বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

নাগরিকমত

সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই

সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই
সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই।প্রতিকী ছবি: ইত্তেফাক

সম্প্রতি দেশজুড়ে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দফতর থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। সেখানে পুলিশকে টার্গেট করে বা পুলিশ স্থাপনায় হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড, নাশকতা ও ধ্বংসাত্মকমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আদলে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা। গতকাল বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে চার পুলিশ সদস্যসহ একজন সিভিলিয়ান আহত হয়েছেন।

সন্ত্রাসী এই হামলায় দেশে বিরাজ করছে আতঙ্ক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ এসব সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই আমরা নৈরাজ্যকর কোনো না কোনো খবর মিডিয়ার সুবাদে পেয়ে থাকি। বর্তমান সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হলো জঙ্গিবাদ। উগ্রপন্থায় সংঘবদ্ধভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করার নামই জঙ্গিবাদ। মূলত যারা এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের কোন ধর্ম নেই। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের যে অপ্রতিরোধ্য বিস্তার ঘটছে, তাতে এটি সর্বাপেক্ষা বড় ‘আতঙ্কে’ পরিণত হয়েছে। করোনার এ সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্বশান্তি ও ইসলামের ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি হয়ে উঠেছে।

‘ইসলামের নামে সন্ত্রাস’ সৃষ্টি ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তেরই ফসল। কোরআনের কিছু আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে জিহাদের নামে সন্ত্রাস বৈধ করার অপচেষ্টা করছে তারা। বিশেষত আধুনিক তরুণ যাদের অধিকাংশই ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের মধ্যে ইসলামের বিকৃত ধারণা দিয়ে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করছে।

অথচ ইসলাম শান্তির ধর্ম আর ইসলামের উত্তম আদর্শে মুগ্ধ হয়েই যুগে যুগে মানুষ ইসলামে আকৃষ্ট হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফের ময়দানে অমুসলিমদের নির্যাতনে রক্তাক্ত অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললেও তাদের প্রত্যাঘাত করার কথা ভাবেননি। ইসলাম প্রচারের পদ্ধতি সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ হল- ‘আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে আহ্বান করুন জ্ঞানগর্ভ কথা ও উত্তম উপদেশগুলোর দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করুন’ (সুরা নহল, আয়াত: ১২৫)।

এমন উন্নত আদর্শ থাকা সত্ত্বেও ধর্মের নামে অনেকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে আর বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। আমাদেরকে দেখতে হবে এসব সন্ত্রাসী সংগঠন কিভাবে গড়ে উঠল, কীভাবে এত শক্তিশালী হয়ে উঠল এবং তাদেরকে কারা দাঁড় করিয়েছে আর এর পেছনে মূল কারণই বা কি?

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদ ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির ত্রাণ বিতরণ

আমরা দেখতে পাই আইএসের উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ইরাকে সাদ্দামের পতন। এছাড়া আইএসের উত্থানের পেছনে নিজেদের পরোক্ষ ভূমিকার কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্দেশে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অভিযানের সময়ই সশস্ত্র গোষ্ঠী আইএসের উদ্ভব হয়েছে। এর আগে নোয়াম চমস্কিসহ বেশ কিছু মার্কিন বুদ্ধিজীবী একই যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। মার্কিন অভিযানের অজুহাত হিসেবে বলা হয়েছিল, ইরাকে রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ রয়েছে। কিন্তু ইরাকে সাদ্দামের পতনের পর এ ধরনের রাসায়নিক অস্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায়নি। আল-কায়েদা থেকেই আইএসের উত্থান।

২০০৩ সালে হামলা চালালে সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটে। ইরাক দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী। পরবর্তীতে বিশ্লেষকরা দেখেছেন, সাদ্দাম পতন ও ইরাক দখল করতে গিয়ে আল-কায়েদাকে ব্যাপক অস্ত্র ও ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালে সালাফি জিহাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে সুন্নি নেতাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। স্থানীয় উপজাতি এবং আমেরিকানদের মধ্যে সহযোগিতার কারণে ইরাকে অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে আইএসের হাতে আসে উন্নত অস্ত্র। আর্থিক ভিত্তিও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আসলে আইএসের শীর্ষ নেতা ছিল মোসাদের অনুচর। মার্কিন প্রচারমাধ্যম এবিসি নিউজ ও সিএনএনে প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের সিনিয়র সিনেটর ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জন ম্যাক কেইনের সঙ্গে বাগদাদির বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়। তেমনই এক বৈঠকের ভিডিও স্নাপশটে প্রমাণ মিলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ইন্টারনেট রেডিও আজিয়াল ডটকম, সোশিও-ইকোনমিক হিস্ট্রি, গ্লোবাল রিসার্চ, এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা আমেরিকার গোপনীয় নথি, পলিটিসাইট ডটকমে আইএসের শীর্ষ নেতা বাগদাদিকে নিয়ে প্রচারিত তথ্যানুযায়ী খলিফা আবুবকর আল বাগদাদি ছিল ইহুদি, ২০০৪ সাল থেকে সিআইএ-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয় এবং টানা এক বছর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন মোসাদ আর ইরাক হামলার সময় ছদ্মবেশে মসজিদের খতিব ছিলেন আইএসের এই শীর্ষ নেতা আবুবকর আল বাগদাদী।

২০১৩ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন সিরিয়ায় আবুবকর আল বাগদাদিসহ অর্ধডজন শীর্ষ জঙ্গি নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠকও করেন। তখন বাগদাদির মুখে লম্বা দাড়ি ছিল না। ওই বৈঠকে বাগদাদির সহযোগী আইএসের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ নূরও উপস্থিত ছিলেন। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা এ জঙ্গি গোষ্ঠীর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রত্যেকেই মোসাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। মোসাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতেই আইএস জঙ্গিদের ‘যুদ্ধকৌশল’ শেখানো হয়। গ্লোবাল রিসার্চ নামের একটি গবেষণা ওয়েবসাইট দাবি করে, ২০০৪ সাল থেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে আবুবকর আল বাগদাদি।

আইএস নামে উগ্র ধর্মান্ধরা নিজেদের মত করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা আল্লাহতায়ালার কাজ। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের তাণ্ডব দেখছে বিশ্ববাসী। নিরীহ মানুষদের পুড়িয়ে মারছে, জবাই করছে। নিরপরাধ নারী ও শিশুরাও বাদ যাচ্ছে না এদের হাত থেকে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের এ ঘটনার সাথে যে বা যারাই জড়িত তারা নি:সন্দেহে সন্ত্রাসী, তাদের কোনো ধর্ম নেই।

এই যে সমগ্র বিশ্বে ধর্মের নামে নজিরবিহীন সহিংসতা, তা শুধু ইসলাম নয় বরং কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। নৈরাজ্য সৃষ্টি করে কাউকে ধর্মের সুশীতল ছায়ার বেহেশতি বাতাসের সাধ উপভোগ করানো যায় না। নৈরাজ্যের মাধ্যমে কেবল বিশৃঙ্খলাই দেখা দিতে পারে, শান্তি নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চাই ধর্মের শান্তিময় শিক্ষার বাস্তবায়ন। বিশ্বনিয়ন্ত্রণকর্তা সব সময়ই মানুষকে শান্তির পথে আহ্বান করে থাকে। প্রকৃত-শান্তির ধারক ও বাহক কখনো সমাজের ও দেশের অশান্তির কারণ হতে পারে না।

এসব নৈরাজ্যকারীদের জন্য সমগ্র বিশ্বই আজ রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি নৈতিকভাবে চরম অধঃপতনে নিপতিত। তাই সন্ত্রাসী যেই হোক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত