বন্যাকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা

বন্যাকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা
প্রতীকী ছবি

গত রোজার ঈদ নির্বিঘ্ন ছিল না। করোনা ভাইরাস-১৯-এর কারণে মানুষ শান্তিতে ও আনন্দের সঙ্গে পবিত্র ঈদ পালন করতে পারেনি। আশা ছিল দুই আড়াই মাস পর কোরবানির ঈদটা অন্তত আনন্দের সঙ্গে এবং যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে পালন করা যাবে। এই আশার কারণও ছিল। দেখা যাচ্ছিল অর্থনীতি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে কিছুটা গতি আসছে ধীরে ধীরে। যে তৈরি পোশাক কারখানা আমাদের গর্ব তা খুলছে। শ্রমিকরা কাজে যোগ দিচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের সস্তা লোনের টাকায় তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। যেসব ‘অর্ডার’ বাতিল হয়েছিল, স্থগিত হয়েছিল সেসব ‘অর্ডার’ আবার আসতে শুরু করেছে। পশ্চিমা দেশে যেখানে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় সেখানে শীতকাল আসছে—‘বড়দিন’ আসছে। সেই উপলক্ষ্যে তারা নতুন জামাকাপড় কিনে আনন্দ করে ছুটি উপভোগ করে। সেই সূত্রে জামাকাপড়ের অর্ডার আসছে। এদিকে রেমিট্যান্সে ভাটা পড়ার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল সেটা এখনো ঘটেনি। শ্রাবণ মাসে কিছু পাট ওঠার কথা। মানুষ স্বপ্ন দেখছে রোপা আমন লাগাবে আর কয়েক দিন বাদে। এসবই রোজার ঈদ পরবর্তীকালের ভাবনা। সবজি লাগাতে হবে শীতকালের ফলন হিসেবে। অফিস আদালত আস্তে আস্তে খুলছে। এসব বাস্তব অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আসা ছিল কোরবানির ঈদ নির্বিঘ্ন হবে। মানুষ আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে পারবে। না, বিধি বাম, তা হয়নি।

সারা দেশে বন্যা। এক হিসাবে দেখা যায়, দেশের এক-তৃতীয়াংশ জলের তলে। উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা, নীলফামারী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ইত্যাদি অঞ্চল জলে প্লাবিত। মানুষের ঘরবাড়ি জলে ভেসে গেছে। পা রাখার জায়গা নেই। বোনা আমন গেছে। রোপা আমনের কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। বীজতলা ভেসে গেছে। গবাদি পশুর খাদ্য নেই। পাটখেত জলের তলে। মানুষ বলছে, এমন বন্যা ১৯৯৮ সালেও হয়নি। ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব করা কঠিন। একটি দৈনিকের খবরে দেখলাম ‘৩৫টি জেলায় দ্বিতীয় ধাপের বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ১৪টি ফসলের প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমি। এর মধ্যে আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে ৩৫ হাজার ৮২১ হেক্টর। এছাড়া বোনা আমন ধানের ৫৬ হাজার ৩৬২ হেক্টর ও রোপা আমন ধানের ৮ হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে আক্রান্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৯৩৮ হেক্টর।’ এটি আউশ-আমন ফসলসহ পাট ও সবজি ফলনের জন্য খারাপ খবর। দৈনিক ইত্তেফাকের (৩১.৭.২০) খবর ‘ঢাকার চারপাশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি।’ সচিত্র এই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে—ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে জলের তলায় চলে যাচ্ছে। বন্যার জল নামছে। তাই দক্ষিণবঙ্গের মানুষেরও বন্যার কষ্ট দেখা দিচ্ছে। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুকুরের চাষের মাছ ভেসে গেছে। খামারিদের হাঁস-মুরগি গেছে। গরু-ছাগল নিয়ে বড় বিপত্তি ঘটছে।

এই অবস্থার মধ্যেই পালিত হয়েছে পবিত্র কোরবানির ঈদ। করোনার আক্রমণ ঠিকই আছে। মানুষের মৃত্যু ঘটছে। এর মধ্যে বন্যা। মানুষকে বড় বিপাকে ফেলেছে। প্রকৃতি যে কত নিষ্ঠুরভাবে বদলা নিতে পারে তা আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। মানুষ এই অবস্থার মধ্যে আশানুরূপ সংখ্যায় পশু কোরবানি দিতে পারেনি। ‘ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের’ নেতৃবৃন্দের মতে, এবার কোরবানি গেল বছরের তুলনায় ২৫-৩০ শতাংশ কম হয়েছে। এতে চামড়ার চাহিদা বাড়ার কথা, কারণ সরবরাহ কম। কিন্তু বাজারে অবস্থা ভিন্ন। সরকারনির্ধারিত দামের এক-তৃতীয়াংশও কোরবানিদাতারা পাচ্ছেন না। অথচ সরকার কোরবানিদাতা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তিনটি বিশেষ সুবিধা ট্যানারিওয়ালাদের দেন। ট্যানারিওয়ালাদের প্রায় সবাই নিত্যদিনের ঋণখেলাপি। তারা ঋণ নেন, তা পরিশোধ করেন—এমন ঘটনা বিরল। তবু এদের এবার ৬৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। খেলাপিদের ঋণ পুনঃ তপশিল করা হয়েছে। চামড়ার ব্যবসায়ী রপ্তানিকারক এবং ট্যানারির মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কাঁচা চামড়া এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।

বলা হচ্ছিল চামড়া গুদামে পড়ে আছে। অতএব এই ব্যবস্থা। কিন্তু এতসব করার পরও, চামড়ার ব্যবসায়ীদের অঙ্গীকারের পরও বাজারে মন্দা। চামড়া কেনার লোক ছিল না ঈদের কোরবানির পরে। মন্ত্রীর সঙ্গে সভা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীকে ব্যবসায়ীরা কথা দেন। তবু দেখা যাচ্ছে, বরাবরের মতো এবারও তারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার বাজারে মন্দা অব্যাহত রেখেছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ কোরবানিদাতা এবং মাদ্রাসা ও এতিমখানা। অগণিত মানুষ ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্য মাদ্রাসা ও এতিমখানায় কোরবানির চামড়া দান করেন। এবারও তা-ই করেছেন; কিন্তু দুঃখজনক হলো—এতিমখানা ও মাদ্রাসা চামড়ার ন্যায্যমূল্য পেল না। যদি পেত তাহলে বাজারে ক্যাশ যেত। অর্থনীতি চাঙ্গা হতো। সরকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য যত রকমের ব্যাংকসুবিধা আছে তা দেওয়া হচ্ছে। বিনা মূল্যে সরকার চাল দিচ্ছে। লাখ লাখ পরিবারকে পরিবারপিছু ২ হাজার ৫০০ টাকা ‘ক্যাশ’ দেওয়া হয়েছে। এসবই বাজারে ‘ক্যাশ’ জোগানোর উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, যাতে বেচাকেনা বাড়ে। বাজারে চাহিদার সৃষ্টি হয়। এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ সরবরাহ/বিতরণের ব্যবস্থা করেছে সরকার। চাল-ডাল-নুন, চিড়া-মুড়ি ইত্যাদি প্রশাসন থেকে দেওয়া হচ্ছে। এর সচিত্র প্রতিবেদন টেলিভিশনে দেখা যায়; কিন্তু এখানে একটা জিনিসের অভাব থেকে যাচ্ছে। ত্রাণের দরকার আছে; বেশি বেশি দরকার আছে। কিন্তু ‘ক্যাশ’ও দরকার। এ কথাটা বিবেচনায় রাখতে হবে।

এদিকে দৈনিক ইত্তেফাকেই দেখলাম সরকার ‘মুজিব শতবর্ষ’ উপলক্ষ্যে সারা দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ১ কোটি বৃক্ষ লাগাতে হবে। বলা বাহুল্য, ভরা আষাঢ়েই গ্রামের লোকেরা গাছ লাগায়। এটা নিত্যদিনের একটা ঘটনা। এবার মুজিববর্ষে এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। উদ্যোগটি খুবই ভালো। এখানে সমস্যা হচ্ছে বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলের। সেসব এলাকার ‘চারা’ নষ্ট হয়েছে। কৃষকরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে নতুন করে চারার ব্যবস্থা করতে হবে, বন্যার পর যাতে কোটি বৃক্ষ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা পূরিত হয়। বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি অন্যান্য অঞ্চলে সফলতার সঙ্গে পালিত হলে কিছু ‘ক্যাশ’ বাজারে আসবে। ‘ক্যাশ’ আরো আসতে পারত, যদি পশুর বাজারে এবারও মন্দা না থাকত।

ঢাকার বাজারে পশু বেচাকেনা মোটামুটি হয়েছে। কারণ এখানকার কোরবানিদাতাদের সঞ্চয়ও আছে, রোজগারও আছে। সমস্যাটা গ্রামে। গ্রামের মানুষের হাতে ‘ক্যাশ’-এর বড় অভাব। ‘ক্যাশ’ বিঘ্নিত হয়েছে আরো একটা কারণে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ এবার ঈদের আগে কর্মচারীদের বোনাস দেয়নি। এমনকি যে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা ‘প্রচণ্ড ধনী’ তাদের বিপুলসংখ্যকও বোনাস দেয়নি।

সমস্যা গ্রামাঞ্চলে আরেকটি—যার দিকে সরকারের নজর দেওয়া দরকার। ইত্তেফাকের (৩১-৭-২০) খবরে দেখা যায়, পাবনা অঞ্চলের পাটচাষিরা পাট বিক্রি করতে পারছেন না। পাটের দাম বাজারে নেই। পাটের পাইকাররা পাট কিনতে চাইছে না। তাদের যুক্তি—তারা গেল বছর পাটকলে যে পাট দিয়েছিল তার টাকা এখনো পায়নি। এ কারণে তাদের হাতে ‘ক্যাশ’ নেই। আবার খুলনা অঞ্চলে অনেক পাটকল বন্ধ করা হয়েছে। এদের আধুনিকীকরণ দরকার। তাতে সময় লাগবে। ইত্যবসরে পাটের চাহিদা অবশ্যই কমবে। এমতাবস্থায় গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা অর্থাভাবে থাকবে বলে আশঙ্কা। অথচ বরাবরের ঘটনা— আশ্বিন-কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে কৃষককুল পাট বিক্রি করে যে ‘ক্যাশ’ পায় তা দিয়ে পাওনা-দেনার ফয়সালা করেন। এবার কি তা সম্ভব হবে? ইত্তেফাকেরই খবর—‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে দেশের ৬০ ভাগ মানুষ’। এর অর্থ কী? সামাজিক সুরক্ষার অধীনে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া কি ভালো লক্ষণ? বিষটি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। আত্মনির্ভরতা না, সরকারি সাহায্যনির্ভরতা?

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত