তিনি নিজ হাতে নিতে পারলেন না অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা

তিনি নিজ হাতে নিতে পারলেন না অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা
প্রতিভা সাংমা। ছবি: সংগৃহীত

জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কাজ চিরস্থায়ী। কাজের মাধ্যমে অনেকেই ইতিহাস সৃষ্টি করেন। নশ্বর জীবন তখন হয়ে ওঠে অবিনশ্বর। এক প্রাণ বেঁচে থাকে লক্ষ প্রাণের চৌহদ্দিতে। জাতি, গোষ্ঠী, ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে পান অপরিসীম শ্রদ্ধা। এমন শ্রদ্ধার ভারে উচ্চকিত এক নারী ছিলেন প্রতিভা সাংমা। গারো নারী জাগরণের অগ্রদূত ছিলেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নশ্বর জীবন থেকে চিরবিদায় নেন। নারী শিক্ষায় অবদানের জন্য তিনি এবার অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা-২০১৯ লাভ করেন। গত এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা ছিল। করোনাজনিত কারণে সেটি আগামী সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা। তার আগেই এ মহীয়সী নারী আমাদের সবাইকে ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

বাংলাদেশে যে অর্ধশত আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলের গারোরা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এদের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দরুন গারোদের জীবনব্যবস্থা অনেকটা বৈচিত্র্যময়। এরা মান্দি নামেও পরিচিত। গারো ভাষার নাম আচিক। লেখ্যরূপ নেই। বর্তমানে গারোদের শিক্ষার হার প্রায় ৯০ শতাংশ। শিক্ষার ক্ষেত্রে এই যে বিপ্লব, তা এক দিনে হয়নি। অরণ্যানি সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা গারো সমাজে দু-এক জন সাহসী নারীর সন্ধান মেলে, যারা শত প্রতিকূলতা ঠেলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। এদেরই একজন ছিলেন প্রতিভা সাংমা।

প্রতিভার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পাহাড়ি গ্রাম ইদিলপুরে। লাল মাটির টিলা, নিচুু বাইদ, সারি সারি কাঁঠাল, আনারস আর লিচুবাগান নিয়ে এই গ্রাম। ১৯৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর এই গ্রামে জন্ম তার। বাবা সনাতন মৃ। মা বঙ্গবালা চাম্বুগং। প্রতিভা দেখতে সুন্দরী ও পরিপাটি হওয়ায় সবার কাছেই ছিলেন আদরণীয়। মায়ের হাত ধরেই পড়ালেখা শুরু। ১৯৩৮ সালে ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি। ১৯৪৯ সালে মেট্রিকুলেশন। ৫১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও মায়ের নির্দেশে ৫২ সালে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সেন্টমেরি মিশনারি হাইস্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। মধুপুর বনাঞ্চলের গারোরা সে সময় শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে ছিল। নিজ সম্প্রদায়ের কথা ভেবে ১৯৬৫ সালে সেন্টমেরি মিশনারি হাইস্কুলের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ফেরেন গ্রামে। মধুপুর বনাঞ্চলের ভুটিয়া প্রাইমারি স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেন। ছিলেন আশপাশের আরো দুটি মিশন স্কুলের অতিথি শিক্ষক। গারো শিশুরা যাতে স্কুলে আসে, এজন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে গারো নারীদের উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। তার স্বপ্ন পরবর্তী সময়ে সফল হয়। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকার আদিবাসী কোটায় গার্লস গাইডের নেত্রী হিসেবে উচ্চতর প্রশিক্ষণে তাকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে পাঠায়। ১৯৭২ সালে মধুপুর গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি অবদান রাখেন। এখান থেকেই ১৯৯১ সালে অবসর নেন। মধুপুর বনাঞ্চলে শতাধিক মিশনারির প্রাইমারি ও তিনটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এছাড়া ২০টি সরকারি ও রেজিস্ট্রিপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এখন শত শত গারো শিশু পড়ালেখা করে। সত্তরের দশকে তার হাতে গড়া নারী, যারা উচ্চশিক্ষা নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা এই শিক্ষা আন্দোলনে এখন ভূমিকা রাখছেন।

শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও সমাজের দায়দায়িত্ব থেকে গুটিয়ে নেননি। গারো ছেলেরা দল বেঁধে মিশনারি স্কুলে গেলেও মেয়ের সংখ্যা ছিল কম। এমতাবস্থায় নারী শিক্ষার মর্যাদা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গারো সমাজপতিদের বোঝাতে থাকেন। শেষ বয়সেও গারো গ্রামের মেয়েদের স্কুলে গমনে উত্সাহিত করে গেছেন। পাড়ার দরিদ্র ছেলেমেয়েদের তিনি সারাজীবন বিনা বেতনে পড়িয়েছেন। তারই প্রচেষ্টায় গ্রামে একটি মিশনারি স্কুল, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়, শিশু পল্লি ও শিক্ষায়তন এবং হাইস্কুল গড়ে উঠেছে।

অশীতিপর বয়সেও প্রতিভা যথেষ্ট মানসিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। ভোরে উঠে এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে গারো শিশুদের লেখাপড়ার খোঁজ নিতেন। ২০০১ সালে অগ্নিকাণ্ডে ১০ ভরি স্বর্ণালংকারসহ তার পাঠাগার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাড়িঘর পুড়ে যাওয়ার কষ্ট ভুলে গেলেও মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের পাঠাগারটি বিনষ্টের কষ্ট জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারেননি। সারা জীবন সমাজের অবহেলিতদের মানুষ করতে গিয়ে নিজের ঘর বাঁধা হয়নি। আজীবন কুমারীই থেকে গেছেন। জীবিতকালে তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রাখায় অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা-২০১৯, ডেইলি স্টার পুরস্কার এবং জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ পুরস্কার লাভ করেন। তার দাবি ছিল, গারো শিশুরা যেন নিজ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কারণ একটি গারো শিশু বাড়িতে মাতৃভাষায় কথা বলে। স্কুলে সহপাঠীদের সঙ্গে বাংলায়। আর পড়াশোনা করে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে। এভাবে তিন তিনটি ভাষার জন্য মানসিক চাপে পড়ে তারা। এসব দাবি অনেকটাই মেনে নিয়েছে সরকার। তিন বছর ধরে গারো শিশুরা নিজ ভাষায় শিক্ষা নিচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত