বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭
২৮ °সে

চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হবে

চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হবে
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে কর্মী।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে তৈরি পণ্যের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপ আমেরিকায় যাচ্ছে বাংলাদেশের জুতা ও চামড়াজাত পণ্য। এতে সামান্যতম সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের জন্য চামড়া শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত, যা সুষ্ঠু পরিচালনা ও যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও এ খাতের বিকাশ সঠিকভাবে হচ্ছে না। দেখা যায় গত বছর ঈদুল আযহায় চামড়ার তেমন কোন মূল্যই ছিল না।

গত পাঁচ বছরে চামড়ার দাম কমেছে অর্ধেক। বিপরীতে চামড়া এবং চামড়াজাত সব পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কাঁচা চামড়ার দাম কমছে কেন, সেই উত্তর মিলছে না কোথাও। এবারে ঈদুল আজহার চামড়া নিয়ে যে কাণ্ডকীর্তি হয়েছে তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এত মূল্যবান একটি জিনিসকে ফেলনা হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

আমরা মনে করি এই অপার সম্ভাবনাময় শিল্পকে ধ্বংসের জন্য একটি মহল উঠে পড়ে লেগেছে। এমনটি না হলে গত বছর চামড়ার মূল্য কমিয়ে এটিকে মাটিতে পুতে ফেলার বা নষ্ট করার জন্য উৎসাহ যোগানোর সংবাদ পাওয়া যেত না। বাংলাদেশে সারা বছর যে সংখ্যক পশু জবাই হয়, তার অর্ধেক হয় এই কোরবানির মৌসুমে। কোরবানি যারা দেন, তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কিনে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেন ট্যানারিতে। এ সময়ই সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করেন ট্যানারি মালিকরা। দেখাযায় প্রতিবছর কোরবানির ঈদের আগে চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের জন্য ন্যূনতম দাম ঠিক করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে ট্যানারি মালিকদের দাবিতে গত বেশ কয়েক বছর ধরে ওই দাম কমতির দিকে।

এবারও পবিত্র ঈদ-উল-আযহা সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের জন্য দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। ট্যানারি ব্যবসায়ীরা এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়; ঢাকার বাইরে এর দাম হবে ২৮ থেকে ৩২ টাকা। এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ১০ থেকে ১২ টাকায় সংগ্রহ করবেন ব্যবসায়ীরা। চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পর বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যর চাহিদা এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে চাহিদা কেমন হতে পারে, তার সঙ্গে বর্তমান মজুদ বিবেচনা করে এবারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয় ১১৩ কোটি ডলার। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ কোটি ডলারে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রফতানি আয় অস্বাভাবিক কমে ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২ কোটি ডলার। আয় হয়েছে ১০১ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ ক্ষেত্রে আয় কম হয়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আয় কমেছে ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যদিও এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ আয় কমেছে।

লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১০টি রফতানিমুখী কারখানায় চামড়ার পাদুকা তৈরি হয়। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম, বেঙ্গল এবং বে’র রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর বাইরে শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি। চামড়া শিল্পের বোদ্ধাদের মতে ‘ফরাসিদের ফ্রেঞ্চ কাফের’ পর মানের দিক থেকে আমাদের দেশের চামড়াই দুনিয়ার সেরা। এরকম স্মুথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের অন্য কোথাও মেলে না। তারপরেও পিছিয়ে ছিল আমাদের দেশের চামড়া শিল্প। কিন্তু গত তিন অর্থবছর থেকে সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে চামড়াজাত পণ্য রফতানির পরিমাণ। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশ হয়ে উঠছে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণ। কারণ এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম এবং জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা। বিভিন্ন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশের এ সম্ভাবনাময় শিল্পকে কে বা কারা ধ্বংস করতে চাচ্ছে তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘চামড়ার নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিতকরণ, যথাযথ প্রক্রিয়ায় চামড়া সংগ্রহ ও যথাসময়ে লবণ লাগানো নিশ্চিত করতে হবে। ঈদের দিন থেকে দেশব্যাপী কঠোরভাবে বিষয়গুলো মনিটরিং করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত মনিটরিং টিম। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজনে এবার কাঁচা চামড়া ও ওয়েস্ট ব্লু চামড়া রপ্তানি করা হবে।’

তবে এক ধরণের অসাধু ব্যক্তিদের কারসাজিতে দাম না থাকায় গত বছর কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার দৃশ্য দেখেছি। এটা কখনোই একটা দেশের সার্বিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক নয়। এগুলো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক ধরনের অশনিসংকেত। অথচ দেশের চামড়া শিল্পে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

আমরা মনে করি যেভাবেই হোক এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা যা করার প্রয়োজন রয়েছে তা সরকারকেই করতে হবে। সেই সাথে এবারের ঈদুল আযহায় চামড়া নিয়ে কেউ যেন কোন ধরণের কারসাজি এবং সমস্যা সৃষ্টি না করতে পারে সে ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। যে মহলটি চামড়া শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য তৎপর থাকে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে সম্ভাবনাময় এই শিল্প যথাযথ গুরুত্ব পাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মাহমুদ আহমদ সুমন

লেখক: ইসলামিক চিন্তাবিদ ও কলাম লেখক

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত