ভ্যাকসিন নিয়ে বড় বিশৃঙ্খলা হতে পারে

ভ্যাকসিন নিয়ে বড় বিশৃঙ্খলা হতে পারে
প্রতীকী ছবি

করোনা ভ্যাকসিন কি আসছে? উত্তর, ইয়েস আসছে। কয়টি কোম্পানি ভ্যাকসিন আনতে পারে? উত্তর, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৭০টি উদ্যোগের ভেতর অন্তত তিনটা কোম্পানির ভ্যাকসিন বাজারে আসছে। যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রা-জেনেকা ও চীনের ক্যানসিনো ভ্যাকসিন তৃতীয় পর্যায়ে ট্রায়ালের গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গিয়েছে। চীনের একটি কোম্পানির উদ্ভাবিত টিকা ইতিমধ্যেই সে দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া শুরু হয়েছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানির কয়েকটি কোম্পানি মানবদেহে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবেই যে দেশের ওষুধ কোম্পানি এটি উৎপাদন করবে সেই দেশের চাহিদা মিটানোর পর অন্য দেশে রপ্তানি করবে।

কবে আসছে এই কোভিড ভ্যাকসিন? উত্তর, এই ডিসেম্বরে বা মার্চ ২০২১-এর মধ্যে। বিশ্বের ভ্যাকসিন গবেষকরা কি একমত এ ব্যাপারে? উত্তর, ইয়েস একমত। ১০০ শতাংশ কনফার্ম? উত্তর ইয়েস, ১০০ শতাংশ কনফার্ম (তবে ইফিকেসি নিয়ে আমার নিজের ব্যক্তিগত সন্দেহটা বলে রাখলাম)। কত ডোজ ভ্যাকসিন লাগবে এক ব্যক্তির? উত্তর, দুই ডোজ লাগবে। প্রথম এবং মনে হয় ২৮ দিন পরে আরেক ডোজ। তাহলে বিশ্বব্যাপী কত ডোজ ভ্যাকসিন লাগবে? উত্তর, প্রায় ১৪ হাজার মিলিয়ন ডোজ লাগবে (১ হাজার ৪০০ কোটি ডোজ)।

কারা আগে পাবে এই ভ্যাকসিন? উত্তর, অবশ্যই যারা বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে তারা আগে পাবে। যারা ভ্যাকসিন কূটনীতিতে এগিয়ে আছে তারা আগে পাবে। যেমন ধরুন: আমেরিকা ইতিমধ্যেই তাদের ৬৬২ মিলিয়ন ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য কূটনীতি ও অন্যান্য দেনদরবার সেরে রেখেছে কংগ্রেসের মাধ্যমে। কানাডাও একই কাজ করছে তাদের ৭৫ মিলিয়ন ভ্যাকসিনের জন্য। রাশিয়াও একই কাজ করছে তাদের ২৯২ মিলিয়ন ভ্যাকসিনের জন্য। চায়নাও তাদের ২ হাজার ৮৮০ মিলিয়ন এবং ইন্ডিয়াও তাদের ২ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন পেতে জোর কূটনীতি সেরে রেখেছে; এরা আবার ভ্যাকসিন প্রোডাকশনও করে সস্তায়। দুই ডোজ ভ্যাকসিনের দাম হতে পারে ৪০ ডলার; কিন্তু চায়না ও ইন্ডিয়া হয়তো-বা এটি বানাতে পারে ১০ ডলারে। জাপানের দরকার ২৫২ মিলিয়ন এবং সেটি এরা পেয়ে যাবে তাদের পার্টনারের মাধ্যমে। ইরানের দরকার ১৬৭ মিলিয়ন। এরাও এটি পেয়ে যাবে। সাউথ কোরীয়দের দরকার ১০২ মিলিয়ন, সৌদিদের দরকার ৬৯ মিলিয়ন, যুক্তরাজ্যর দরকার ১৩৪ মিলিয়ন এবং এরা এটি অগ্রিম বুকিং দিয়ে রেখেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের দরকার প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন এবং সেটা এরা কনফার্ম করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে। মিডল ইস্টের অন্যান্য ধনী রাষ্টগুলোও পেয়ে যাবে তাদের ক্যাঙ্গারো পররাষ্ট্রনীতির কারণে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—আমাদের ৩৫০ মিলিয়ন ডোজ করোনা ভ্যাকসিন কে দিবে? কখন দিবে? কীভাবে দিবে? কয় চালানে দিবে? ট্রান্সপোর্টেশান কী হবে? ৪? কোল্ড স্টোরেজ ম্যানেজমেন্ট কে করবে? কাকে কাকে আমরা এই ভ্যাকসিন শুরুতে দিব? কীভাবে দিব? কেন এদেরকে দিব? কাদের মাধ্যমে দিব? মনিটরিং কে করবে? ১ লাখকে দিয়ে যদি বাকি ৯ লাখ ড্রেনে ফেলে দেয়? ভুয়া ভ্যাকসিনের ব্যবসা যদি শুরু হয়? নতুন সাহেদ-সাবরিনা আসবে না ভ্যাকসিন নিয়ে—এই গ্যারান্টি কে দিবে? ১০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন দিয়ে আমলারা যদি বলে—ভ্যাকসিন দেওয়া শেষ, দেশের সবাই ভ্যাকসিনের আওতায় চলে এসেছে, তাহলে কী করবেন? ইপিআই ম্যানেজমেন্ট আর করোনা ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট কি এক কথা? শিশু ভ্যাকসিনে সফল বাংলাদেশের অ্যাডাল্ট ভ্যাকসিন তো ফেইল করেছে, তাহলে অ্যাডাল্ট ভ্যাকসিন সাকসেসফুল কীভাবে করবেন? মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়, স্বাস্থ্য সচিব, নতুন ডিজি, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আমলা এবং রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সাংবাদিক ও অন্যান্যদের কি এই প্রশ্নগুলো জানা আছে? ভ্যাকসিন নিয়ে গত দুই মাস আগে জাতীয় কারিগরি কমিটির একটি সভা হয়েছিল। এরপর আর খবর নেই, সব চলে গেছে সাহেদ-সাবরিনা ডিসকোর্সে!

আসেন কিছু প্রশ্নের উত্তর দেই আমরা। প্রথম কথা হলো—আমরা করোনা ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি এখনো শুরুই করিনি। এটা না করার দুটো কারণ: ১) আমরা বিষয়টার গ্র্যাভিটি বুঝতে পারছি না ২) কোনো কোনো দেশ হয়তো-বা আমাদেরকে ভেতরে ভেতরে সান্ত্বনা দিচ্ছে। দুটোর একটিও যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের সামনে মহাবিপদ। সমস্যার গ্র্যাভিটি না বোঝার বিপদ-তো এখন দেখতেই পাচ্ছেন, আর বিদেশি সান্ত্বনা যে কখনো কাজে আসবে না সেটি আর বলতে?

ব্রিটেনের ৫ লাখ লোক রাজি হয়েছে ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশ নিতে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রাজিল, আরব আমিরাত, ভারতসহ অন্যান্য দেশে লাখ লাখ লোক ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছে অথচ আমরা না অংশ নিচ্ছি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ট্রায়ালে, না নিচ্ছি অস্ট্রেলিয়া ভ্যাকসিন ট্রায়ালে, আর চায়নিজ ভ্যাকসিন নিয়ে তো একটা লেজে গোবরে অবস্থা তৈরি হয়েছে—সেটা সবাই জানেন আপনারা।

এর ফল কী হবে ? ফল হবে আমরা সময়মতো কোভিড ভ্যাকসিনটি পাব না।

এর অর্থ আমরা কিছু ভ্যাকসিন পাব না, তা কিন্তু নয়। বিল গেটসের মতো আমাদের কিছু আন্তর্জাতিক পরীক্ষিত বন্ধু আছে যারা আমরা যাতে সারা বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে একই দিনে কোভিড ভ্যাকসিন পাই, তা নিশ্চিত করবে। এছাড়া WHOসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা আমাদেরকে কিছুটা সাহায্য করবে; কিন্তু এতে আমাদের কোভিড ভ্যাকসিন সমস্যার সমাধান হবে না। ভ্যাকসিন পাওয়ার দাবিটা আমরা জোরের সঙ্গে তুলতে পারতাম, যদি আমরা একটা ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করতে পারতাম।

এখন আসুন অন্য প্রসঙ্গে। ধরুন আমরা ভ্যাকসিন পেলাম। তাহলে কারা প্রথমে পাবে এই ভ্যাকসিন? কোনো নীতিমালা আছে? নাই। ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কারদের (স্বাস্থ্য, মিডিয়া ও ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার) আগে দিতে হবে, পরে পাবে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা, তারপর পাবে শিক্ষকরা, তারপর পাবে ৪ কোটি ছাত্রছাত্রী, তারপর পাবে বাকি জনসংখ্যা। নাকি আগে ৫০+ জনসংখ্যাকে দিবেন? আছে কোনো নীতিমালা এ ব্যাপারে? নাই।

আমাদের এই ৩৪ কোটি ভ্যাকসিন দেওয়ার এই মহাকর্মযজ্ঞ কে ম্যানেজ করবে? এই ভঙ্গুর আর দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর? ইমপসিবল! এখানে বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংযুক্ত করতে হবে। তাদের টার্মস অফ রেফারেন্সে কী হবে? আমাদের যে দুই-একটি ফার্মা ভ্যাকসিন বানাতে পারে তারা কি ভ্যাকসিন স্থানীয়ভাবে উত্পাদন করতে পারবে? কত মাস লাগবে আমাদের প্রথম ডোজ শেষ করতে? ২৮ দিনের মধ্যে যদি দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয় তাহলে অ্যাডাল্ট ভ্যাকসিন যে সমস্ত কারণে আগে ফেইল করেছে তার আবার পুনরাবৃত্তি হবে না সে গ্যারান্টি কোথায়?

উপরিউক্ত আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে (এই সরকারের ভেতর বেশ কয়েকজন যোগ্য লোক থাকার পরও) ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসিতে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে অনেক পিছিয়ে, যার ফল ভোগ করার জন্য বাংলাদেশকে খুব বেশিদিন হয়তো অপেক্ষা করতে হবে না।

লেখক :সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত