রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় যখন নিরপরাধ হয়ে যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী!

রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় যখন নিরপরাধ হয়ে যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী!
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংলাদেশে বিএনপি জামাতের হিংসাত্মক রাজনীতির সঙ্গে সকলেই কম বেশি পরিচিত। বিএনপি জামাত সরকার ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে থাকা প্রায় ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করে। জাতিসংঘের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এএসএম কিবরিয়া, জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা আহছানউল্লাহ মাস্টার এবং নারী আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট আইভি রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ১৮ বার। জামাত বিএনপির প্রতিহিংসায় মিথ্যা মামলায় জেলও খাটতে হয়েছে ৩৫ হাজারের বেশি আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীকে।

কখনো রাজনৈতিক কারণ, আবার কখনো তদন্ত কর্মকর্তার ভুল। যে কারণেই হউক না কেনো, এর ফলে অকারণ সাজা ভোগ করতে হয় অনেক নিরপরাধীকে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার ভুলে বা ইচ্ছাকৃত ভুলে অনেক নিরপরাধ মানুষের কারাবরণের তথ্য এখন আর গোপন কিছু নয়। কিছুদিন আগেই দুই বছরের সাজা পাওয়া আসামি পলাতক লিটনের বদলে আট মাস ধরে কারাবন্দী থাকতে হয়ে নিরপরাধ লিটনকে। জানুয়ারি মাসে পুলিশের ভুলের কারণে কারাগারে প্রেরণ করা হয় নিরপরাধ মিজানকে। জুলাই মাসেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে খুলনার সালাম ঢালীর কথা। বিনা অপরাধে ৪ মাস জেল খাটতে হয়েছে তাকে।

বিএনপি-জোট আমলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় কারাগারে প্রেরণের জন্য পুরাতন বিভিন্ন মামলায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নাম। এর ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সরকারের বিচার বিভাগের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ জোসেফের জীবন ধ্বংস হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তোফায়েল আহমেদ জোসেফ। তার প্রগতিশীল পরিবার থেকে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার আদর্শকে ধারণ করে বেড়ে ওঠেন এবং ছাত্রলীগের সম্মুখ যোদ্ধা হিসেব ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগকেও নেতৃত্ব দেন জোসেফ।

সাহস এবং সহজাত নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য সবসময়ই এগিয়ে আসতেন জোসেফ। তবে বিএনপি জামাত এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পছন্দ হয়নি জোসেফের এই কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনীকে বদনাম করার পাশাপাশি জোসেফের জীবনকে ধ্বংস করার জন্য মোস্তাফা নামের একজন স্থানীয় চাঁদাবাজ ও ফ্রিডম পার্টির নেতা হত্যার মামলায় প্রধান সন্দেহভাজন আসামি করা হয় তাকে। জোসেফের বাবা ছিলেন একজন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা এবং তার ভাই বাংলাদেশের বর্তমান সেনা প্রধান। একজন তরুণ এবং আদর্শবান ছেলেকে তখন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তকমা দিয়ে মিথ্যা মামলার নাটক সাজিয়ে ১৭ বছর জেলে রাখা হয় এবং ১০ বছর কনডেম সেলে রাখা হয়।

মোস্তাফা হত্যা মামলা জোসেফকে জড়িয়ে বিতর্কিত এফআইআর এবং চার্জশিট প্রমাণ করে যে এটি ছিল সাজানো এবং মিথ্যা। এফআইআরে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৭ মে বাহার নামে একজনের সঙ্গে নিয়ে মতিঝিল থেকে বেবি ট্যাক্সিতে করে লালমাটিয়ার এলজিইডি অফিসে যাচ্ছিলেন মোস্তফা। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ওইদিন ১১ থেকে ১২ জনের একটি দল একটি প্রাইভেটকার থেকে নেমে মোস্তাফাকে গুলি করে। কিন্তু তখন মৃত্যুর ঘোষণাপত্রে বলা হয়, গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল সিডিএস প্রিন্টিং প্রেসে। যেটা অন্য একটি দলের সঙ্গে হয়েছিল এবং সেটি ১৯৯৬ সালের ৫ মে হয়েছিল। আর এফআইআর-এ বলা ছিলো ৭ মে অর্থাৎ এটি পুরো সাজানো ঘটনা ছিলো বলে ধারণা করা যায়। ওইদিন গোলাগুলিতে আহত হওয়ার পর মোস্তাফা এবং স্বাধীন নামের তার আরেক সহযোগীকে কাছের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় এবং পরিচয় গোপন রাখা হয়। পরে তাদেরকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পরে মোস্তাফার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। মৃত্যুর ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৫ মে রবিবার গুরুতর আহত হন মোস্তাফা এবং ১৯৯৬ সালের ৮ মে তাকে অস্ত্রোপচার করা হয়।

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফার জবানবন্দির নেওয়ার জন্য ১৪ মে ১৯৯৬ সালে আবেদন করেন। এর পরের দিন অর্থাৎ ১৫ মে ১৯৯৬ সালে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে জবানবন্দি নেওয়া হয় এবং ২০ মে মোস্তফা মারা যান। সুতরাং এ থেকে বুঝা যায় পরিকল্পিতভাবে জোসেফকে এই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন যে, ওই এনালগ যুগে আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্মার্ট ফোন ছাড়া ১১ থেকে ১২ জনের একটি দল কিভাবে একটি প্রাইভেটকারে করে এসে একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌছায়। সুতরাং এটি ছিলো সাজানো এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। একটি স্বাধীনতার পক্ষের পরিবারকে মিথ্যা মামলা দিয়ে তখন দমিয়ে রাখতে চায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি।

এফআইআর অনুযায়ী, চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে খুন হন মোস্তাফা। তৎকালীন এলজিইডি'র প্রধান প্রকৌশলী চাঁদাবাজি এবং তাকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলাও করেছিলেন মোস্তাফার বিরুদ্ধে। ধানমণ্ডি থানায় করা মামলার নম্বরটি হলো ৩৮৭/৩২৩/৩৮০/৪৮৭। তখনকার বিএনপির ওয়ার্ড কমিশনার এবং মোস্তাফার ভাই মিজানুর রহমান তখন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে তার ভাইকে চাঁদাবাজির মামলায় বেশ কয়েকবার জেলে যেতে হয়েছে। এ থেকেই প্রমাণিত হয় একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ছিলেন মোস্তাফা। তবে হত্যার মোটিভে তার এই দিকটি বিবেচনায় আনা হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় যে ছাত্রলীগ কর্মী জোসেফ সেদিন ওই ঘটনায় ছিলেন না।

সাজানো এফআইআর এবং চার্জশিটে দেখা গেছে যে ম্যাজিস্ট্রেট যিনি জবানবন্দি নেন তিনি তখন মোস্তাফার কোনো স্বাক্ষর অথবা হাতে ছাপ নেননি। এছাড়া যে জবানবন্দি লেখা হয় সেখানেও কোন সিল অথবা দলিল ছিলো না। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তাদেরকেও সেই সময়ে জানানো হয়নি যে তার জবানবন্দি নেওয়া হবে।

ময়না তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয় যে মোস্তাফার শরীরের ভেতরে কোনো বুলেট পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয় যে তার শরীরে গুলি প্রবেশের চিহ্ন রয়েছে তবে বের হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা কোনো বুলেট আদালতে পেশ করতে পারেননি। জোসেফ ও তার পরিবারকে কলঙ্কিত করার লক্ষ্যেই এই সাজানো মামলাটি করা।

যেই মোস্তফাকে নিয়ে এত কিছু তিনি কে ছিলেন তা অনেক সময়ই গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়নি। মোস্তাফা ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর এবং মিরপুরের সমন্বয়ক। ৮ আগস্ট ১৯৮৯ সালে ধানমণ্ডি থানায় করা একটি মামলায় ( কেস নং-২৪) তার এই পরিচয় পাওয়া যায়। এই মোস্তাফা এবং তার সঙ্গীরা মিলেই শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। বিএনপি জামাত সরকারের নির্মম প্রশাসন এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত বিচার ব্যবস্থা গোয়েবেলসের সেই উক্তিটি মনে করিয়ে দেয় যে, 'মিথ্যা হাজার বার পুনরাবৃত্তি করলে সেটি সত্য হয়ে যায়'।

তথ্য প্রমাণের ঘাটতি বা তদন্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবে ভুল উপস্থাপনের জন্য বিচার বিভাগের রায় ভুল হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভুল বিচার হয়। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে গত ২৫ বছরে ৩৪৯ জন নিরীহ মানুষকে ইনোসেন্ট প্রজেক্টের আওতায় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে যারা মিথ্যা মামলায় জেলে ছিলেন। এদের মধ্যে ২০ জন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডের আসামি। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি যার মাধ্যমে এমন নিরীহ ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পাবে। এই ব্যবস্থা থাকলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে হয়ত বেঁচে যেতো তৎকালীন তরুণ জোসেফের মতো অনেকেই। বর্তমানে ভুল করে কাউকে কারাগারে প্রেরণ করা হলেও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার কল্যাণে কয়েক মাসের মধ্যেই মুক্তি মিলছে তাদের।

কিন্তু তরুণ জোসেফের ভাগ্য সালাম, লিটন বা মিজানের মত ভালো ছিলো না। কেননা তার নাম রাজনৈতিক বিবেচনায় ইচ্ছাকৃতভাবে মামলায় নথিভুক্ত করা হয়। বিচার প্রক্রিয়াও এমনভাবে সম্পন্ন করা হয় যেনো এই তরুণ ছাত্রলীগ নেতা কোনভাবেই মুক্তি না পায়। পরবর্তীতে ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা হয় গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে যা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। বর্তমান বিচার বিভাগের তড়িৎ কার্যক্রমের কারণে এভাবে আর কোন তরুণের জীবনের মূল্যবান সময় কারাগারে নষ্ট হবে না বলেই আশা প্রকাশ করছি।

লেখক: কলামিস্ট

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত