আরশিনগর

এক হাতে দাবার গুটি আরেক হাতে কলম

এক হাতে দাবার গুটি আরেক হাতে কলম
ছবি: সংগৃহীত

মানবদা নেই, মানবদা আছেন, থেকে যাবেন আমাদের ভাবনা আর স্মৃতিতে, ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক সংলাপে। এসব স্বগতোক্তির মাঝখানে, শোক-ছোঁওয়া মুহূর্তে, একটি সংশয়, কয়েকটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন সত্তাকে, তার অনুপস্থিতির অনুভূত উপস্থিতিতে মনে রাখব আমরা? স্নেহবত্সল বন্ধু, কৃতী ছাত্র, কৃতী অধ্যাপক, দিকপাল অনুবাদক, কবি-গল্পকার-প্রাবন্ধিক-গবেষক আর বহুভাষার পাঠক—তার ব্যক্তিকতা আর ব্যক্তিপ্রতিভার কোন ঔজ্জ্বল্যকে স্পর্শ করব বারবার?

সন্দেহ নেই, মৃত্যুতে ব্যক্তির দেহাবসান হঠাত্ মুখ্য হয়ে ওঠে, ‘নেই’-এর অতর্কিত অনুভূতি নিয়ে অনেক সময় আমরা খেই হারিয়ে ফেলি, উচিত-অনুচিতের মাত্রা হারিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রধর ‘আমি’ কিংবা ‘আমার’কে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বসি। অন্যায় নেই কিছু এতে। তবু যাকে নিয়ে বলছি, যার কথা চারপাশকে শোনাতে চাইছি, তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় আর মেলামেশার ‘আমি’কে কি একটু আড়ালে রাখা যায় না?

হাসন রাজা গেয়েছিলেন, ‘আমি কিছু নয় রে, আমি কিছু নয়।’ ছায়াবাদী হাসন আমিকে অস্বীকার করে যে বিশ্ব-আমির সন্ধান করেছিলেন, জীবন জুড়ে যার স্পন্দন, যার ছন্দ, যার সামগ্রিকতার বার্তায়, ‘খুদ ও খুদির’...আত্মতা আর আমিত্বের স্বরকে আমৃত্যু বর্জন করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, তা তার মতোই প্রগাঢ় মনীষার পক্ষে সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের, ‘আমি’কে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার ঋদ্ধতা আর উত্তরাধিকার আমরা লক্ষ্য করি আবু সয়ীদ আইয়ুব আর শঙ্খ ঘোষের চিন্তার বিন্যাসেও।

মানবদা শঙ্খ ঘোষের প্রবল অনুরাগী, নিখাদ গুণমুগ্ধ। যতদূর জানি, আবু সয়ীদ আইয়ুবেরও স্নেহভাজন। তাহলে, কোন সূত্রে তিনি রবীন্দ্রনাথের আমিত্বহীনতার উত্তরাধিকারকে জড়িয়ে এত বেশি আমিত্যাগী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, জানতে ইচ্ছে করে। দাবা থেকে ক্রিকেট, ললিতকলা থেকে নন্দনতত্ত্ব, গল্প-কবিতা, উপন্যাস থেকে শিশুতোষ লেখালেখি, যাবতীয় সাহিত্যপাঠ থেকে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস বিশ্লেষণে গভীর আগ্রহ ছিল তার। বহুমাত্রিক লেখক ও চিত্তজয়ী অনুবাদক। তা সত্ত্বেও নিভৃতচারীর বসবাসকে বেছে নিয়েছিলেন কেন? এ কি তার সহজাত আবরণ? ব্যক্তিত্বকে আড়ালে রেখে, আমিত্বকে নাকচ করে, সৃষ্টির নির্মাণকে অন্যভাবে গড়ে তোলার প্রয়াস? স্বনির্বাচিত নিঃসঙ্গতায় উত্তরণ? না আত্ম-উদাসীনতার ভিন্নতর প্রবণতা? নাকি কোনো অভিমানবোধ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে লেখাপড়াকেই ভেবেছিলেন পরমতম আশ্রয়।

বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিল না, আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন, তর্কবিতর্কে তুখোড় যুক্তিবাদী, দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সকাতর, স্নেহময়, ছাত্রপ্রীতিতে ভরাপ্রাণ। এমন একজন বহুমুখী, বহুত্বময় প্রতিভাকে কেন বহুদিন প্রায় স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিতে হয়েছিল? শেষের দিকে চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি, লেখাপড়ায় বিঘ্ন, হূদ্যন্ত্রের অসহযোগিতা...এরকম কিছু কিছু উপসর্গের খবর আমরা জানতাম, তবু কেন তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দেখভালের দায়িত্ব থেকে মুখ সরিয়ে রাখল আমাদের সামাজিকতা?

মানবদার মৃত্যুতে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। চোখ দেখাতে জোর করে একবার হাসপাতালে নিয়ে গেছি। দ্বিতীয়বার যাওয়া হয়নি। দেখতে যাব, করতে করতে হঠাত্ অনুচ্চারিত আলবিদা জানিয়ে দিলেন। পারস্পরিক বিশ্বাস আর সম্পর্কের মধ্যে একটুও ফারাক ছিল না। থাকার কথা নয়। আবদার সহ্য করতেন। লেখা চাইলে না নেই, নেতিকে নস্যাত্ করে বলতেন, অমুক দিন এসো। নিয়মনিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠ অগ্রজ। অগ্রজ বলাটা কম হলো। বলা দরকার, পূর্বজ শিক্ষক।

মানবেন্দ্রর জন্ম, আমার মতোই বৃহত্তর সিলেটে। প্রাথমিক লেখাপড়া করিমগঞ্জে। পরে কলকাতায়। সরাসরি পরিচয়ের আগেই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে যায়। সুজিত্ চৌধুরীর (ঐতিহাসিক) মুখে প্রথম নাম শুনি। দুই জন একই স্কুলের ছাত্র। সহগামী বন্ধুর বইপড়া, লেখালেখি, অনুবাদও বিদ্যাদানের ক্যারিশমায় মুগ্ধ সুজিত্দা গুয়াহাটিতে একদিন বললেন, ওর এক হাতে দাবার গুটি আর অন্য হাতে বই। দুইটিই সমান তালে এগোয়। ‘শুনেই তো অবাক, এরকম হয় নাকি? হয় বলেই অন্য এক বিস্ময় ছড়িয়ে দিলেন নৃতত্ত্বময় ঐতিহাসিক অনুবাদ করার মুহূর্তে মানব অবিকল সব্যসাচী। দুই হাত, দুই চোখ চলতে থাকে। এক হাতে, এক চোখে মূল বইয়ের পৃষ্ঠা, আরেক হাতে সজাগ দৃষ্টির সচল কলম। সংশয় নেই, বিরতি নেই, লিখছে তো লিখছে, সাদা পাতায় ঝরনাধারা বইছে। কাটাকুটি নেই, নিখুঁত শব্দে নিখুঁত তরজমা।’

পরে কলকাতায় পাশাপাশি বসে, আড্ডার মুহূর্তে দেখেছি, তরজমায় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার অদ্বিতীয় গরিমা। মানবদার আগে, এরকম অশ্বারোহী, সচেতন কোনো অনুবাদক বাংলা ভাষাকে এভাবে প্রাণিত, সমৃদ্ধ করেছেন কি না জানি না; দ্বিতীয়ত বার্টন কিংবা সমগোত্রীয় ইংরেজি অনুবাদকদের মতো মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যে ধারা নির্মাণ করে গেছেন, যেভাবে তরজমাকে সমাজতত্ত্ব আর ইতিহাসচর্চার মান্যতা দিয়েছেন, সে ধারা কতটা বর্ধিত, প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তা অজানা হয়ে রইল।

অ্যারাবিয়ান নাইটস অনুবাদ করার আগে বার্টন আরবমুলুকের প্রায় স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠেছিলেন। আরবদের ভাষা, শব্দতত্ত্ব, আচার-অনুষ্ঠান মুখস্থ হয়ে উঠেছিল তার। ফারসি ভাষাও একইভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। ‘পারফিউম গার্ডেন’ অনুবাদ করতে তার সময় লেগেছে এক দশকের বেশি। দীর্ঘ সময় ব্যয়ের কারণ, বার্টন বুঝতেন সংশ্লিষ্ট সমাজের যৌনতার সুন্দরকে, তার ইতিহাসকে, যাপনের রসবোধকে না জানলে সাবলীল, স্বচ্ছ অনুবাদ সহজসাধ্য নয়। মানবেন্দ্র এক্ষেত্রে একটু স্বতন্ত্র। লাতিন আমেরিকায় যাননি, অথচ ওখানকার জীবন, ওখানকার ইতিহাস, আদিজনের অভ্যাস ছিল তার কণ্ঠস্থ। যে অঞ্চলের, যে ভাষার লেখালেখি তরজমা করেছেন, সেখানকার সামাজিক নৃবিদ্যা ও ইতিহাস বুঝে নিয়েছেন। বার্টন, আরবেরি বা নিকলসনের মতোই তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে নির্দিষ্ট গল্প কিংবা উপন্যাসের অনুবাদে হাত দিয়েছেন।

অনুবাদ সহজকর্ম নয়। এজন্য জরুরি পর্যবেক্ষণ, অগাধ পড়াশোনা আর ইতিহাসবোধ। মানবেন্দ্রের লেখাপড়ার পরিধি নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য প্রসঙ্গত বলতে ভালো লাগছে—মানব যে কত বই পড়েছে, কীভাবে পড়েছে, নিজেই তার হিসেব জানে না।

সব সময় সংযতভাষী। বলতেন কম, শুনতেন বেশি। বলার সময় আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা ছুঁয়ে থাকত। প্রজ্ঞার সঙ্গে তার বিনয়ের সখ্য শেখার মতো বিষয়। করিমগঞ্জ স্কুলের, কলকাতার প্রেসিডেন্সির ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (তুলনামূলক সাহিত্য) মেধাবী ছাত্র এবং বহুগামী পড়ুয়া এবং অধ্যাপনার পরিধি যে মিয়ানমারের রেঙ্গুন থেকে শুরু করে কানাডার টরন্টো, পোলান্ডের ভাসবি ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত...এসব নিয়ে আতিশয্য কখনো দেখিনি। পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ও রাশিয়ার সেরা সব গল্প-কবিতা ও উপন্যাসের প্রায় একক আর দিকদর্শী অনুবাদক...এ ব্যাপারেও বিনয়ের অন্তরালে ঢাকা থাকত তার নিষ্ঠা, তার শ্রম, তার অধ্যবসায়। সম্পাদনায়ও মানবেন্দ্রর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। নিখুঁত খুঁতখুঁতে লেখক। একই তথ্য বারবার খতিয়ে দেখতেন। এসব অর্জিত অভ্যাস। আমরা, তার গুণমুগ্ধ অনুজরা, ছাত্রছাত্রীরা কতটা বহন করছি, জানার সুযোগ নেই।

আর একটি কথা, যা বলা অত্যন্ত জরুরি যে, মূলত কবি ও লেখক বলেই অনুবাদকে কৃত্রিমতার বন্দিশালা থেকে মুক্ত করে সৃজনশীলতায় ভরে দিয়েছিলেন মানবেন্দ্র। আমরা তার কাছে ঋণী। ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, ভেবে দেখা দরকার। তার নামে অনুবাদ আকাদেমি গড়ে তোলা যায় না? তার ভাবনা, দায়বদ্ধতা, তার সৃষ্টিময়তাকে ছড়িয়ে দিতে অসুবিধা কোথায়?

ঘটনাচক্রে, বয়সের দূরত্ব পেরিয়ে আমাকে একসময় মানবতার কাছাকাছি চলে আসতে হয়। ভয়ে ভয়ে প্রথম পরিচয়, পরে নিবিড় কুটুম্ব্বিতা। বুকের কাছে, বাড়ির পাশে চলে এলেন। এখন আমার হূদয়ে তার বসবাসের পর্ব শুরু। নতুন করে পড়ব, দেখতে থাকব তার কবিতা, গল্প আর অনূদিত সম্ভার।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত