দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের নির্মম শিকার বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যরা

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের নির্মম শিকার বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যরা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভর রাজনীতির মূল প্রতিপক্ষ ছিল মৌলবাদ ও সামরিক আধিপত্যবাদ। ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দু’শো বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের অবসান ঘটলেও এ অঞ্চলের বিশেষতঃ পূর্ব বাংলার মানুষের স্পৃহা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মকে ব্যবহার করা হবে না এবং শাসনকাঠামো থাকবে জোর জবরদস্তিমুক্ত। তবে এটা ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশ শাসন মুক্ত হয়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বেশিরভাগ রাষ্ট্রই দেশ পরিচালনার মূলনীতিকে স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। তন্মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবস্থা ছিল আরও বেশি হ-য-র-ল-ব।

গতানুগতিক সংজ্ঞায় ভূখণ্ড, জনগণ, সরকার ও সার্বভৌমত্ব থাকলেই রাষ্ট্র হয়ে যায়। আর এসব উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র কেবল টিকে থাকতে পারে; কিন্তু একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য থাকা প্রয়োজন ভিশন বা রাষ্ট্র পরিচালনার স্পষ্ট দর্শন। যা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।

যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম, সে প্রত্যাশায় ফাটল ধরলো শুরুতেই। প্রায় এক দশক চলে যায় শাসনতন্ত্র তৈরি করতে। শুরুতেই সামরিক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে পাকিস্তান শাসন কাঠামোয়। যদিও পাকিস্তান আমলে জমিদারি ব্যবস্থা রহিত করা হয় তথাপিও দীর্ঘদিনের সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার রেশ থেকে যায়। একদিকে শাসক ও জনগণের মধ্যে পেট্রন ক্লায়েন্ট সম্পর্ক অপরদিকে সমাজের গুটি কয়েক মানুষের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মানুষে মানুষে ব্যবধান বেড়েই চলছিল। এরকম একটি বদ্ধ রাজনৈতিক অবস্থায় সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যদিও গণমানুষের জন্য রাজনীতি শুরু সেই তরুণ বয়সেই। ১৯৩৮ সাল থেকেই সোহরাওয়ার্দীর স্নেহধন্য হয়ে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৪৬-৪৭ সালে সমগ্র পূর্ব বাংলা ও আসাম চষে বেড়িয়েছেন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জনমত গঠন করতে। পাকিস্তান হলো। ১৯৪৮ সালে থেকে উর্দু ভাষা বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হলে শেখ মুজিব ছিলেন এর প্রতিবাদে সোচ্চার। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের জন্য জেলও খেটেছেন।

পাকিস্তান শাসনামলের বেশিরভাগ সময়ই শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। এরই মধ্যে রাজনীতির উত্থান-পতনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছেন, মন্ত্রীও হয়েছেন। নিজের আদর্শের সাথে আপোষ না করতে পারায় পদ-পদবি ছাড়তেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরুতেই শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করতে পারছিলেন সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক বাঙালি জাতি নব্য উপনিবেশবাদের কবলে পড়লো। ব্রিটিশরা বিশ্বে সভ্য জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও পাকিস্তান আজও বর্বর হিসেবে সারা বিশ্বে কুখ্যাত। পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোয় কেবল দু’অংশের ব্যবধান বাড়েনি, এতদঞ্চলের মানুষে মানুষেও ব্যবধান বেড়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যই পারে এ জাতির মুক্তি এনে দিতে। এ দর্শনে একটি পৃথক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। এর প্রতিষ্ঠার প্লাটফর্ম তৈরি করতে তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আর সর্বশেষ সভাপতি হয়ে এ দলটিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষের আশা ভরসার স্থলে পরিণত করেন।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত ৬ দফা বহুদিনের অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের শিকার বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তিস্বরূপ। এই ৬ দফার জন্য জেলে যেতে হয় তাকে। এর পরই নেমে আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এক নম্বর আসামি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরিন করে রাখা হয় এবং বিচার শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের তুমুল আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকলকে মুক্তি ও মামলা বাতিল করতে বাধ্য হয় আইয়ুব সরকার। পরে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক সভায় লাখো জনতার উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ নামকরণের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে বাংলা শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাংলা শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশ ডাকা হবে।’

সেই বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশ নেন। আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে কার্যত স্বাধীনতার ডাক দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। এরপূর্বেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যদিও গ্রেফতার তিনি এড়াতে পারতেন। তিনি সেটাতে যাননি। পালিয়ে বেড়ানো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিল না। পাকিস্তানের উত্তাল দিনগুলোতে মাওলানা ভাসানী একবার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার এড়ানোর পরামর্শ দিলে তিনি কয়েকদিন গা ডাকা দিয়ে থাকেন। কিন্তু কিছুদিন পরই বলেন, ‘তার (ভাসানীর) সাথে আমার দেখা করা দরকার; কারণ তাকে এখনও গ্রেফতার করা হয় নাই। তাকে জিজ্ঞাসা করা দরকার, তিনি কেন আমাকে গ্রেফতার হতে নিষেধ করেছেন? আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ, আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃঃ ১৩৪ )।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র যবনিকা ঘটিয়ে আপামর জনগণের ত্যাগ তিতিক্ষা ও সংগ্রামের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে জন্ম নিলে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফিরেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেশগঠনে মনোনিবেশ করেন। সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল স্বাধীনতার ১ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপযোগী একটি সংবিধান উপহার। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পূর্ণগঠনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্বের বুকে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। দেশ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিন ইউএসএ লিখে-গত মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর বিশ্বব্যাংকের পরিদর্শকদের একটি বিশেষ টিম কিছু শহর প্রদক্ষিণ করে বলেছিলেন, ওগুলোকে দেখতে ভুতুড়ে নগরী মনে হয়। এরপর থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এহেন ধ্বংসলীলার ক্ষান্তি নেই। ৬০ লাখ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ২৪ লাখ কৃষক পরিবারের কাছে জমি চাষের মতো গরু বা উপকরণও নেই। পরিবহনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পুল-কালভার্টের চিহ্নও নেই এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগেও অনেক বাধাবিঘ্ন। এক মাস আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত দেশের ওপর নির্বিচার বলাৎকার চলেছে। যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো (কার্যত প্রতিটি ব্যবসা ক্ষেত্রই পাকিস্তানিদের দখলে ছিল) তাদের সব অর্থ-সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেয়। যুদ্ধ শেষে চট্টগ্রামে পাকিস্তান বিমানের অ্যাকাউন্টে মাত্র ১১৭ রুপি জমা পাওয়া গিয়েছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাংক নোট ও কয়েনগুলো ধ্বংস করে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ নগদ টাকার প্রকট সংকটে পড়ে। রাস্তা থেকে প্রাইভেটকারগুলো তুলে নেওয়া হয়, গাড়ির ডিলারদের কাছে থাকা গাড়িগুলো নিয়ে নেওয়া হয় এবং এগুলো নৌবন্দর বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেওয়া হয়।’ (উইকিপিডিয়া)।

এছাড়া উপর্যুপরি কয়েক বছরের বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি, মার্কিন সরকারের ফুড পলিটিক্স, দুর্নীতিবাজদের উত্থান, তথাকথিত দ্বিতীয় বিপ্লবের নামে সমাজতান্ত্রিক দলসমূহের সশস্ত্র বিদ্রোহ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণে মরিয়া। চারিদিকে শুধু গুজব আর গুজব। বঙ্গবন্ধু যে মৌলবাদী ও সামরিক আধিপত্যবাদীর বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে সেই শক্তির আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। যে বঙ্গবন্ধু সবসময় ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন সেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয় তার দলের ভেতর থেকে, বাহির থেকে। পাশাপাশি সরকারের ভেতর ও বাহির থেকে। বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের খাদ্য সচিব মোমেন খান যার নিষ্ক্রিয়তাকে ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষের কারণ ধরা হয় পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান তাকেই খাদ্যমন্ত্রী করে পুরস্কৃত করেন। যেসকল রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি তারাও সোচ্চার ছিল বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণ করতে; তাকে উৎখাত করতে। পরাজিত পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ তথা বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। যদিও বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা তথা ওআইসির সদস্য পদ লাভে সচেষ্ট ছিলেন। পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের কাছে বঙ্গবন্ধুকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত করে সকল প্রকার সহায়তা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। দেশের আমলারা বঙ্গবন্ধুকে বিভ্রান্ত করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিউবায় পাট রপ্তানি করার চুক্তি স্বাক্ষরের পরামর্শ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রোষানলে ফেলেন। ফলশ্রুতিতে পিএল ৪৮০ কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্য খাদ্য সহায়তা থেকে বাদ পড়ে বাংলাদেশ।

এভাবে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের নির্মম শিকারে পরিণত হন জাতির জনক ও তার পরিবারের সদস্যরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার স্ত্রী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু পুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী কামাল, ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিলকে নির্মমভাবে হত্যা করে এদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার। দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ৷

এর পর বাংলার নব্য মীরজাফর খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। দেশ চলে যায় সামরিক শাসনের অধীনে। যে মূলনীতির ওপর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সেই মূলনীতি থেকে দূরে সরে যায় বাংলাদেশ। এদেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা আবার রাজনীতি ও রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোতে পুনর্বাসিত হয়। শুধু তাই নয় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও মিশনে চাকরি দেওয়া হয়; রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্পোরেশনের শীর্ষপদে বসানো হয়; বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়। ধৃষ্টতার সর্বোচ্চ ধাপ পেরিয়ে এদেরকে কেবল জাতীয় সংসদের সদস্যই না; বিরোধী দলীয় নেতা পর্যন্ত করা হয়। জাতির জনকের তথা এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার নাম বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। জাতির নায়ককে খলনায়কে হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্বাধীনতা বিরোধী ও সামরিক শাসকচক্র সব আয়োজন সম্পন্ন করে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সরকারি সকল স্থাপনা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা হয়। প্রকৃত ইতিহাস না জানায় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে সামরিক লেবাস পড়ে রাজনীতিতে আসাদের খপ্পরে পড়েন।

এ ধারা চলার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের ফাঁসি ঘোষণা করা হয়। শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে ফাঁসির রায় কার্যকর করতে না পারলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে কারাগারে থাকা খুনিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এখনও খুনিরা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও লিবিয়ায় পালিয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অঙ্গীকার হচ্ছে বাকী খুনিদেরও ধরে এনে ফাঁসিতে ঝুলানো। তবেই বাংলাদেশ মুক্তি পাবে বাঙালি জাতির জনক ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার দায় থেকে।

লেখক: অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত