বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭
২৮ °সে

আসুন বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই

আসুন বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই
ড. আতিউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

কদিন আগে লিখেছিলাম, এবারের বন্যা যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। মনে হচ্ছে বন্যার এই প্রকোপ করোনা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টাকে আরো কঠিন করে ফেলেছে। এই দ্বৈত সংকট আসলে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের প্রতিচ্ছবি। দুটো সংকট একসঙ্গে চলে আসায় আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু নিরাশ হলে চলবে না। আমরা যে প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বসবাসের ঐতিহ্য বেশ সুদৃঢ়। তাই এই সংকটেও আমাদের জনগণ ও সরকার একযোগে সাহসের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার প্রধান এক দেশ। সম্পদের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা সাহসের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছি জলবায়ু বিপন্ন মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে। কদিন আগে কক্সবাজারের অদূরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য নামমাত্র মূল্যে নির্মিত সুপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের শুভযাত্রার উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

প্রলম্বিত যে বন্যা বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক ভূমির ওপর দিয়ে এখন বইছে, তা-ও জলবায়ু পরিবর্তনেরই উপসর্গ। কদিন আগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানও ছিল আরেক উপসর্গ। মাঝখানে মনে হয়েছিল পানি আর বাড়বে না। কিন্তু এক অঞ্চলে খানিকটা কমে তো অন্য অঞ্চলে বাড়ে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ফের ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। এর পরিণতিতে আমাদের উত্তরাঞ্চলে ফের পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। এরই মধ্যে বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামের কিছু অংশে পানি আবার বাড়ছে। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকার নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়ছে। পাবনা, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে চর এলাকার বন্যার্ত মানুষের দুর্দশার শেষ নেই। চরাঞ্চলের মানুষ এমনিতেই মূল ভূখণ্ড থেকে বেশি গরিব ও বিপন্ন। চরাঞ্চলের অতিদরিদ্র মানুষের হার মূল ভূখণ্ডের দ্বিগুণ। আর এই বন্যায় তারা এখন পুরোপুরি জলবায়ু উদ্বাস্তু। আশপাশের বাঁধে কিংবা অন্যের বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের শিশু, গরু-বাছুর, ছাগল-ভেড়া, হাঁস-মুরগির কী দুরবস্থা, তা সহজেই অনুমান করা যায়। মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে না। স্যানিটেশনের অবস্থার কথা আর নাই বা বল্লাম। উপকূলে ‘সাইক্লোন শেল্টার’ গড়ে বিপন্ন মানুষদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া গেলেও বন্যার্ত নদীভাঙা ও চরের মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার নীতি-উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত আমরা নিয়ে উঠতে পারিনি।

এবারের প্রলম্বিত বন্যা ছোট-বড় গরুর খামারিদের খুবই বিপদে ফেলে দিয়েছে। আশা ছিল ঈদুল আজহার সময় তারা তাদের ঋণ করে কেনা এই পশুগুলো উচিত দামে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এখন এসব পশুকে শেষ মুহূর্তে খাবার দিয়ে মোটাতাজা রাখাই দায়। রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে বলে হাটেও যেতে অসুবিধে। অনেকের ঘরবাড়ি ও পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। একই কারণে ক্রেতাসমাগমও কম।

তাঁতিরা কি কম বিপদে আছেন? পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলের তাঁতিদের দুর্দশা আসলেই বর্ণনার অতীত। গত পয়লা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরে লকডাউনের কারণে তাদের তৈরি শাড়ি, লুঙ্গি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করা যায়নি। আশা ছিল এবারের ঈদুল আজহায় খানিকটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু বিধিবাম। এরই মধ্যে তাঁতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। তাঁতযন্ত্রের পাশাপাশি রং ও সুতাও পানির তলায়। ঋণ করে এসব উপকরণ কিনেছিলেন তারা। তাদের জন্য কি আলাদা করে ত্রাণ বা পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়া হবে? করোনা ভাইরাসের দাপটে ছোটখাটো ব্যবসায়ী, শহরের বিক্রেতা ও তাদের কর্মচারীদের দুরবস্থার যেন শেষ নেই। এমনি বাস্তবতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথার্থই প্রশাসন ও দলীয় কর্মীদের বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন। সুনির্দিষ্টভাবে তার আহ্বান ছিল এমনটি: ‘সবার কাছে আমার নির্দেশনা—করোনা ভাইরাস ও বন্যায় মানুষের সেবা করে যাবেন’। তিনি শুধু বর্তমানের কথা বলেন নি। আগামী দিনের করণীয় বিষয়েও কথা বলেছেন। বন্যা শেষ হলে সময়মতো কার্যকর পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিয়ে সেগুলো পুনর্বাসন করারও আহ্বান করেছেন তিনি।

প্রশাসন নিশ্চয় তার সাধ্যমতো এই দ্বৈত দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করে যাবে। পাশাপাশি সমাজকেও সচেষ্ট হতে হবে। এবার মহামারির কারণে পরিবেশ পরিস্থিতি খানিকটা ভিন্ন। তবু যার যতটুকু সাধ্য আছে তাই নিয়ে এই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। উদ্যোক্তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা দেখানোর এই সুযোগ নিশ্চয় তারা হাতছাড়া করবেন না। এমন দুঃসময়ে কর্মচারীদের অবশ্যই ছাঁটাই করবেন না। সমাজে এখনো অনেক ক্লাব, সমিতি, তরুণদের সংগঠন সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের হাতকে আরেকটু শক্তিশালী কি আমরা করতে পারি না? বিদেশ থেকে আমাদের প্রবাসী ভাইবোনরা যথেষ্ট করছেন। তাই প্রবাস আয় হালে বেড়েছে। অন্যদেরও এমন মানবিক সাড়া প্রদানের সুযোগ রয়েছে। করোনার কারণে স্থানীয় ছোট ছোট এনজিওর পুঁজি প্রায় শেষ। বড়দের অবস্থাও খুব ভলো নয়। তবে এদের রয়েছে বিরাট কর্মীবাহিনী। আরো আছে তৃণমূলে কাজ করার অভিজ্ঞতা। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গেও রয়েছে যথেষ্ট যোগাযোগ। তাই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তারা হতে পারে নির্ভরযোগ্য অংশীদার। স্থানীয় কৃষক ও খুদে উদ্যোক্তাদের তারা ভালোভাবে চেনে। তাই ব্যাংক চাইলে তাদের সঙ্গে সংযোগ করে দ্রুত প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে।

নিঃসন্দেহে কৃষিসহ গ্রামীণ অর্থনীতিই এই সংকটকালে হতে পারে বড় রক্ষাকবচ। অনেক উচ্চশিক্ষার্থী এখন গ্রামে। করোনা ও বন্যার এই সময়টায় তাদেরকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। শিশুদের শিক্ষা এরই মধ্যে লাটে উঠেছে। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে তারা শিশুদের শিক্ষা দিতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য স্বচ্ছ তালিকা, উপযুক্ত কৃষক ও খুদে উদ্যোক্তা চিহ্নিত করতেও তারা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে পারে। গ্রামীণ পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পরিচ্ছন্নতা আন্দোলনেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

এবারে বন্যাকবলিত কৃষির পুনর্বাসনে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখছি :

১. দেখা গেছে, যে বছর বন্যার প্রকোপ বেশি হয় সে বছর রবি মৌসুমের (শীতকালীন) ফসলের ফলন ভালো হয়। কেননা হিমালয় থেকে আসা পলির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া বর্ষায় যেসব জমির আমন ধান বিনষ্ট হয়, সেসব জমিতে কৃষক সঠিক সময়ে অর্থাত্ অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরের প্রথমেই রবিশস্য চাষ করতে পারে। ফলে ফলনের পরিমাণ হয় আশানুরূপ।

২. অনেক বছর আগস্ট মাসের পর বড় বন্যার প্রকোপ দেখা দেয় না। এরূপ ক্ষেত্রে আমন ধান নষ্ট হলেও চারার সংস্থান করা গেলে পুনরায় স্বল্পমেয়াদি আমন ধান যেমন—বিইউ ধান-১, ব্রি ধান ৫৬, বিনা ধান৭-এর চাষ করা যাবে। কৃষক পর্যায়েও ধানের চারা উত্পাদন করা সম্ভব। এজন্য ভাসমান পদ্ধতি বা দাপোগ পদ্ধতিতে চারা উত্পাদন করা সম্ভব। তবে কোনোভাবেই যেসব জমি থেকে বন্যার পানি সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেও সরে না যায়, সেসব জমিতে ঐ বছর নতুনভাবে আমন ধান লাগানো ঠিক হবে না।

৩. এছাড়াও বন্যায় ফসল নষ্ট হয়েছে এমন জমিতে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য গরুর ঘাস হিসেবে মাষকলাই কিংবা পাতা জাতীয় স্বল্পমেয়াদি জাতের সবজি চাষ করা যেতে পারে। অন্যদিকে বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর গবাদিপশুর রোগবালাই বেড়ে যায়। রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ নজর দিতে হবে।

৪. চর এলাকায় এ বছর রবি ফসলের বাম্পার ফলন না হলে কৃষকের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। কাজেই এখনই কৃষককে রবি ফসল বিশেষ করে গম, ভুট্টা, আলু ও ডালের উন্নত চাষাবাদের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চরের কৃষিতে ভর্তুকি হলো সরকারের প্রকৃত কৃষি বিনিয়োগ। অনেক সময় কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দুর্গম চরে কাজ করতে আগ্রহী হয় না। এর মূল কারণ হলো অত্যন্ত নাজুক যাতায়াত ব্যবস্থা। মনে রাখতে হবে যে, চরের কৃষক কৃষিকাজ করতে নিরুত্সাহিত হলে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তা হবে এক মারাত্মক হুমকি। কারণ উঁচু ও ভালো কৃষিজমি প্রতি বছর প্রায় ০ দশমিক ৭০ শতাংশ হারে কমে যাচ্ছে। চরকে এজন্যই বলা হয় ‘কৃষির হিডেন ডায়মন্ড’।

৫. যেহেতু চরে প্রতি বছরই বন্যা দেখা দেয় এবং ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা আরো বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে সেহেতু চরের কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ কৃষি প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে প্রাকৃতিক কৃষির বড় ক্ষেত্র হতে পারে এসব চর।

৬. বন্যায় যেহেতু কৃষকের বীজ নষ্ট হয়ে যায়, সেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে কৃষক সংগঠন করে বীজ রক্ষণাগার তৈরি করতে হবে। তাছাড়া গবাদিপশুর চিকিত্সার যথাযথ ব্যবস্থা করা না হলে চরের কৃষক উন্নত জাতের গবাদিপশু লালনপালনের জন্য উত্সাহিত হবে না।

৭. চরে কেইজ বা খাঁচা পদ্ধতিতে বর্ষাকালে দ্রুতবর্ধনশীল মাছের চাষ করা সম্ভব বলে মাত্স্যবিজ্ঞানীরা মনে করেন। তবে সেজন্য কৃষককে প্রশিক্ষণসহ বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। চরে মাছের পোনা সহজে কৃষক পায় না। সেজন্য সম্মিলিতভাবে চরের কৃষকদের সহযোগিতা করতে হবে। কৃষি এখন বহুমুখী উদ্যোগের নাম। শিক্ষিত তরুণরা কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে ধীরে হলেও এগিয়ে আসছে। তারা কৃষির উত্পাদন ছাড়াও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ কাজেও যুক্ত হলে কৃষির উত্পাদনশীলতা বাড়বে। করোনা ও বন্যার এই সংকট কৃষির নয়া সম্ভানার দরজা খুলে দিক—সেই প্রত্যাশাই করছি।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত