এমপিও: যৌক্তিক সংশোধনই শিক্ষকদের প্রত্যাশা

এমপিও: যৌক্তিক সংশোধনই শিক্ষকদের প্রত্যাশা
প্রতীকী ছবি

আমি যেন সেই হতভাগ্য বাতিওয়ালা/ আলো দিয়ে বেড়াই পথে পথে কিন্তু/ নিজের জীবনই অন্ধকারমালা—ড. আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তালেব মাস্টার’ কবিতার এই ছত্রগুলো যেন বাংলার বেসরকারি শিক্ষকসমাজের জীবনের করুণ চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলছে। অথচ শিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষকদের অবদান সিংহভাগ। বেসরকারি শিক্ষকসমাজের দুর্দশা লাঘবের জন্য সরকার কর্তৃক চালু আছে মান্থলি পেমেন্ট অডার্র তথা এমপিও ব্যবস্থা। দেশের প্রায় ২৮ হাজার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক এমপিও সুবিধা ভোগ করছেন যা দিয়ে শিক্ষকসমাজ তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো কোনোমতে পূরণ করছেন। কারণ এই সুবিধার আওতায় সরকার থেকে মূল স্কেলের শতভাগ বেতন-ভাতা দেওয়া হলেও বাড়িভাড়া ও চিকিত্সাভাতা দেওয়া হয় নামমাত্র। উত্সবভাতা তো দেওয়া হয় মাত্র ২৫ শতাংশ যা শিক্ষকসমাজের জন্য এক ধরনের অপমান। দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাত্সরিক ইনক্রিমেন্ট চালু হলেও এখনো অনেক বৈষম্য বিদ্যমান। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ জারি করা হলে এর কিছু ধারা ঐ বৈষম্যকে আরো প্রকট করে তোলে। শিক্ষকসমাজের মধ্যে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ, যার ফলশ্রুতিতে নেওয়া হয়েছে নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ। ইতিমধ্যে কয়েক দফা সভা হলেও এখনো নীতিমালার সংশোধন চূড়ান্ত হয়নি। বারবার সংশোধনী না এনে এমনভাবে নীতিমালা সংশোধন করা উচিত, যেন শিক্ষকদের মধ্যে কোনো অসন্তোষ না থাকে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য আর কোনো পরিবর্তন আনতে না হয়।

এমপিও নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী মিলিয়ে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ এবং ডিগ্রি কলেজে যে জনবল কাঠামো তা খুবই অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে দুইটি করে পত্র থাকলেও এমপিও পদ মাত্র একটি। মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনটি করে বিষয় থাকলেও পদ মাত্র একটি। ফলে শিক্ষকদের ক্লাস নিতে নিতে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয় যা শিক্ষার গুণমানের অন্তরায়। এমপিও নীতিমালাতেই বলা আছে, শিক্ষকমণ্ডলীকে তাদের মূল বিষয় ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে পাঠদান করাতে হবে। প্রতি শিক্ষকের ন্যূনতম অপর দুইটি বিষয়ে ক্লাস নেওয়ার দক্ষতা থাকতে হবে। এই নীতিটিই গুণগত শিক্ষার পরিপন্থি।

এমপিও নীতিমালার একটি বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে পদোন্নতি। এই নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওভুক্ত প্রভাষকগণ আট বছর পূর্তিতে ৫:২ অনুপাতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন এবং অন্য প্রভাষকগণ এমপিওভুক্তির ১০ বছর পূর্তিতে একটি উচ্চতর স্কেল পাবেন। এই বিধি পুরোপুরি অযৌক্তিক ও চরম বৈষম্যমূলক। আগে এলে আগে পাবেন—এমন সস্তা নিয়ম অন্তত শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। এখানে পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত যোগ্যতার নিরিখে। এই বিধি অনুযায়ী প্রায় ৭২ শতাংশ প্রভাষক সারাজীবনেও পদোন্নতি পাবেন না আবার সহকারী অধ্যাপকই সর্বোচ্চ পদ। সহযোগী অধ্যাপক কিংবা অধ্যাপকের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি এমপিও নীতিমালায় যা আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি শিক্ষানীতির কোথাও এই অনুপাত প্রথার অস্তিত্ব নেই। বরং তাতে আছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যোগ্যতার নিরিখে প্রতিযোগিতামূলকভাবে উচ্চতর পদে নিয়োগ করা হবে, যেমন—প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে। বেতন বৃদ্ধি সফল প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে; কিন্তু এমপিও নীতিমালায় জাতীয় শিক্ষানীতির এই সুস্পষ্ট বাক্যগুলোর কোনো প্রতিচ্ছবিই খুঁজে পাওয়া যায় না। আশার কথা—সংশোধনীতে অনুপাত প্রথার পরিবর্তে ৫০ শতাংশ প্রভাষককে সময়কাল, কাম্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সবাইকেই সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এর সঙ্গে কাম্য যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা, উচ্চতর ডিগ্রি ইত্যাদির ভিত্তিতে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ রাখা উচিত। আর যারা পদোন্নতির কাম্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে না তাদের জন্য দুইটি উচ্চতর স্কেলের পরিবর্তে তিনটি উচ্চতর স্কেল দেওয়া উচিত। দীর্ঘ ৩০ বছর চাকরিজীবনে মাত্র দুইটি উচ্চতর স্কেল দেওয়া অমানবিক।

অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালায় এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা গণনার বিধান রয়েছে। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। অভিজ্ঞতার গণনা করা উচিত যোগদানের তারিখ থেকে। সেই সঙ্গে শিক্ষকের রেজাল্ট, উচ্চতর ডিগ্রি, যেমন—এমফিল বা পিএইচডি, গবেষণাপত্রের সংখ্যা ইত্যাদি বিষয়গুলোও বিবেচনা করা উচিত। বিদ্যমান এমপিও নীতিমালায় শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে উত্সাহিত করার মতো কোনো বিধান নেই।

জাতীয় শিক্ষানীতিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে বদলি করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি সরকারি প্রয়োজনে শিক্ষকগণকে সমধারার সমস্তরের প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের বদলির কথা বলা হয়েছে। তবে এখনো বদলির বিধান তৈরি করা হয়নি। এমপিও নীতিমালায় সরকারি প্রয়োজনে, স্বেচ্ছায় বদলি ও পারস্পরিক বদলির বিধান রাখা উচিত। বিদ্যমান নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বিধানে একক শ্রেণি বা শাখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীসংখ্যা নূূ্যূনতম ৫০ ও পরবর্তী শাখার ক্ষেত্রে ৪০ জন থাকার কথা বলা হয়েছে। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতিতে শ্রেণিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩০-এর কথা বলা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি এবং ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নীতি-নির্ধারকদের এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অনেকেই বিদ্যমান নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সত্তর শতাংশ পাশের হারকে কমিয়ে দিতে বলছেন। মনে হয় এই নীতিটি অত্যন্ত যৌক্তিক। তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্তির জন্য হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে আরো বেশি সচেষ্ট হবে। নিজস্ব জমি নেই যেসব প্রতিষ্ঠানের সেসব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত না করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা যৌক্তিক। এতে যত্রতত্র ভৌত সুবিধাহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রবণতা কমে আসবে। আরেকটি খুব ভালো সিদ্ধান্ত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের জন্য এসিআর চালু হওয়া। পদোন্নতির ক্ষেত্রে এসিআরের ভূমিকা থাকার বিধান থাকলে সবাই কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে যা গুণগত শিক্ষার জন্য সহায়ক হবে। এসব ইতিবাচক পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ছাড়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অথচ শ্রম আইনে মাস শেষ হওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে মজুরি প্রদানের কথা বলা আছে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা মাস শেষের সাত কর্মদিবসের মধ্যে দেওয়ার বিধান করা উচিত। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান নেই অথচ আমাদের শ্রম আইনে এই বিধান আছে। আরেকটি বিষয় হলো—এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে নতুন এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। প্রায়শ দেখা যায়, আঞ্চলিক অফিসগুলোর দৌরাত্ম্য ও অবহেলায় ছয় থেকে এক বছর শিক্ষকদের বিনা বেতনে চাকরি করতে হয় যা একজন শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আশার কথা—আঞ্চলিক অফিসগুলোকে সর্বোচ্চ পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এমপিও আবেদন অগ্রায়ণ বা নিষ্পত্তি করার জন্য আদেশ জারি করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও সভাপতি যদি এমপিওভুক্তিতে অনৈতিক কোনো কিছু করেন তবে তার অব্যাহতি দেওয়ার কথাও এই আদেশে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদারকি বৃদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ পদক্ষেপও নিতে হবে। মোটকথা, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তাদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্যগুলোকে হ্রাস করার উদ্যোগ যদি যৌক্তিকভাবে এমপিও নীতিমালা সংশোধনীতে আনা যায় ।

লেখক: শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত