মধ্যবিত্তের কর রিটার্ন ও বিবেচ্য বিষয়

মধ্যবিত্তের কর রিটার্ন ও বিবেচ্য বিষয়
ছবি: সংগৃহীত

আগের নিয়ম থাকলে এ মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাস হতো করদাতাদের জন্য ব্যস্ততার মাস, হিসাবের মাস। না, এখন আর সেপ্টেম্বর মাস নয়, এখন নভেম্বর মাস হচ্ছে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ মাস। নভেম্বরের ৩০ তারিখের মধ্যে অবশ্যই রিটার্ন জমা দিতে হবে। নতুবা গুনতে হবে জরিমানা, অথবা যথারীতি আবেদন করে সময় নিতে হবে। নভেম্বর আসতে খুব বেশি বিলম্ব নেই। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ চলেই গেল, দেখতে দেখতে এ মাস ইতিহাসের গর্ভে নিমজ্জিত হবে। এরপর যতই দিন যাবে করদাতাদের ততই ব্যস্ততা বাড়বে। হিসাবের ঝামেলা আসবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তার আয় কত ছিল, ব্যয় কত ছিল। ব্যয় কত ছিল, আয় কত ছিল লিখলেই হবে না। আয়ের উৎস বলতে হবে, তার প্রমাণ-সাক্ষ্য দিতে হবে। সার্টিফিকেট সংযুক্ত করতে হবে। এসব আনতে হবে নানা উৎস থেকে। চাকরিজীবীরা দেবে নিয়োগদাতাদের সার্টিফিকেট। সুদ আয় থাকলে দিতে হবে তার সার্টিফিকেট। ব্যাংক, সঞ্চয় পরিদপ্তর, সিকিউরিটি কোম্পানি ইত্যাদি থেকে নিতে হবে সার্টিফিকেট। আয়ের যত উৎস তত সার্টিফিকেট।

এদিকে ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে পাইপাই করে। কোন খাতে কত ব্যয়। বাড়ি ভাড়া, টেলিফোন, যাতায়াত, আয়কর, আপ্যায়ন, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে সব খরচের হিসাব। তারপর হবে সম্পদের হিসাব। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে যা থাকবে তাই সম্পদ বা উদ্বৃত্ত। আয়করের কাছে এ হিসাব অচল। তাদের কাছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সম্পদ কত বৃদ্ধি হলো তা আগে। তারপর বলতে হবে কত সাংসারিক খরচ। দুই যোগ হবে। যোগফলের সমান হতে হবে মোট আয়ের পরিমাণ। বেশ জটিল হিসাব। আরো জটিল হিসাব হচ্ছে ‘মোট আয়’ হিসাব করা। মোট আয়ের একটা অংশ সঞ্চয় করা যায়। সঞ্চয়ের ওপর ‘কর রেয়াত’ পাওয়া যায়। এই হিসাবটি বেশ জটিল। সাধারণ করদাতারা তা করতে পারে না। তাদের যেতে হয় আয়কর উকিলের কাছে অথবা আয়কর কেরানির কাছে। না গিয়ে উপায় নেই। তারাই আয়করের ‘ক্লিয়ারেন্স’ আনবে। আয়কর বিভাগের কর পরিশোধ সার্টিফিকেট আনবে। সেটা ‘তামাশার’ কাজ নয়। উকিল ছাড়া তা সংগ্রহ করা মহা কঠিন ব্যাপার। তাই ব্যবস্থা হয়েছে ‘আয়কর মেলার’। বার্ষিক ঘটনা এখন। সেখানে রিটার্ন জমা দিলে কিছুটা স্বস্তি মেলে আয়করদাতাদের। কিন্তু এই সুযোগ আর কয় জন গ্রহণ করতে পারে। অধিকাংশ করদাতাকেই নিয়মিত পন্থাতে রিটার্ন জমা দিতে হয়।

নিয়মিতভাবে এবং সময়মতো রিটার্ন জমা দিতে হলে কার্যত এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। দেখতে দেখতে সময় চলে যাবে। একেকটা সার্টিফিকেটই জোগাড় করা সাধারণ করদাতা, অবসরপ্রাপ্ত করদাতা, মহিলা করদাতা, দোকানদার করদাতা ইত্যাদি শ্রেণির করদাতাদের জন্য সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমি নিশ্চিত, করদাতারা ইতিমধ্যেই ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। কিন্তু এবার বিপদ অন্যত্র। জনজীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বহু করদাতা আছেন, যারা ঘরের বাইরে এখনো যেতে পারছেন না। যারা বয়স্ক করদাতা তারা এখনো গৃহবন্দি। এমতাবস্থায় তাদের সঙ্গে জায়গায় জায়গায় গিয়ে সার্টিফিকেট জোগাড় করা এখন বিপদের কথা হতে পারে। ব্যাংকে ব্যাংকে এখন বহু কাজ ‘কেন্দ্রীভূত; করা হয়েছে। শাখায় কিছু পাওয়া যায় না। সব প্রধান কার্যালয়ে। অথচ প্রধান কার্যালয় অনেক ক্ষেত্রে একটা ‘দুর্গ’। সেখানে আগের মতো ঢুকে কাজ করিয়ে আনা সম্ভব নয়। আবার অনুমিত যে, এবার অনেকেরই আয় হবে কম।

স্বাভাবিক অবস্থাতেই, অর্থাৎ নিয়মিত আয়ের সময়েই করদাতাদের বিষয়টি জমা দিতে হতো ঠিকই, কিন্তু বকেয়া কোনো কর দিতে হতো না। এর কারণ কী? কারণ একটা সুন্দর ব্যবস্থা, যা আয়কর বিভাগ উদ্ভাবন করেছে। এর সাধারণভাবে নাম উেস আয়কর কর্তন (ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স)। সুন্দর ব্যবস্থা। এতে আয়কর বিভাগের কোনো প্রশাসনিক ব্যয় নেই। বিনা প্রশাসনিক কাঠামো এবং ব্যয়ে তাদের আয়কর উেসই আদায় হয়ে যাচ্ছে। যারা আদায় করছে, তারা সেই টাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দিয়ে দিচ্ছে। যেমন যারা বেতনভুক্ত কর্মচারী-কর্মকর্তা তাদের কর প্রতি মাসে বেতন থেকেই কেটে রাখা হয়। প্রতি মাসে সেই করের টাকা এনবিআরে জমা হয়। ব্যাংকের আমানতে সুদ দেওয়া হলে ব্যাংক সঙ্গে সঙ্গে ১০-১৫ শতাংশ হারে ট্যাক্স কেটে রাখে। যাদের টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) আছে তাদের বেলায় ১০ শতাংশ এবং যাদের তা নেই তাদের ১৫ শতাংশ। একইভাবে সঞ্চয়পত্রের সুদের ক্ষেত্রেও তাই। এ ছাড়া রয়েছে রপ্তানি বিল, টেন্ডার, সরকারি কাজে দেওয়া বিল, ড্রাফটসহ ডজন ডজন সার্ভিস। অগণিত সেবার ওপর উেস কর কেটে নেওয়া হয়। সেখানে আয়করদাতার কোনো ওজর-আপত্তি করার সুযোগ নেই। এটা অটোসিস্টেম। কিন্তু এই অটোসিস্টেমের একটা অসুবিধা দেখা দিয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অগণিত করদাতার প্রকৃতপক্ষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় কোনো কর দিতে হয় না। বরং তাদের যে কর দেওয়ার কথা উেস তার চেয়ে অনেক বেশি কর কেটে নেওয়া হয়েছে। যাদের একটা ১ হাজার ৫০০ সিসির গাড়ি আছে, তাদেরকে উেস কর হিসেবে গাড়ির জন্য ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়।

২০২০-২০২১ অর্থবছর থেকে তা করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। উেস কাটা সব কর একসঙ্গে করলে বিপুলসংখ্যক করদাতার পরিশোধিত করের পরিমাণ হয় সরকারের পাওনার চেয়ে বেশি। অতএব করণীয়? রাজস্ব বিভাগের করণীয় হচ্ছে, এই টাকা ফেরত দেওয়া অথবা পরের বছরের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করা। কিন্তু অ্যাডজাস্টমেন্ট সম্ভব হয় না। কারণ পরের বছরেও করদাতার পরিশোধিত কর হয় পাওনা করের চেয়ে বেশি। এতে এটা একটা ভীষণ যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, অ্যাডজাস্টমেন্ট নয় যা পরিশোধিত হয়েছে তা চূড়ান্ত। আর কোনো দায়দাবি নয়। শোনা কথা, সত্যি-মিথ্যা জানি না। তবে বাস্তবে তা-ই!

এই যে চিত্র ওপরে দিলাম, তার থেকে এবারের শিক্ষা কী? এখন দুঃসময় চলছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর বলতে গেলে ছিল অস্বাভাবিক বছর। ২০২০-২১ অর্থবছরের এখন সেপ্টেম্বর মাস। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, তা বলার কোনো উপায় নেই। মানুষের জীবনযাপন কঠিন এক সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। বহু মধ্যবিত্ত শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। তার ঢাকার ঠিকানায় সে নেই। সবাই ঈশ্বরকে ডাকছে, যাতে তিনি এই বিপদ থেকে সবাইকে মুক্তি দেন। বহু করদাতা মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছেন। ঘরবন্দি থাকতে থাকতে অনেকেই অস্বাভাবিক অবস্থায় আছেন। ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, কিডনিসহ নানা জটিল রোগের কোনো চিকিত্সা নেই। দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় দিন কাটছে মধ্যবিত্ত করদাতাদের, সাধারণ করদাতাদের। চূড়ান্ত অনিশ্চিত সময় কাটাচ্ছেন তারা। এমতাবস্থায় কি রিটার্ন দেওয়ার ঝামেলা থেকে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ করদাতাদের মাফ করা যায় না? এবার কেন, সব সময়ের জন্য। এতে কি সরকারের কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে? না, সরকারের আর্থিক ক্ষতির কোনো কারণ নেই। বরং বিপুলসংখ্যক ফাইল সংরক্ষণের ঝামেলা থেকে সরকার বেঁচে যাবে। এ কথা কীভাবে বলছি? আমি দুটো দৈনিকের (১০.১১.১৭ ও ২৫.১১.১৯) খবরকে সাক্ষ্য মানছি। এদের খবর থেকে দেখা যাচ্ছে, উেস করই ৯০ শতাংশ। রিটার্নের মাধ্যমে কর আসে মাত্র ১০ শতাংশ। এই খবরের কোনো প্রতিবাদ আমি দেখিনি। অতএব প্রশ্ন, মাত্র ১০ শতাংশ করের জন্য এত বড় রিটার্ন (কয়েক পৃষ্ঠা) এবং এত বিপুলসংখ্যক সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে রাজস্ব বোর্ডের কী লাভ? এর চেয়ে এবং বিকল্প ব্যবস্থায় রাজস্ব বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া যায় না কি?

বিকল্প ব্যবস্থা কী? আগস্ট মাসের ২১ তারিখের একটি খবরে বলা হচ্ছে :নিবন্ধিত কোম্পানির ৮০ ভাগই করের আওতায় বাইরে। বলা বাহুল্য, খবরটি দিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। দেখা যাচ্ছে, দেশে মোট নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ১ লাখ ৭৬ হাজার। ‘টিআইএন’ আছে মাত্র ৭৬ হাজারের। আর বাকি ১ লাখের ‘টিআইএন’ই নেই। এটা একটা আয়ের বড় উত্স হতে পারে না কি? বন্ডেড ‘ওয়ার হাউজ’-এর কাপড় খোলা বাজারে বিক্রি হয় অথচ তা ব্যবহার হওয়ার কথা রপ্তানিমুখী বাস্ত্রশিল্পে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেছেন (৬.১০.১৭), এই খাতে বোর্ড বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারায়। ভ্যাটে কী হচ্ছে? ঠিকমতো ভ্যাট আদায় হলে, সব ক্ষেত্র থেকে ভ্যাট আদায় হলে, অনেকের ধারণা—আর কোনো রাজস্বের দরকার হয় না। এটা একটা রাজহাঁসের মতো। প্রতি মুহূর্তেই ডিম দিতে পারে। ব্যাংকের ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকা মামলায় আটকা গ্রাহকদের কাছে। মামলার নিষ্পত্তি হলে এই সমস্ত টাকাই ব্যাংকের আয়ে পরিণত হবে। আমার ধারণা, তাহলে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা সরকারের রাজস্ব হবে। শুল্ক ফাঁকি বন্ধ, কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে কর আদায়, অর্থ পাচার বন্ধ, পাচারকৃত টাকা উদ্ধার করতে পারলে সরকারের টাকার অভাব হবে না। আর সরকারি খরচের গুণমান উন্নত করতে পারলে উন্নয়ন বাজেটের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। এমতাবস্থায় সাধারণ করদাতাদের রিটার্ন থেকে মুক্তি দিতে বাধা কোথায়?

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত