সালের ভেতরে দেশের শতকরা ৫০ ভাগ মানুষ শহরে বসবাস করবে। সঠিক পরিকল্পিত নগরায়ন না হলে ভয়াবহ পরিবেশ ঝুঁকি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখন থেকে শহরগুলোকে স্মার্ট শহরে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তুলতে হবে। প্রায় ১০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর দেশে স্মার্ট সিটির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা নিশ্চিত করতে স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নের ওপর বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে তারা বলছেন, এর সুফল পেতে প্রযুক্তির সমতা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। স্মার্ট সিটি ঠিকমতো পরিচালনা করতে হলে স্মার্ট গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা প্রয়োজন। আর স্মার্ট গভর্ন্যন্স করতে হলে দরকার জেলা সরকার অর্থাৎ ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, অতিদ্রুত ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার আর এর মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা যাবে স্মার্ট সিটি।

ঢাকার প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সত্যিকার অর্থে দুটি লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করবে। প্রথমটি হলো রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ, অর্থাৎ সরকার জনগণের দোরগোড়া পর্যন্ত সেবাকে প্রসারিত করতে পারবে। জনগণকে সেবা পেতে আর রাজধানী পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না, অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে না। আর দ্বিতীয়টি হলো ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করে একটি সুন্দর অত্যাধুনিক রাজধানী শহর হিসেবে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করা। এই শহরকে নিয়ে কর্তৃপক্ষকে বর্তমানে যেভাবে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে তা থেকে তারাও রেহাই পাবে। ঢাকার জনগণের মধ্যে স্বস্তি ও প্রশান্তি ফিরে আসবে, সাশ্রয় হবে সময়ের আর অর্থের।

মহামারি কিংবা দুর্যোগ মোকাবেলায় অপরিকল্পিত শহরগুলোকে স্মার্ট শহরে রূপান্তর করতে চাইলে এখন থেকেই জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে, সামাজিক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি একটি সুন্দর ও আধুনিক শহর গড়ে তুলতে সকলকে সচেষ্ট হতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব শহরকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করতে হবে এবং পাশাপাশি স্মার্ট গভর্ন্যন্স গড়ে তুলতে অতিদ্রুত ঢাকাকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। যেহেতু, পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে দেশের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ে অভিজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদগন। তাই নগরীর সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে অতিদ্রুত পর্যাপ্ত সংখ্যক নগর পরিকল্পনাবিদ পদ সৃষ্টি করে, অতিসত্বর নিয়োগ প্রদান করার মাধ্যমে পরিকল্পিত নগর গঠন করে দুর্যোগ ও মহামারি প্রতিরোধে এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক-

সহকারী অধ্যাপক,

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা,

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত