দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছে। তার পেছনের অর্থনৈতিক কারণগুলো অনেক সময় আমাদের চোখে পড়ে না। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনটা হলো আওয়ামী লীগ ও শাসনযন্ত্রের ক্রমান্বয়ে ডান দিকে হেলে পড়া। এই হেলে পড়াটা সবারই দৃষ্টির মধ্যে ধরা পড়েছে। কেউ সাহস করে বলছেন না—রাজা, তুমি ন্যাংটা। বিলাতে দীর্ঘকাল বাস করি। তাই বিলাতের উদাহরণ টানি। রুশ বিপ্লবের আগে বিলাতের লেবার পার্টির জন্ম। অচিরেই তার লক্ষ্য হিসাবে ঘোষিত হয় সোশ্যালিজম, তখন লেবার পার্টির নেতা ছিলেন ট্রামের কন্ডাক্টর, বাসের ড্রাইভার, কয়লাখনির শ্রমিক।

ধীরে ধীরে এই নেতৃত্বের পরিবর্তন হলো। টোরি পার্টির মতো লেবার পার্টিরও নেতৃত্ব গেল অক্সফোর্ডে, কেমব্রিজে শিক্ষিত তরুণদের হাতে, যারা কেতাব পড়ে সোশ্যালিস্ট হয়েছিলেন, ফলে লেবার পার্টি হলো সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টি, নিল তিলোক, টনি ব্লেয়ারের আমলে লেবার পার্টি আবার রূপ বদলাল। তার গঠনতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্র বিদায় নিল। পার্টির প্রতীক আর লাল ফুুল রইল না। লেবার পার্টি হয়ে দাঁড়াল আমেরিকার ডেমোক্র্যাট পার্টির মতো লিবারেল বুর্জোয়া ডেমোক্রেটিক পার্টি।

টনি ব্লেয়ারের আমলে তো লেবার পার্টি প্রকৃত পক্ষে স্যাডো কনজারভেটিব পার্টিতে পরিণত হয়। তাকে বলা হতো নিউ লেবার। ব্লেয়ার থ্যাচারিজম অনুসরণ করতে শুরু করেন। এই যখন অবস্থা, আমেরিকানদের অবৈধ ইরাকযুদ্ধে লেবার গভর্নমেন্ট সমর্থন ও সহযোগিতা দেয়। ব্লেয়ার ও লেবার পার্টি জনপ্রিয়তা হারায়। এই সুযোগে ওল্ড লেবার নামে পরিচিত লেবার পার্টির বামপন্থিরা জেমস করবিনের নেতৃত্বে দলের ক্ষমতা দখল করে। সোশ্যালিস্ট করবিনের দারুণ জনপ্রিয়তায় একসময় মনে হয়েছিল লেবার পার্টি নির্বাচনে জিতবে এবং করবিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু ব্রেক্সিট সমস্যা এসে ব্রিটেনের রাজনীতিতে বিরাট ওলটপালট ঘটায়। করবিন নেতৃত্ব হারান। লেবার পার্টি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত। ট্রাম্পের মতো অতি জাতীয়তাবাদী স্লোগান তুলে বরিস জনসন এখন জনপ্রিয় টোরি প্রধানমন্ত্রী।

ব্রিটেনের অর্থনীতি ধনতান্ত্রিক। এই ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রস্তাবনা করেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত। ব্যাংকের গভর্নররাও তাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। তাহলেও তারা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাই অনুসরণ করেন। তবু মাঝে মাঝে কোনো কোনো গভর্নর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। যেমন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র আমলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর স্বাধীনচেতা ছিলেন। থেরেসা মে ব্যাংকের তত্কালীন একটি সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তিনি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য গভর্নরকে চিঠি লিখলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে শিখতে চাই না দেশের অর্থনীতি কীভাবে চালাতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারি না।’ গভর্নরের এই চিঠি থেরেসা মে’কে হজম করতে হয়েছিল।

আমি ব্রিটেনের এই উদাহরণ এজন্যই টানলাম যে বাংলাদেশ এককালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশ ছিল। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনতা দেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সরকারের হুকুম তামিল করতে হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পরিবর্তনও অনেকটা ব্রিটেনের লেবার পার্টির মতো। আওয়ামী লীগের পুরো ইতিহাস এখানে টানতে চাই না। ১৯৫৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগ একটি উদার গণতান্ত্রিক ধনতান্ত্রিক দল। শেখ মুজিবুর রহমান দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর দলটি হয় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল। দলটিতে প্রচুর বামপন্থি রাজনীতিকের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তারাই গড়ে তোলেন মুজিব নেতৃত্বের শক্তিশালী ভিত্তি।

শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদ পুরোপুরি বামপন্থি ছিলেন না। ছিলেন মধ্য বামপন্থি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রীর পদে বসে তিনি মিশ্র অর্থনীতি অনুসরণ করেন। তিনি একসঙ্গে সমস্ত ব্যাংক-বিমা, পরিত্যক্ত ও অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু তখন দেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের প্রকৃত কর্তৃত্ব ‘হার্ভার্ড সোশ্যালিস্টদের’ হাতে। তাদের পরামর্শে একসঙ্গে সমস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। ফলে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরাট ক্ষতির ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারি কোষাগার শূন্য হওয়ার উপক্রম হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হামিদুল্লা কোটি কোটি টাকার কাগুজে নোট ছেপে এই ভর্তুকি সামাল দিতে সরকারকে কাগুজে নোট সাপ্লাই দিতে থাকেন। দেশে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।

হামিদুল্লার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়ে আসেন নাজির আহমদ। সেন্ট্রাল ব্যাংকিংয়ে তিনি দক্ষ লোক ছিলেন। তিনি বাজারে অব্যাহত মুদ্রা সাপ্লাই বন্ধ করে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা সমতা আনেন। সমাজতন্ত্রী ধাঁচের অর্থনীতি তখন কিছুটা হোঁচট খায়। হার্ভার্ড সোশ্যালিস্টরাও দেশের অর্থনীতি পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে একে একে দেশ ত্যাগ করে বিদেশে পালান।

ঠিক এই সময়ে সিপিবি একটি নতুন স্লোগান তোলে। স্লোগানটি হলো, ‘অপুঁজিবাদী পন্থায় ধনতন্ত্রের বিকাশ’। এই সোনার পাথরবাটি দেশকে গেলাতে গিয়ে প্রাইভেট সেক্টর আবার ধীরে ধীরে মাথা তুলতে থাকে। তাজউদ্দীন আহমদকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে বিগ ম্যাককে (ড. মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী) অর্থমন্ত্রী করার পর তিনি কৌশলে সমাজতন্ত্রী ধাঁচের অর্থনীতি পুরোপুরি বিলোপের ব্যবস্থা করেন। দেশে নব্য ধনীদের উত্থান অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধু এটা টের পান। তিনি বুঝতে পারেন, দেশে সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথা তোলার, অন্যদিকে নব্য ধনীদের উত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার জন্যই তার বাকশাল পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং তখনকার পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রী দেশগুলোর মতো শোষিতের গণতন্ত্র উদ্ভাবন। তাতে বাকশালের তল্পীভূত দল হিসেবে আওয়ামী লীগের চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটে। একটি জাতীয়তাবাদী উদার গণতান্ত্রিক দল থেকে আওয়ামী লীগ একটি শ্রেণি সংগঠনের রূপ ধারণ করতে থাকে। কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থকেই এই সংগঠনে অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়। কো-অপারেটিভকেই দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ধরা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে এজন্যই হত্যা করা হয় যে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই একটি সমাজতন্ত্রী ধাঁচের অর্থনীতি ও রাজনীতির দেশে পরিণত হতে চলেছিল। এটা ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং দেশের নব্য পুঁজিপতি ও স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির গাত্রদাহের কারণ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে শুধু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার নয়, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবাধ লুটপাটের যুগ শুরু হয়। জিয়াউর রহমানের ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ স্লোগানের আড়ালে সরকারি ব্যাংক লুট করে শক্তিশালী লুটেরা ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়। ধর্মান্ধতাকে এতটাই প্রশ্রয় দেওয়া হয় যে তা সমাজজীবনে শেকড় গেড়ে বসে, যা এখন সরানো দুরূহ হয়ে উঠেছে।

সামরিক শাসনামলেই বাকশাল ভেঙে যায়। আওয়ামী লীগের নব অভ্যুত্থান ঘটে একটু পিছিয়ে গিয়ে কৃষক-শ্রমিকের সংগঠনের বদলে আবার উদার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে। সিপিবি এ সময় তাদের চিরাচরিত নীতি অনুযায়ী দেশের শাসককে (তিনি সামরিক শাসক হলেও) সোভিয়েটের পক্ষে রাখতে হবে—এই নীতি অনুসরণ করে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকে প্রথম দিকে সমর্থন দেয় এবং দেশের বাস্তব অবস্থাকে উপেক্ষা করে। ফলে বাকশালের মাধ্যমে প্রগতিশীল শক্তির যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা নষ্ট হয়। আওয়ামী লীগের মধ্য ডান ও মধ্য বামপন্থিদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এক পক্ষের নেতা তোফায়েল আহমেদ, অন্য পক্ষের নেতা আবদুর রাজ্জাক। জোহরা তাজউদ্দীনের পর আবদুল মালেক আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। দেশে জামায়াতের রাজনীতির প্রভাব দেখে আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে দাড়ি রাখতে, টুপি পরতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের সভার শুরুতে সুরা-আয়াত পাঠ আরম্ভ হয়। দলটি ক্রমে পিছিয়ে গিয়ে অঘোষিত আওয়ামী মুসলিম লীগে পরিণত হয়। দেশের অর্থনীতিতে তখন বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। তা শুধু মুক্তবাজার নীতি নয়, অবাধ লুটের বাজারনীতিতে পরিণত হয়েছে।

(৮ আগস্ট শনিবার, ২০২০, পরবর্তী অংশ আগামী রবিবার)

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত